‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার এখন আর গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার নয়’

মাজহার সরকারের সাথে সাক্ষাৎকারে কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের

মাজহার সরকারমাজহার সরকার
Published : 6 Feb 2024, 04:17 PM
Updated : 6 Feb 2024, 04:17 PM

রাজধানীর বনানী এগারো নাম্বার রোডে অপেক্ষা করছি কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবেরের জন্য। ফোনে শুধু বলেছিলাম, ‘আপনার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয় না’। গত ডিসেম্বরে এক শীতসকালে অবশেষে আমরা গিয়ে বসলাম একটা কফিশপের দোতলায়। পায়ে স্নিকার, নীল জিন্স আর উইন্টার জ্যাকেটে পঞ্চাশের দশকে জন্ম নেওয়া এ লেখক যেন রৌদ্রবালক। দুই গ্লাস কফি হাতে দুজন বসে আছি, আড্ডা চলছে। এর মধ্যেই আমি তার অনুমতি নিয়ে ফোনে রেকর্ডার চালু করি।

সাবের যদিও গোটানো স্বভাবের মানুষ, বিচ্ছিন্ন থাকতে ভালোবাসেন, তবু দীর্ঘ তিন ঘণ্টারও বেশি সেই আড্ডায় উঠে এসেছে দেশ, সমাজ ও তার ব্যক্তিজীবনের নানা কথা। সেই কথাসমগ্রের একটা থাম্বনেইল এখানে প্রকাশিত হলো-

একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে লেখক হয়ে ওঠেন?

একজন লেখকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে চারপাশটা বোঝা। সবদিকে জ্ঞান থাকা। আমাদের দেশের অধিকাংশ লেখকদের অর্থনীতি সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই। রাজনীতি বলতে বোঝে কেবলই দলীয় রাজনীতি, মগ্নতা বোঝে না। প্রথমত বুঝতে হবে, সেই বোঝার ব্যাপারটা তো নেই। একটা মানুষ কীভাবে আচরণ করবে সে আচারণটা নেই। লেখক হতে হলে থাকতে হবে মেধাশক্তি। লেখক নির্বিকার থাকবে, যাই ঘটুক না কেন। কোন ঘটনা যদি আমি সত্যিকারভাবে তুলে ধরতে চাই তবে আমাকে তা দূর থেকে দেখতে হবে। ওটাকে এড়িয়ে গেলে চলবে না, আবার খুব কাছে গিয়ে ওটার সঙ্গে জড়িয়ে গেলেও চলবে না।

আপনার লেখালেখির বড় একটা জায়গাই হলো বাঙালি মধ্যবিত্ত। এ মিডল-ক্লাস কনানড্রামের ভবিষ্যৎ কী?

মধ্যবিত্ত সবসময় লোভী, সবসময় স্বার্থপর। সে খালি নিজেকেই আঁকড়ে ধরতে চায়, পাশাপাশি যদি প্রতিবেশীও থাকে। ওরা চায় একজন আরেকজনকে টেনে ধরে নিচে নামাতে। একজন মধ্যবিত্তের জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে নিজেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে ওপরের শ্রেণিতে শিফট করা। সুতরাং তার মধ্যে লোভ আছে, হিংসা আছে, কুটিলতা আছে- এই সবই আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন কিছুই হয় না, তখন তার মধ্যে হাহাকার কেবল থাকে।

বলা হয়, আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনগুলোর পেছনে মধ্যবিত্তের একটা বড় ভূমিকা আছে। এখনকার মধ্যবিত্তের পক্ষে কি বিপ্লব সম্ভব?

না। মধ্যবিত্ত কোন সময় সামাজিক বিপ্লব করে না। স্বাধীনতার সময় যে মধ্যবিত্ত কাজ করেছে তারা হাতেগোনা, কয়েকজন কাজ করেছে। গ্রামের যে ছেলেটা রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ করতে চলে গেছে সে কারও সম্পর্কে কিছু জানতো! না কোনো ধারণা ছিল! উঠতি মধ্যবিত্ত কিংবা এলিটরা আছেন, তারা ব্যবসা করে বড় লোক হন। সুতরাং আমরা যতই চেতনার কথা বলি, চেতনার চেয়ে স্বার্থটা অনেক বড়। অনেক বড় ব্যাপার গোষ্ঠীস্বার্থ, যেভাবে হোক ব্যবসা করে বড়লোক হওয়া।

আপনিও আপনার বাবার (কবি আহসান হাবীব, ১৯১৭-১৯৮৫) মতো কেবল সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এখন যারা এ পেশায় আসছে তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে।

বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করার পর চাকরি  শুরু করি ‘নিপুণ’ নামে একটি পত্রিকায়। তারপর একসময় আমাকে ডেকে পাঠান শাহরিয়ার কবির, কাজ শুরু করি ‘বিচিত্রায়’। এখন তো এ পেশায় উপার্জন কম নয়। কিন্তু যারা বেশি উপার্জন করতে পারে না তারা ওই লাইনগুলো বের করতে পারে না। যাদের কুবুদ্ধি নেই, সাহস নেই বা ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার মতো জায়গায় তারা নেই। গত ১৫ বছরে যেটা হয়েছে-- প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছে। বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠানকে আপনি দেখাতে পারবেন না যে প্রতিষ্ঠান নষ্ট হয়ে যায়নি। তবে এখানে আলাদাভাবে পুলিশ, সাংবাদিক বা ডাক্তারকে দোষারোপ করা যায় না। কোনো প্রতিষ্ঠানকে তার নিজের মতো চলতে দেওয়া হয়নি। ১৫ বছরে পরিকল্পনা করে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। আবার সমাজে একটি প্রতিষ্ঠান আরেকটির সঙ্গে জড়িত নানাভাবে। ফলে দূষণ পাশেরটিকে সংক্রমিত করে। কেউ আর সুস্থ থাকে না। কোন জবাবদিহিতা আছে সমাজে? একটি জবাবদিহিতা আমাকে দেখাতে পারবেন?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে এখন যে কোন লেখার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এটা কি মূলধারার লেখালেখির অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারবে?

আপনি বিখ্যাত হতে চান নাকি ভালো লেখক হতে চান সে সিদ্ধান্ত আগে নিতে হবে। একটি হিসাব ভুলে যাওয়া যাবে না, আপনি যদি ভালো লিখেন তাহলে এক পর্যায়ে না এক পর্যায়ে বিখ্যাত হবেনই। ধরুন, এখন লাইন দিয়ে আপনার বইটা কিনছে পাঠক। পাঠক কেবল ভালো লাগা থেকেই বই কেনে না। বই আসলে মানুষ পড়বে কেন? আসলে যার যেটা পড়ে ভালো লাগে। যারা জনপ্রিয় লেখক তাদের পাঠক অনেক সময় স্থায়ী হয় না। আর আমার মনে হয় যে ছাপা বই পড়ার যে আনন্দ, অডিও বা ভার্চুয়াল ই-বুক হলে সে আনন্দটা পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের তরুণ লেখকদের মধ্যে দ্রুত উন্নতি বা টাকা রোজগারের একটা প্রতিযোগিতা আছে। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতাবান অগ্রজ কবি-লেখকদের সঙ্গে তারা সুসম্পর্ক রাখতে পছন্দ করে। আপনার সঙ্গে কারা রাখে?

কোন পুরস্কার, এমনকি কাউকে চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা কোন কালেই আমার ছিল না। অন্য কোন ফেবার করার ক্ষমতা আমার কাছে ছিল না। এটা একটা বড় কারণ, লাভ ছাড়া কোন কাজ হয় না। আমি নতুন প্রজন্মের মধ্যে দোষ দেখি না, এটা করে যাদের বয়স ৫০-৬০ বছর। চারদিকে একটা সম্পর্ক এরা তৈরি করে, দেনা-পাওনার বিষয়টি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মেনটেইন করে। খুব সচেতনভাবে কোন দিন কাকে কোন বিষয়ে শুভেচ্ছা জানাতে হবে, কাকে কাকে সপ্তাহে অন্তত একবার হাই হ্যালো করতে হবে- এসব খেয়াল রাখে।

প্রতি বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে একটা হৈচৈ হয়…

বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেতে চায় এমন অনেককে দেখি আগের দশ বছর ধরে চেষ্টা তদবির চালিয়ে যায়। পুরস্কারের জন্য লেখক নিজে কেন চেষ্টা করবেন? এখন কিন্তু ব্যাপারটা একটা নিয়মের মধ্যে দাঁড়িয়েছে, আপনাকে চেষ্টা করতেই হবে। চেষ্টা না করলে পুরস্কার পাবেন না। বাংলা একাডেমি পুরস্কার এখন আর গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার নয়। কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারতো, কিন্তু সর্বনাশ আমরা নিজেরা করে দিয়েছি। এটাকে রাজনৈতিক বানিয়ে, স্বজনপ্রীতি আর টাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে।

বাংলা একাডেমি পুরস্কারের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় যখন আসে কেউ কেউ সে তালিকাটা জোগাড় করে। আমাদের সময়ে শুনতাম, নিজের ৫০টা বই আর চার কেজি মিষ্টি নিয়ে মনোনয়নকারীদের বাড়ি বাড়ি যায় প্রার্থীরা। এই পরিমাণ নিশ্চয়ই বেড়েছে, আর শুধু কি মিষ্টিতে হয়? এটা খুবই অপমানজনক। লেখকের আত্মমর্যাদাবোধ থাকতে হবে। এর পাশাপাশি ভালো লিখে এবং অসাধু উপায়ে একেবারেই সামান্যতম জড়িত নয় তিনিও পুরস্কার পেয়েছেন, পাচ্ছেন।

আপনাদের সময়েও কি পুরস্কার নিয়ে দলাদলি ছিল?

আমাদের সময়ে যে এসব ছিল না তা নয়। যেমন রফিক আজাদরা। রফিক ভাই (কবি রফিক আজাদ, ১৯৪১-২০১৬) এমনি আমার খুব প্রিয় মানুষ। কিন্তু রফিক ভাইরা দলবেঁধে চেষ্টা করতেন যেন সিকদার ভাইকে (কবি সিকদার আমিনুল হক, ১৯৪২-২০০৩) পুরস্কার দেওয়া না হয়। রফিক ভাই বাংলা একাডেমি  পুরস্কার পেলেন ৪১ বছর বয়সে। কিন্তু তারই সমবয়সি সিকদার ভাই পেলেন ৫১ বছর বয়সে। এখন এত বাজে একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে ৬০-৬৫ এমনকি ৭০ বছর হয়ে যায়, পুরস্কার পাচ্ছেন না। তবে আমরা বলতে পারি না যে ৬০ বা ৬৫তে-ই পাওয়া উচিত। কেউ যদি ভালো লিখে সে আগেই পেতে পারে।

তবে কোন মানুষকে আসলে চূড়ান্তভাবে বিচার করা যায় না। মানুষ একই ধারায় থাকে না। আপনি আমি যে স্ট্রেইট এইরকম চিরদিন থাকবো, এটা আসলে হয় না। মানুষের জীবন এতো সরলরেখা নয়। এতো সহজ নয়। কিন্তু মন্তব্য করতে আমরা অসম্ভব পারদর্শী।

আপনার পূর্বপুরুষরা বরিশালের, আর আপনি বড় হয়েছেন ঢাকায়। এই ডায়াস্পোরা কীভাবে দেখেন?

আমাদের বাড়িটা পড়েছে আসলে পিরোজপুরে, আমার যখন জন্ম তখন এটা বৃহৎ বরিশালের অংশ ছিল। বরিশাল থেকে পিরোজপুর বাসে মনে হয় দেড় ঘণ্টা লাগতো। আর পিরোজপুর থেকে আমাদের গ্রাম আরও দেড় মাইল। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেও দেড় ঘণ্টা লাগতো। শহর থেকে আমি যদি গ্রামের বাড়িতে যেতে চাই, যেতে হবে পায়ে হেঁটে। আমাদের গ্রামে এখনও টিউবওয়েল নেই। গ্রামের নাম শংকরপাশা। আমি কখনও যাইনি।

আব্বা তো ১৯৩৬ সালে পালিয়ে কলকাতায় চলে গেছেন। ওনার পালিয়ে যাওয়ার একটা ঘটনা আছে। আমার দাদা খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন। জমিজমা যা ছিল বেচে শৌখিনতা করতেন। ওই আমলে দামি পাঞ্জাবি পরতেন। আব্বা এন্ট্রাস পাশ করার পর দাদা বললেন, ‘পাশ করেছো এখন চাকরি নাও।’ তখনকার যুগে এন্ট্রাস পাশ করে অনেক চাকরি পাওয়া যেতো। কিন্তু আব্বার তো চাকরি করার ইচ্ছা নেই। পরে তিনি বরিশাল বিএম কলেজে ভর্তি হলেন। বাড়ি থেকে চাপটা যখন বেশি হলো তখন পালিয়ে কলকাতায় চলে গেলেন।

কলকাতা তার জন্য একেবারে একটা অচেনা জায়গা। লড়াইটা খুব কঠিন ছিল। এমন হয়েছে যে কোন কোন দিন খাবার পয়সাও ছিল না। একবার এই অবস্থায় কোন এক হোটেলে গেলেন, বললেন যে আমার এই মাফলারটা বন্ধক নেন, আমি দুইদিন খাইনি। হোটেল মালিক বলেছে, ‘খেয়ে যান। পয়সা দেওয়া লাগবে না। চেহারা দেখে তো মানুষ চিনি!‘

এমন হয়েছে দুইতলা বাড়ির বারান্দায় শুয়ে রাত কাটিয়েছেন আব্বা। উপর থেকে পানি পড়েছে। পানি নাকি বাচ্চা প্রস্রাব করেছে কে জানে! বোঝার উপায় নেই। ওখান থেকে উঠে ফুটপাতে শুয়েছেন। সেখান থেকে উঠে গিয়ে পুরোনো ম্যাগাজিন জোগাড় করে বিক্রি করার চেষ্টা করেছেন। আব্বা বলতেন যে, আমার গলা দিয়ে আওয়াজও বের হতো না। লোকজন কিনতে চাইতো না। পুরোনা ম্যাগাজিন কিনে কী করবে! এইভাবে তার একসময় চাকরি হয়ে যায়। পত্রিকা অফিসে চাকরি হয়।

ওই যে চাকরি হলো তখন তার জন্য বিশাল ব্যাপার ছিল। তারপর কলকাতায় আরও চার পাঁচ অফিস ঘুরে একসময় চাকরি হয় ‘আকাশবাণী’ কলকাতায়। আব্বা বড় চুল রাখতেন, বয়সে তরুণ ছিলেন। অনেকে বলতেন, ‘তোমাকে তো মুসলমান বলে একেবারেই মনে হয় না।’ ওই সময় আকাশবাণীতে প্রচুর লেখক আসতেন, অনেকের সঙ্গে তার সখ্য গড় উঠেছিল। ইতোমধ্যে তার কিছু কবিতা বের হয়ে গেছে। তারপর থেকে তিনি মোটামুটি ভালই পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরকম কলকাতায় পুরুষ-নারী পাঠকের সঙ্গেও তার সম্পর্ক হয়। চিঠি চালাচালি হয়।

এমন কোন চিঠি কি আছে আপনার কাছে?

আব্বাকে লেখা ওখানকার স্থানীয় এক মেয়ের প্রেমপত্র আছে আমার সংগ্রহে। ওনার নাম নীলিমা সেনগুপ্ত। কবিতা লিখতেন। একবার কলকাতায় গিয়ে ওনার ফোন নম্বরটা আমি জোগাড় করতে পারি। তাও প্রায় ২০ বছর আগে। প্রথম তিন মিনিট তিনি গম্ভীর আড়ষ্ট ছিলেন। পরে গলা আর্দ্র হয়ে আসে। বললেন, ‘তুমি জানো তোমার বাবার এই কবিতাটি আমার মুখস্থ আছে?’ উনি খুব খুশি হলেন, বললেন- ‘তুমি আসতে চাও’। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ আসতে পারলে ভালো লাগতো।’ কিছু কিছু জিনিস অমীমাংসিত রাখতে হয়। যেমন, তাকে যাওয়ার কথা বলেও আমি যাইনি। আবার যেমন আমি পরিকল্পনা করে পিরোজপুর যাইনি কখনো। কারণ আব্বার শৈশবকে আমার মনের মধ্যে যেভাবে এঁকে রেখেছি ওটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ৫০-এর দাঙ্গার সময় আব্বা বিয়ে করেছেন বগুড়ায়। নানার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের মোক্তার, খুব অবস্থাসম্পন্ন ছিলেন। ৬৪ কি ৬৫ সালে সম্ভবত দৈনিক পাকিস্তান বের হলো, ওই সময় আব্বার চাকরি হলো। ওটাই তার জীবনে প্রথম স্থায়ী চাকরি। ৬৪ সাল থেকে ৮৫ সাল পর্যন্ত ২১ বছর ‘দৈনিক বাংলায়’ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। আমি ওই বংশাল, নবাবপুর ও আরমানিটোলা কিংবা গোপীবাগেই বড় হয়েছি।

আপনার শৈশবের কিছু স্মৃতি মনে আছে এখনও?

আমার শৈশব কাটে মূলত আসাদগেটে। ৬৩ সালে আমরা চলে এলাম আসাদ গেট, তখন ওটার নাম ছিল আইয়ুব গেট। গোপীবাগ থেকে যখন চলে আসি তখন আমার বয়স ৭ থেকে ৮ বছর হবে। ফেইসবুকের সুবাদে শৈশবের অনেক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তবে একজনের কথা খুব মনে পড়ে, তার নাম বাবুন। হিন্দুধর্মের ছিল। ওর সঙ্গে আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুত্ব ছিল। সেসময় সামাজিক সম্পর্কগুলো আলাদা ছিল, সবাই সবাইকে চেনে, সবাই সবার বাসায় যাচ্ছে। কারও বাসায় ভালো রান্না হলে ওই বাসায় চলে যাচ্ছে। কারও ইচ্ছে হচ্ছে তো এই বাসায় চা খেতে চলে আসছে। এমন কালচার ছিল। এই বাবুনের সঙ্গে আমার তিন-চার বছর সম্পর্ক থাকার পর একদিন সকালবেলা দেখি ওরা নেই। আমরা যেখানে ভাড়া থাকতাম তার উল্টোদিকের বাসায় ওরা থাকতো। একটা পরিবার হঠাৎ করে নেই! গভীর রাতে ওরা চলে গেছে। ৬২ সালে দাঙ্গা হয়েছিল। ওই দাঙ্গার পর তারা আর নিরাপদ বোধ করেনি। যতবার কলকাতায় যাই আমার বাবা-মা কোথায় থাকতেন সে এলাকা, সে বাড়ি যেমন খুঁজি, পাশাপাশি বাবুনকে মনে মনে খুঁজি।

বই পড়া কীভাবে শুরু?

আমার চেয়ে ৭ বছরের বড় বোন আমাকে গল্প শোনাতেন। তার গল্প বলার ভঙ্গিটা এমন ছিল যে ওটাই ছিল তার বিশ্বাস। পরিবারে আর্থিক অনটনের মধ্যেও আব্বা যেটা করতেন- বই কিনতেন। এমনিতে তিনি অনেক বই উপহার পেতেন, সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন বলে। কিন্তু তবু তিনি ছোটদের বই কিনতেন, তার ছেলেমেয়েরা পড়বে বলে। এমনিতে বাসায় ছোটদের এতো বই থাকার কোনো যুক্তি নেই। অনেক বই তিনি কিনে কিনে রেখে দিয়েছিলেন এই আশা নিয়ে যে তার ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে পড়বে।

আব্বার কাছে প্রচুর কবি-সাহিত্যিক আসতেন, সন্ধ্যায় বা বিকেলে আড্ডা দিতে। আমি তখন বেশ ছোট। তারপর একটা পরিবেশ তো আছেই বাবা লেখালেখি করতেন বলে। তো পড়াশোনাটা শুরু হয়ে যায় নিজের অজান্তে। পড়তে পড়ত মনে হয়েছে উনি যদি এটা লিখতে পারেন তাহলে আমি কেন লিখতে পারবো না! বড়দের জন্য লেখা আমার প্রথম গল্প প্রকাশ পায় আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি, প্রথম বই বের হয় ৮২-তে।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন? এই ডাইভার্সিটি আপনার সৃজনশীলতায় কীভাবে ভূমিকা রেখেছে?

গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল ও ঢাকা কলেজে পড়াশোনার পর ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রুদ্র (কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, ১৯৫৬-১৯৯১) আর কামাল (কবি কামাল চৌধুরী, ১৯৫৭- ) আমরা একই ব্যাচ। কামাল আর আমি একসঙ্গে ক্লাস করতাম। আর আবুল হাসান (কবি আবুল হাসান, ১৯৪৭-১৯৭৫) আমাদের সিনিয়র। আবুল হাসান ও নির্মলেন্দু গুণ একই বয়সের। হাসান ভাই মনে হয় একটু ছোট। তখন আড্ডা দিতাম ডাকসুর পাশে হাওলাদার ক্যান্টিনে। সেই আড্ডায় সবসময় যে সাহিত্য নিয়ে আলাপ হতো তা নয়, নানা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরীদের নিয়ে তো বটেই। কে বেশি সুন্দরি বা ওই মেয়েটা উঁচু লম্বা- এসব নিয়ে আমাদের জীবন শেষ, যা হয় আরকি। ক্যাম্পাসে আড্ডায় থাকলেও আমি হলে থাকিনি কখনও। মহসিন হলে আমার একটা রুম ছিল, ৫০১ নম্বরে। আমার এক বন্ধুকে দিয়ে দিয়েছিলাম, ওর থাকার জায়গা ছিল না।

লেখালেখি নিয়ে বেশি সোচ্চার ছিল রুদ্র। হৈচৈ স্বভাব ছিল তার। সমস্ত উৎসাহ চিন্তা ওর মাথা থেকে আসতো। তো একদিন আমাকে বললো, ‘চল, তুমি আর আমি বিয়ে করি। আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে ঘুরবো আর একটি করে বিয়ে করবো। আমাদের অনেক সন্তান হবে। প্রতি গ্রামে একটা করে লেখক হবে।’ রুদ্র আর কামালের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই ছিল। কে কত বেশি কবিতা লিখতে পারে আর কার কবিতা কোথায় ছাপা হয়েছে- এসব।

এমন কিছু আছে যা এখনও লিখতে পারেননি, লিখতে চান?

আমি জানি, আমার গল্পগুলোর জন্য আমাকে একদিন না একদিন স্মরণ করবে। তবে আমার কিছু উপন্যাস লেখা বাকি আছে। যেমন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস লেখার ইচ্ছে আছে আমার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের সব লেখকের লেখাই খণ্ডচিত্র।