Published : 18 Nov 2025, 10:25 PM
আচ্ছা, মানুষ কি ঘুমের মধ্যেও চিন্তা করে? আর মানুষ কি শুধু চিন্তাই করে? শুধু চিন্তাই সম্বল এমন মানুষকে কী বলা যায়! চিন্তা যদি অর্থরূপ সৃষ্টি না করে তবে চিন্তার প্রতিভা কীভাবে প্রকটিত হয়? যা হয় তা হলো নির্বেদ ও নৈরাত্ম্য।
ইউরোপে উপন্যাস বর্তমানে যে ডিস্টোপিয়ান ভাষায় ও চেতনায় পতিত বা গঠিত, তার সিদ্ধ ও শুদ্ধ প্রমাণ মিলে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে। এটা সেই রাজা মিনোসের ল্যাবিরিন্থ যাতে আটকে পড়েছে ইউরোপ। তবে এটা তাদের স্বখাতসলিল। অথবা এটা ইউরোপীয় হেজিমনি প্রতিষ্ঠার আরেক রূপ যার বৈশিষ্ট্য হলো লগোসেন্ট্রিজম। এই স্বনকেন্দ্রিকতা আমাদের নয়। আমাদের কাছে শব্দ হলো শব্দব্রহ্ম যার মধ্যে চৈতন্য থাকে। শব্দে যখন চৈতন্য থাকে তখন শব্দ হয় আত্মপ্রসারী। কিন্তু ইউরোপে শব্দ তা নয়।
ভাষা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তা যদি ভাবনার প্রভুগিরি করে তবে তা দিয়ে নতুন সাহিত্যসৃষ্টি কি সম্ভব? হলেও কি তা হবে ভাবনার কবরের ওপর ভাষার নগ্ননৃত্য? সেই শত বছর আগে জয়েস, প্রুস্ত, কাফকারা যা করেছেন তারই চর্বিত রূপ এখনও রাজত্ব করছে ইউরোপে। জয়েসদের হাতে তাঁদের ভাবনারা তাঁদের ভাষাকে গড়ে দিয়েছিল যা ছিল অনির্দিষ্টময়তার একটি মেটানিমি। কিন্তু এখন? চর্বিতচর্বণ। গত কয়েক বছরের ইউরোপের নোবেলপ্রাপ্ত লেখকদের লেখাই এর একমাত্র প্রমাণ। ইয়ান ফসের ‘সেপটোলজি’ বা তারও আগে সারামাগোর ‘অন্ধত্ব’ থেকে যে যতিহীন ভাষাচর্চার পুনঃপুন রূপায়ণ, তা যেন এক নিওলিথ স্তব্ধতার রাগমোচন। যতিমুক্ত ভাষাপ্রবাহের যে সূচনা জয়েস করেছিলেন ‘ইউলিসিস’-এ , তা ছিল অসাধারণভাবে নতুন। তা ছিল ডিক্রিয়েটিভ উপন্যাসের একটি শৌর্য, চেতনাপ্রবাহের অপরূপতা, শব্দের খেইল। ভাষা সেখানে ফর্ম ও কনটেন্ট---দুটিই। ‘ইউলিসিস’-এর শেষ ষাট পৃষ্ঠার দিকে তাকালেই তা অনুভব করা যায়: ‘‘ওহ, আর সমুদ্র আর লাল টকটকে সমুদ্র মাঝে মাঝে যেন আগুন আর সেই মহার্ঘ সূর্যাস্ত আর অ্যালামেডা বাগানে ডুমুরগাছ আর অবশ্যই সব ছোটোখাটো বিচিত্র পথঘাট আর ফ্যাকাশে লাল আর নীল আর হলুদ রঙের বাড়িগুলো আর গোলাপবাগান আর জুঁই আর জেরেনিয়াম ফুল আর ক্যাকটাস আর কিশোরীর মতো জিব্রালটার যেখানে পর্বতের ওপর আমি ছিলাম ফুল হ্যাঁ যখন আন্দালুসীয় বালিকাদের মতো আমি চুলে ফুল গুঁজি বা পরে নিই লাল হ্যাঁ মুরদের দেয়ালের নীচে কীভাবে সে আমাকে চুমু খেল আর আমি তাকে ঠিক ভাবি যেন অন্য কেউ একজন আর তখন চোখ দিয়ে তাকে জিজ্ঞাস করি আবার জিজ্ঞেস করি হ্যাঁ এবং তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি কি বলি হ্যাঁ বলি আমার পাহাড়ি ফুল আর প্রথমেই আমি তাকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরি হ্যাঁ তাকে আকর্ষণ করি আমার দিকে যেন সে অনুভব করতে পারে আমার স্তনযুগল পুরোসমস্ত সুগন্ধ হ্যাঁ আর তার হৃদয় মাতালের মতো ধুকধুক করছিল আর আমি বললাম হ্যাঁ বলব আমি হ্যাঁ।’ এই ন্যারেটিভটি একটি সম্প্রসারিত রূপক বা রূপকের বিস্তারক্ষেত্র যা মানবমনের অনিঃশেষ ভাবনাপ্রবাহকে প্রকাশ করে--- অভীপ্সা, যৌনতা ও জীবনের প্রতি সম্মতিকে প্রকাশ করে। এখানে ন্যারেটিভ আসে গল্প বলার জন্য নয় বরং তা এখানে স্বপ্নের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে চেতনাপ্রবাহর । এখানে ন্যারেটিভ ঘটনার বর্ণনাকারী নয় । এটা মনের, ইতিহাসের ও ভাষাপ্রবাহের ভিন্নতর প্রতিফলন ঘটায়। এখানে প্লট মুখ্য নয় , মুখ্য হলো মনের প্রবাহকে প্রকাশ করা যা একটি উপযুক্ত ভাষার মাধ্যমে উপস্থাপিত। কিন্তু জয়েসের এই সৌন্দর্য এখনকার ইউরোপীয় লেখকদের হাতে এসে যেন ভাষার সমাধির স্তম্ভ হয়ে পড়েছে। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য থেকেও ইউরোপ যেন কিছু শিখতে চায় না। বিষয়ভাবনা এখনও সেই কাম্যুর আত্মহত্যাভাবনা, নিরর্থকতা, নিরাশাবাদে নিমজ্জিত; অথচ এগুলি তো অস্তিত্বের পেরিয়ে আসা প্রাথমিক অভিজ্ঞতা, উত্তরআধুনিক জীবন তো এসব নিয়েই শুরু হয়, এসব এক আরম্ভ । ন্যারেটিভও সেই বিপরিণামি নৈরাশ্যের স্বগতকথন। পরিণয়ে জন্ম নেয় এক দমবন্ধকর ক্লসটোফোবিক পরিসর।
কিন্তু কেন ইউরোপ এসব করে? ইউরোপ ভাষার ‘অ্যাপোরিয়া’ বা ‘অন্ধ এলাকা’ সৃষ্টি করতে চায় যেন তা অন্যরা না করতে বা না বুঝতে পারে। বা করলেও তা ইউরোপের অনুসরণের দোষকে বহন করতে হয়। একে বলা হয় an echo singing off-key.
এক্ষেত্রে একটি উপভাবনার অবতারণা করা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হবে না: ইউরোপ মনে করে উপন্যাস তাদের আবিষ্কার; শুধু তা-ই নয়, তাদের সাহিত্য। উপন্যাসকে যদি ১৮-১৯ শতকের ইউরোপীয় উদ্ভাবন বলে মনেই করা হয় তবে এর দীর্ঘ ইতিহাসকে অস্বীকার করা হয়। কারণ, উপন্যাস একটি বিশ্বজনীন প্রপঞ্চ যা সময়ের তালে তালে এবং সময়ান্তরে নতুনভাবে বিকশিত হয়েছে মাত্র। উপন্যাসকে অর্বাচীন ভাবা শুরু হয় এবং অবমূল্যায়ন করা শুরু হয় আমাদের ঐতিহ্যগতভাবে পাওয়া সাহিত্যিক উচ্চাবচতা থেকে। যেমন, গদ্যের চেয়ে কাব্যকে উচ্চতর ভাবা, বাস্তববাদকে বাদ দিয়ে বা আবিষ্কার না করে আদর্শবাদকে একমাত্র ও শ্রদ্ধেয় করে রাখা। উপন্যাসকে মহৎ সাহিত্য বা ক্যানোনিকাল লিটারেচার না-মনে করার কারণ হলো, এটিতে নিম্নবর্গের চরিত্র, দৈনন্দিনতা, শারীরিক অভিজ্ঞতা, নারীর প্রতি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটে, ফলে তা নিকৃষ্ট। পূর্বেকার ধারণা ছিল যে মহৎ সাহিত্য বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায় বা তাকে অবজ্ঞাও করে, কিন্তু উপন্যাস বাস্তবতাকে জোরে ধরে রাখে এবং বাস্তবতায় বারে বারে ফিরে আসে। সত্য হলো, বাস্তবতার কাছে বারে বারে ফিরে ফিরে আসার মানে হলো উপন্যাস বারে বারে বাস্তবতাকে আবিষ্কার করতে চায়। আবার উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কারণও কিন্তু এই বাস্তবতার আবিষ্কার যা পাঠকের মনোবাস্তবতার সঙ্গে মিলেমিশে যায়। উপন্যাসের একটি মুক্ত বেগ আছে যা দিয়ে উপন্যাস সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক-ব্যক্তিক এলাকাগুলোতে অনায়াসে প্রবেশ করে। উপন্যাসের কণ্ঠস্বর বহুস্বরিক, বহুপ্রাণিক, বহুবাস্তবিক।
কিন্তু উপন্যাসের শুরু ১৭৪০ সালে রিচার্ডসনের ‘পামেলা’ উপন্যাস দিয়ে, এ ধরনের ইউরোপি প্রচলিত ধারণাকে, ঐতিহাসিক সত্যকে এড়িয়ে একটি পাশ্চাত্য-প্রচারণা বলে অভিহিত করেছেন অনেক আলোচক। এবং এ ধরনের প্রচারণা উপন্যাসকে আধুনিক ও ইউরোপীয় আবিষ্কার ভাবতে শিখিয়েছে। আমরা তত্ত্বকে বর্ণনামূলক না করে নির্দেশনামূলক করে ফেলেছি। ফলে উপন্যাস হয়ে পড়েছে সংকীর্ণ বৈশিষ্ট্যমূলক যা কেবল কিছু ইংরেজি রচনার সঙ্গেই মিল খায়। উপন্যাস মানেই যে কেবলই বাস্তবধর্মী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা মনস্তাত্ত্বিক উপাদানে রচিত হতে হবে, তা পশ্চিমি ধারণা। প্রাচীন এশিয়া, আরব বা প্রাচীন গ্রিস বা রোমের অনেক রচনাই উপন্যাসের এই শর্তের বাইরে, তবুও তারা উপন্যাসই। এ প্রসঙ্গে প্রাচীন গ্রিসের আকিলেস তাতিউস রচিত ‘লেউসিপ্পে অ্যান্ড ক্লিতোফোন’ এবং সংস্কৃত সাহিত্যের ‘দশকুমারচরিত’ ‘বেতালপঞ্চবিংশতিকা’র কথা বলা যায়, যেখানে রয়েছে গল্পের ভেতরে গল্প, যেগুলোকেও আলোচকরা বলেছেন উপন্যাস। এছাড়া পেত্রোনিয়ুস আরবিত্রের-এর ‘সাতিরিকন’ একটি প্রায়-উপন্যাস, সপ্তদশ শতাব্দে ইউরোপীয় ভাষায় এর পুনঃপ্রকাশ এক বিরাট প্রভাবকারী বিষয় হয়েছিল। আমরা এখানে অবশ্যই মনে রাখব যে প্রথম উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করা হয় চ্যারিটন অব আফ্রোদিসিয়াস-এর লেখা ‘খায়রেয়াস ও ক্যালিরোই’-কে যা খ্রি.পূ. প্রথম শতাব্দে প্রাচীন গ্রিক কইনে ভাষায় রচিত হয়। এটি ছিল একটি প্রেম ও অভিযানভিত্তিক উপন্যাস।
উপন্যাসকে পাশ্চাত্য আধুনিকবাদী প্রকল্পের মধ্যে রেখে দেওয়ার অর্থ ইতিহাসকে বা ঐতিহাসিক নিশ্চয়তাবাদকে অস্বীকার করা। সমালোচকরা মনে করেন, উপন্যাসের ধারণাকে ইউরোপীয় কুঠরিতে বন্দি করে রাখলে তা হবে প্যান্ডোরা বাক্স খোলার মতো কষ্টময় বিষয়, তা না করে তাকে বিশ্বজনীন ভাবা উচিত। উপন্যাসের জন্ম আধুনিক ইউরোপে--মূলত এ মিথ্যা ধারণার সূত্রপাত হয় ইয়ান ওয়াট-এর ‘দ্য রাইজ অব দ্য নভেল ‘ বইটির মাধ্যমে, যেখানে ওয়াট তিনজন মহাশক্তিধর ঔপন্যাসিককে উপন্যাসের ফাউন্ডিং ফাদার হিসেবে হাজির করেন: রিচার্ডসন, ফিল্ডিং ও ডিফো। ওয়াট রিচার্ডসনের ‘পামেলা’ উপন্যাসের আলোচনার শুরুতে ফরাসি লেখক মাদাম দ্য স্তায়েল-এর কথা উল্লেখ করেছেন এভাবে যে, প্রাচীনকালে কোনো উপন্যাস ছিল না এ কারণে যে নারীদের সামাজিক অবস্থান নীচু ছিল তখন। ক্লাসিক্যাল জগতে নারী-পুরুষের আবেগময় সম্পর্ককে কম গুরুত্ব দেওয়া হতো; তখন রোমান্টিক প্রেমের বিষয়টি ছিল না। এসব ক্লিশে ও লোকঠকানো কথাকে বাদ দিয়ে এক্ষেত্রে আমরা এতটুকুন বলতে পারি: পাঠকগোষ্ঠীকে তৈরি করে একটি আলাদা ধারার উপন্যাসের সৃষ্টি ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতাব্দে হয়েছে। এবং প্রোটেস্ট্যান্ট ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও পুঁজিবাদের উত্থানের সঙ্গে উপন্যাসের বিকাশের সম্পর্ক রয়েছে। এর এখনকার কাঠামোগত ও উদ্দেশ্যগত দিকের সঙ্গে অষ্টাদশ শতকের সংশ্লিষ্টতা অনস্বীকার্য। সুতরাং উপন্যাস বহু সময় ধরে বিকশিত একটি সাহিত্যধারা, তবে এর আগের ভুলে-যাওয়া ইতিহাসের সঙ্গে আমরা বিশেষভাবে বিবেচনায় আনব প্রাচীন যুগে লাতিন ভাষায় রচিত লুসিয়াস এপুলিয়াসের স্বর্ণগর্দভ, ১০০৪ সালে মুরাসাকি শিকিবুর ‘গেঞ্জি উপাখ্যান’, ত্রয়োদশ শতাব্দের আইসল্যান্ডীয় গাথা, আরব্য রজনির বিখ্যাত ‘আলিফ লায়লা’ এবং অবশ্যই অষ্টাদশ শতকের চিনের বিখ্যাত ও বিশাল ধ্রুপদি উপন্যাস ‘ড্রিম অব দ্য রেড চেম্বার’-কে। আর আধুনিক উপন্যাস হিসেবে ষোড়শ শতাব্দের ‘দোন কিহোতো-কে।
এখানে আরেকটি কথা বলব, যে-কোনো বিশ্লেষণকে কঠিন থেকে সহজে রূপান্তরিত করা একটি সহজিয়া প্রথা, আবার সহজকে কঠিন করে তোলা একটি নৈয়ায়িক প্রথা। দুটিই গ্রহণীয়। কিন্তু উপন্যাস জন্মগত ভাবেই পাঠকানুকূল হওয়ার দায়কে বহন করে চলছে। এর একটি বড়ো অংশ হলো রস পরিবেশন করা, পাঠককে আনন্দ দেওয়া। যদি তাকে দার্শনিক বা প্রাবন্ধিক ভাষায় পরিণত করার চেষ্টা করা হয় তবে তার চরিত্রহানির আশঙ্কা দেখা দেয়। ইউরোপ এই কাজটি করে শিল্পের জায়গা থেকে নয়, ক্ষমতার জায়গা থেকে। এই ‘ট্রান্সফারেন্স’ তাদের অহমের একটি প্রকাশ। তাই অনেকক্ষেত্রে ইউরোপের সাহিত্য আমাদের কাছে সৃষ্টিহীনভাবে ‘অচেনা’ একটি প্রপঞ্চ যা ‘টার্টল শেল’-এ আটকে রাখে আমাদের। ইউরোপের এই ফাউন্ডেশনালিজম আমাদের শাসন করে।
সুতরাং উপন্যাস নিয়ে ইউরোপের এই ছদ্ম-ইতিহাস প্রণয়নকে আমরা রিভিশানিজমের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারি। ফুকো বলেছেন, যেখানে ক্ষমতা রয়েছে সেখানেই সত্য নির্মিত হয়। সুতরাং ইউরোপের দেখা হিস্ট্রিসিজম নয় বরং ফলস হিস্ট্রির ওপর ভিত্তি করে আছে ইউরোপীয় জ্ঞানবিশেষ যা অনুসরণ করা গেলেও অনুকরণ করা দোষ্য।
ইউরোপের এই ভাষাক্রীড়া ভাষাশ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার একটি সাবভারসিভ পদ্ধতি। ভালো করে দেখবেন, এই ভাষা অনুবাদঅযোগ্য। কারণ এই ভাষা কোনো প্রতিস্থান তৈরি করতে দেয় না, এই ভাষার প্রতিভাষাও অসম্ভব। তাই জয়েস, প্রুস্ত, কাফকা, মুজিল, হাওয়ার্ড বাংলায় বা অন্য অনেক ভাষায় অনুবাদ অযোগ্যই হয়ে আছে, এঁদের পড়তে হলে মূল ভাষায় পড়তে হবেই। আর মূল ভাষায় পড়া মানে এপিস্ট্রোমিক ইউরোসেন্ট্রিজমকে স্বীকার করে নেওয়া।
ভাষা নিজেই নিজের স্পেস নেয় কিন্তু ভাবনা দূরস্পর্শী না হলে সেই ভাষা হয় খোলামকুচি বা ভাঙা কলসের টুকরার মতো যা হয়তো স্মরণ করিয়ে দেবে যে একদা এখানে পানীয় জল ছিল। কিন্তু তা দিয়ে কি এখনকার পাঠকের তেষ্টা মিটবে?
আসলে ইউরোপের উদ্দেশ্য হলো লগোপ্যাথি সৃষ্টি করা যা পাঠককে ধন্দে ফেলে দিতে পারে। আমরা যদি জয়েসের ‘ইউলিসিস’কে পেরিয়ে ‘ফিনেগানস ওয়েক’-এ আসি তবে কী পাব? পাব এক ধরনের চরমমাত্রার নন-রিডেবিলিটি যা হারমেটিক যা অস্তিত্বকে অস্বীকার করে অগ্রসর হতে চায়, ভাষার বিস্ফোরণের কোটরে আবদ্ধ করে রাখতে চায়, জ্বালিয়ে দিতে চায় চারপাশ। কিন্তু কথা হলো অস্তিত্বকে অস্বীকার করে সাহিত্য কী করে বিকশিত হতে পারে। পাঠের ক্ষেত্রে শব্দ অপেক্ষা ভাষার দায়িত্ব অনেক বেশি। এক্ষেত্রে শব্দের কাজ হলো ভাষার অগ্রগামিতাকে সহায়তা করা। কিন্তু ইউরোপের সাহিত্যে ভাষা যেন শৈলস্তব্ধতা নিয়ে হাজির হয়।
এর কারণ লুকিয়ে আছে ইউরোকেন্দ্রিকতায়। এটি শুরু হয়েছে উপনিবেশকালে কিন্তু এখন চলছে এর নতুন বিন্যাস ও বিস্তার। এটি ভাষার সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বকে প্রভাবিত করে । ভাষা হয়ে ওঠে হেজিমনির একটি মাধ্যম। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এটা সাহিত্যিক ক্যানন-এর প্রতিষ্ঠা করে যার দ্বারা রটনা করা হয় যে বিশ্বসাহিত্যে ইউরোপীয় মানদণ্ডই সেরা, তারাই দৃক ও দিশারী।