Published : 20 Jan 2024, 09:50 AM
জাকির তালুকদারের সাহিত্যিক মূল্যায়নের আগে আমরা তার বেড়ে ওঠার ইতিহাসটার দিকে একটু তাকাবো যাতে করে তার মনোগঠনের উপাদানগুলো আমরা ঠিকঠাক বুঝি উঠতে পারি। একখা সবারই জানা যে শৈশব ও কৈশোরের প্রভাব যে-কোনো লেখকের জীবনে প্রধান এক উদ্দীপক ঘটনা হিসেবে কাজ করে তাদের লেখায়।
আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার। শৈশব কেটেছে একান্নবর্তী পরিবারে দাদী-নানী, খালা-ফুপু আর আর বিভিন্ন তুতো ভাই-বোনের সাথে। ছোট বোন মৌলির জন্মের সাথে সাথে মায়ের বিছানা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে দাদীর বিছানা হয়ে ওঠে পরম স্নেহের আশ্রয়। ঘুম না আসা অব্দি দাদী মাথায় হাত বুলিয়ে শোনাতেন রূপকথা, উপকথা, কিসসা-কাহিনি আর রামায়ণ - মহাভারতের গল্প। সেই সুবোধ বালকের চোখ গোগ্রাসে গিলত দাদীর গল্প বলার ঢং আর কান নিবিষ্ট ধ্যানে শুনত গল্পের বিভিন্ন বাঁক বদলের স্বর। এমনই ছিল কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদারের শৈশবের গড়ন।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে যুক্ত হন খেলাঘরের সাথে। তখনই তার মননে এবং মানসে প্রবাহিত হয় মার্ক্সবাদী চেতনা। পড়াশোনায় বরাবরই ভালো এই লেখক অর্জন করেছেন শিক্ষকদের পরম প্রশ্রয় এবং ভালোবাসা। মাধ্যমিক পর্যায়ে ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজ নাটোর এ। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই শুরু হয়েছিল বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাপ্তাহিক সাহিত্য প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ। উচ্চমাধ্যমিকে এই বিষয়গুলো আরও বিস্তৃতি লাভ করে। ছড়া, কবিতা, স্বরচিত গল্প বলা প্রতিযোগিতায় আমাদের লেখক বরাবরই প্রথম হতেন।
উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ভালো ফলাফল নিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে জাকির তালুকদার ভর্তি হন স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে "আন্তর্জাতিক সম্পর্ক" বিভাগে। লেখকের দুচোখে খোদিত হয় রাস্ট্রদূত বা কূটনীতিক হওয়ার স্বপ্ন। লেখক এর ভেতরই চান্স পান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ। লেখকের পিতা পুত্রের ইচ্ছের গুরুত্ব না দিয়ে তাকে ভর্তি করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ। লেখকের পিতা বুঝি যথাযথ কাজটিই করেছিলেন। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময়ে লেখক ছড়া লিখতে শুরু করেন। অনেক ছড়া লিখেছেন তখন তিনি।
কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদারের লেখকসত্তার রূপটির অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যাবে একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে সামগ্রিকতা বা যুথবদ্ধতা লেখকের মানসিকতায় সহজাত হয়ে উঠেছিল। তার সাথে দাদীই মগজে-মননে বুঝি গেঁথে দিয়েছিলেন গল্পের অস্থি-মজ্জা। পরবর্তী সময়ে সমগ্র শিক্ষাজীবন জুড়ে চলেছে সাহিত্য - সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। অষ্টম শ্রেণিতে খেলাঘরের সাথে সংযুক্তি এনে দিয়েছিল মার্ক্সবাদী চেতনা বা গণমানুষের অধিকারের প্রতি মমতা। এরপর পেশা জীবনে মেডিসিনের ডাক্তার হওয়ায় গণমানুষের দু:খ- যন্ত্রণার ভেতর অবগাহন করতে পেরেছেন গভীরভাবেই। কথাসাহিত্য চর্চা করবেন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে সাথে শুরু করেছিলেন প্রস্তুতি পর্ব। পড়েছেন বাংলা সাহিত্যের সমস্ত ক্লাসিক ওয়ার্ক এবং বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত প্রায় সব গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ। লেখকের রাজনৈতিক চেতনা, প্রজন্ম আর দেশের প্রতি গভীর সমর্পণ, এই জনপদে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা, গনমানুষের অধিকারের প্রতি গভীর মমতা লেখক মানসকে করেছে দ্যুতিময়। তাই লেখকের গল্প-উপন্যাসে রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা এসেছে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। মানিক বন্দোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ি, অমিয় ভূষণ মজুমদার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ লেখকরা জাকির তালুকদারের লেখক-মানস তৈরিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলেন। রুটি-রুজি আর শিল্পের বিরোধ যেন চিরন্তন। তাই আমাদের লেখক জাকির তালুকদারের লেখক জীবনেও এসেছে ঘাত-প্রতিঘাত। পরিবার -পরিজন শুরুতেই হয়তো বা দুহাতে তালি দিয়ে লেখালেখিতে উৎসাহ দেয়নি। কারণ লেখালেখি করে অর্থ উপার্জন তখনও খুব সহজ না। এসব সংঘাত লেখক মানসকে করে তুলেছিল আরও অপ্রতিরোধ্য, অদম্য। এনে দিয়েছিল হার না মানার এক দৃঢ় সংকল্প।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে লেখক বলেছেন তিনি- বিনোদন সাহিত্য আর সিরিয়াস সাহিত্য বলে কিছু মানেন না।
তাঁর কাছে একটা বিনোদন অন্যটা আনন্দ। বিনোদন সাময়িক আর আনন্দ মগজের বা মননের গভীর দেশে অবস্থান করে। আনন্দ ভেতরের আমিকে বাইরের আমির সামনে এনে দাঁড় করায়। সিরিয়াস সাহিত্য এই সামনে আনার কাজটি করে অত্যন্ত যত্নে।
লেখক জাকির তালুকদার তাই বরাবরই হেঁটে চলেছেন কাকড়া, বিছা বেছানো অমসৃণ পথে। সংকল্প একটাই: প্রজন্মকে আলোর সন্ধান দেয়া।
জাকির তালুকদারের গল্প বাস্তবতা, কল্পবাস্তবতা, সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতাসহ, যাদু বাস্তবতার সম্মিলনে অনন্য শিল্পোত্তীর্ণ। ২০২০ সালে লেখকের গল্পের সাথে আমার পরিচয়। প্রথমেই পড়ি "শত্রু সম্পত্তি " গল্পটি। গল্পের আখ্যান ভাগে দেখা যায় পাইন্যা বৈকুন্ঠ তিন তাসের জুয়ায় বউ ইন্দুবালাকে বাজি ধরে সুধীর কামারের সাথে। সেই জুয়া সুধীর কামার জিতে বউ হারায় পাইন্যা বৈকুন্ঠ। কথকের ভাষ্যে লেখক লিখেছেন - "বউকে বাজিতে তোলা যায়ই। কুরুক্ষেত্রের পাঁচালিতেই তো সবাই শুনতে পায় বউ দ্রৌপদীকে বাজি ধরে ধম্মপুত্তুর যুধিষ্টির জুয়া খেলেছিল শকুনির সাথে। বাজিতে হারায় দ্রৌপদী গেল দুর্যোধনের দখলে। তখন রাজসভায় তার বস্ত্রহরণ। কিন্তু দ্রৌপদীর সহায় তার সখা। কৃষ্ণঠাকুর বলে কথা। সে-ই বাঁচাল দ্রৌপদীর ইজ্জত। দুর্যোধন কাপড় টানতে থাকে, কাপড় আসতেই থাকে, শেষ আর হয় না। দ্রৌপদীকে ন্যাংটো করার খায়েশ মিটল না দুর্যোধনের-দুঃশাসনের। কিন্তু ইন্দুবালা তো আর দ্রৌপদী নয়। তার শাড়িও এগারো হাতের বেশি লম্বা নয়। কাজেই তা খুলতে সুধীর কামারের কয়েকটা হ্যাঁচকা টানের বেশি লাগেনি।"

সিরাজ মোক্তারের পুত্ররা জড়িত আছে ক্ষমতাসীন দুই রাজনৈতিক দলের সাথে। গল্পের সময় ২০০২। তখন ক্ষমতাসীন হয় বি. এন.পি। সংখ্যা লঘুদের তখন ৭১ সাল। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সাহায্যে ইন্দুবালার সম্পত্তি মানে সুধীর কামারের কাছ থেকে পাওয়া ভিটা হাতছাড়া হয়। সকলে ইন্দুবালাকে পরামর্শ দেয় ইন্ডিয়া চলে যেতে। কিন্তু ইন্দুবালাও কিছুতেই ইন্ডিয়া যাবে না। কারণ অইখানে বৈকুন্ঠ থাকে। তার সাথে দেখা হওয়ার চাইতে নরকে যাওয়াও ভালো।
লেখক ‘শত্রু সম্পত্তি’ গল্পের শরীর বিনির্মান করেছেন রাজনৈতিক বাস্তবতা, মিথ, সংখ্যা লঘুদের প্রতি রাজনৈতিক ভায়োলেন্স সবকিছু নিয়ে। এক গল্পে এতকিছুর নিখুঁত সন্নিবেশ কজন গল্পকার করতে পারেন! গল্পের ভাষা পুরোপুরি নাটোরের কথ্য ভাষার মতো। গল্পটা যেন তিনি বলছেন, লিখছেন না।
এরপর আসা যাক গল্প "বেহুলার দ্বিতীয় বাসর" গল্পে।
এই গল্পটার শরীর পুরোপুরি বেড়ে উঠেছে মিথ-এর ওপর। মনসামঙ্গল কাব্যের নায়ক -নায়িকাই এই গল্পের মুখ্য চরিত্র। চাঁদ সওদাগরের পুত্র লখাই এবং পুত্রবধূ বেহুলাকে কেন্দ্র করে রচিত গল্পে গল্পকারের কবজির জোর এমনভাবেই প্রমাণিত হয়েছে যে আরও পঞ্চাশ বছরে এরকম একটা গল্প বাংলা সাহিত্যে সংযোজিত হবে কি না সন্দেহ আছে।
গল্পের আখ্যানভাগে দেখা যায় - যমপুরী থেকে লখাইকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে বেহুলা। শুধু লখাইকে নয়, উদ্ধার করে নিয়ে আসে চাঁদ বেনের আরও ছয় পুত্রকে, এমনকি ফিরিয়ে এনেছে লখাইয়ের প্রাণের বন্ধু শঙ্কর গাড়ুড়িকে। শঙ্করের আরেক নাম বিষহরা ধন্বন্তরি। সে থাকলে লখাইকে কোনো সাপের বিষ দিয়ে হত্যা করা সম্ভব ছিল না। যে-সাপই দংশন করুক না কেন, সেই বিষ নামিয়ে ফেলা শঙ্কর গাড়ুড়ির বাঁহাতের খেল।
কঙ্কাল থেকে জীবন ফিরিয়ে আনা স্বামী লখাইয়ের সাথে বেহুলার বাসরই গল্পের মূল উপজীব্য। বেহুলা শুধু একবারই দেখেছিল লখাইকে। তারপরই মনসার ষড়যন্ত্রে কালঘুম এসেছিল তার চোখে। একবার দেখেই মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছিল প্রাণনাথকে। তারপর তাঁর প্রাণ বাঁচাতে পাড়ি দিয়েছে কোটি মাইল। গিয়েছে ইন্দ্রের সভায়। নাচ দেখিয়ে মুগ্ধ করে তবেই ফিরিয়ে এনেছে লখাইয়ের জীবন। আজ সেই স্বামীর সাথে বাসর। লখাই এতই রূপবান তাঁকে যে সাপ কামড়েছে সেই রূপ দেখে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল। তাই তো বেহুলার নিরন্তর প্রচেষ্টা প্রাণনাথ যেন মুখ ফিরিয়ে না নেয়। নিজের হাতে রান্না করে, নিজেকে নিখুঁতভাবে সাজিয়ে বসে আছে বাসর ঘরে স্বামীর অপেক্ষায়। কিন্তু গলা শুকিয়ে কাঠ বেহুলার, রাত অনেক হয়েছে সেটা বুঝতে পারে শেয়ালের ডাক শুনে। কিন্তু লখাইয়ের ছায়াও পড়ে না বাসর ঘরে। কোটি মাইল পাড়ি দিয়ে ইন্দ্রের রাজসভায় গেলেও সেদিন বেহুলার যেন শিকর গজিয়ে গেছে বাসর ঘরে। স্বামীর অমঙ্গল আশঙ্কায় নেমে পড়ে বেহুলা। গিয়ে দেখে বিষন্ন চিত্তে তাকিয়ে আছে দীঘির জলে। অবশেষে বেহুলা জানতে পারে কোনো অসতীর সাথে লখাই বাসরে যাবে না। কারণ লম্পট ইন্দ্রকে যৌন নৃত্য দেখিয়ে খুশি করেই বেহুলা ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে স্বামীর জীবন। বেহুলার নাচে বীর্য খলন হয়েছে ইন্দ্রের।
লখাইয়ের উক্তি- "নিজের প্রাণের জন্য কোনো সত্যিকারের পুরুষ কখনো স্ত্রীকে বা প্রিয়তমাকে অন্যের দৃষ্টির লালসার শিকার হতে দেয় না। আমি ছিলাম মৃত। তা না হলে আমি কখনো তোমাকে ইন্দ্রের মতো লম্পটের সভায় যেতে দিতাম না। নৃত্যমুদ্রায় লম্পটের বীর্যস্খলন ঘটিয়েছ তুমি। আমি পুরুষ হিসেবে এটা সহ্য করতে পারি না। তোমার যোনিগর্ভে না হলেও ইন্দ্রের সেই বীর্যস্খলন ঘটেছে তোমার উদ্দেশেই। তুমিই তাতে ইন্ধন জুগিয়েছ কামোদ্দীপক নৃত্যের মাধ্যমে। আমার চোখে, পুরুষের চোখে – তুমি অসতী।"
হতবিহ্বল বেহুলা তাকিয়ে দেখে লখাইয়ের চলে যাওয়া আর তার কানে বাজতে থাকে - পুরুষের চোখ, পুরুষের চোখ!
মনসা মঙ্গল কাব্যের আখ্যানই বেহুলার দ্বিতীয় বাসর গল্পের উপজীব্য। গল্পের ভাষা,ব্যবহৃত শ্লোক, ডিটেইলিং, টুইস্ট সবই বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করে। সাহিত্যজাত সাহিত্য ও যে কালোত্তীর্ণ হতে পারে তা জাকির তালুকদার প্রমাণ করে দিয়েছেন।
‘মাতৃহন্তা’ পুরোপুরি যাদু বাস্তবতার গল্প। এক পরগণায় বটগাছ নেই। পরগণার পুরুষরা চায় না নারীরা বটগাছের নামও জানতে পারুক। নারীরা তৎপর হয়ে রোপণ করে বটবৃক্ষ। বহু ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে বটচারা যখন বটবৃক্ষে রূপ নেয় তখন এক রাতে নারীরা দেখতে পায় ঘর পুরুষশূন্য। গিয়ে দেখে বটবৃক্ষের সামনে নেচে চলছে এক নর্তকী। নারীদের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি জেরায় নর্তকী জানায় সে যক্ষী, যক্ষের সাধনার জন্য বটবৃক্ষে অধিষ্ঠান হতে চায়। নেচে চলছে কারণ না নাচলে সে পুরুষের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে না।
নারীরা তাকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিলে যক্ষী বলে-- এই রাতটা পেরুলেই চলবে। এরপর ব্যঙ্গমা- ব্যাঙ্গমী চলে আসলে তারাও তাকে(যক্ষীকে) বাঁচাতে পারবে।
বটবৃক্ষ যখন ডালপালা ছড়িয়ে মহীরুহতে পরিণত হচ্ছে- তখন পুরুষরা খুব বিষন্ন থাকে। নারীরা জানতে চায় কী সেই পাপ যা পুরুষদের এমন বিমর্ষ রাখে?
অবশেষে ব্যাঙ্গমা -ব্যাঙ্গমী জানায় সেই অতীত। ঈশ্বর প্রদত্ত রাজার কাছে চরম খরায় খাবার চাইলে রাজা বলেছিল নারীদের পাঠাতে। রাজা থাকতেন রাজ প্রাসাদের ভেতরে আরেক রাজ প্রাসাদে। কেউই কোনোদিন রাজাকে দেখেনি। এরপর রাজার তরফ থেকে এসেছিল হাড়ির পর হাড়ি সুস্বাদু গোশত। বহুদিন পর পুরুষদের খেয়াল হয়। নারীরা আর ফেরেনি। মাংস খেয়ে পুরুষদের গতরে এসেছিল অসুরের শক্তি। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে পুরুষরা রাজার প্রাসাদের ফটক পেরিয়ে দেখে এক বনসাই। পুরুষরা প্রবেশ করার সাথে সাথে বনসাই পরিনত হয় মহীরুহ বটবৃক্ষে। তার ডালে ঝুলতে থাকে অসংখ্য কঙ্কাল। জলদগম্ভীর কণ্ঠে শোনা যায় এক আওয়াজ - আমিই তোদের রাজা। তোদের নারীদের নির্যাস আর কঙ্কাল নিয়েছি আমি আর তোদের পাঠিয়েছি মাংস। বর্তমান পুরুষরা শুনছিল ব্যাঙ্গমার বলা কাহিনি। আর তাদের মনে পড়ে যায় তারা মাতৃমাংস ভক্ষণকারী।
"মাতৃহন্তা" গল্পে জাকির তালুকদার যাদু বাস্তবতার চুড়ান্ত প্রয়োগ দেখিয়েছেন।
"মানিক বাঁড়ুজ্জের সাথে যাবার সময়" সত্যেরও অধিক সত্য বুক ভাঙা গল্প। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের অভাব -অনটনের কথা আমরা সবাই-ই জানি। কিন্তু তা যে কত সুতীব্র তাই এই গল্পে মূর্তিমান করে তুলেছেন জাকির তালুকদার। মরা বাচ্চা প্রসব করে মানিকের স্ত্রী খুশি হয়েছিলেন কারণ খরচ বেঁচে যাবে। মানিকের ভাইয়েরা ছিলেন বড় বড় কর্মকর্তা। অথচ বাবাকে রাখতেন মানিকের জরাজীর্ণ অভাবের সংসারে। অবস্থা যখন ভীষণ সংকটাপন্ন তখন দেখতে গিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন - অবস্থা এত খারাপ আমাদের টেলিফোন করেননি কেন? মানিকের স্ত্রী ডলি বলেছিলেন - তাতে তো পাঁচ আনা পয়সা লাগে ভাই! ভাইয়ের কাছে মানিক চিকিৎসার জন্য মাসে একশো টাকার সাহায্য চেয়েছিলেন, সাহায্য চেয়েছিলেন প্রকাশকদের কাছেও। সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে জীবদ্দশায়। অথচ মৃত্যুর পরে তাঁর খাটিয়ার পায়া ফুলের ভারে ভেঙে পড়েছিল। লেখকের ন্যারেশনে আমরা পাই--
"হঠাৎ গোপাল হালদার নিচ থেকে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সন্ত্রস্ত ইশারা করে দেখালেন—ফুলের ভাড়ে সুদৃশ্য দামি পালঙ্কটির এটা পায়াতে ফাটল ধরে গেছে। একচোখ খোলা একচোখ বন্ধ মানিক বাঁড়ুজ্জে তখন বোধহয় তীব্র বিদ্রূপে হাসছিলেন। হয়তো নিঃশব্দে কিছু বলছিলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবি মানুষ। মৃতদের ঠোঁট না নড়িয়ে বলা কথাও বুঝে নিতে পারেন। তিনি পরে মানিক বাঁড়ুজ্জের সেই বিদ্রূপকে ভাষাতে রূপ দিয়েছিলেন—
‘ফুলকে দিয়ে
মানুষ বড় বেশী মিথ্যে বলায় বলেই
ফুলের ওপর কোনদিনই আমার টান নেই।
তার চেয়ে আমার পছন্দ
আগুনের ফুলকি—
যা দিয়ে কোনদিন কারো মুখোশ হয় না।’
শোকের মুখোশ পরা আমাদের মুখগুলো তখনো এই জনসমক্ষে মানিক বাঁড়ুজ্জের মতো বিদ্রূপের হাসি হেসে ওঠার সাহসটুকু সঞ্চয় করে উঠতে।”
এ ছাড়াও আছে "তাহাদের কথা" "কন্যা ও জলকন্যা" "গোরস্তানে জোছনা " সবগুলো গল্পই বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ সংযোজনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শেষ কথা: জাকির তালুকদার গল্প লিখেছেন মোট ৮৫ টি। লিখেছেন বাঙালি জাতির শেকড় চেনানোর উপন্যাস "পিতৃগণ" এবং ধর্ম আর ধর্মান্ধতাকে আঙুল দিয়ে দেখানো উপন্যাস- “মুসলমান মঙ্গল”। কলকাতা দেজ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়েছে “জাকির তালুকদারের পঞ্চাশটি গল্প”। এটিও বাংলাদেশের সাহিত্যের জন্য এক অনন্য অর্জন। যারা নতুন লিখতে এসেছেন এবং যারা গল্প পাঠে গভীর আনন্দ পেতে চান - তারা নিবিড়ভাবে পাঠ করলেই বুঝবেন গল্পগুলোর অভিঘাত। জাকির তালুকদারকে প্রজন্ম আরও ব্যাপক ভাবে জানবে আত্মিক গরজে। সেটা একান্ত প্রত্যাশা।