হুমায়ূন আহমেদের ক্রিকেট-ভাবনা: তাঁর অগ্রন্থিত দু’টি লেখা

“বাংলাদেশের বোলাররা ভাল দেখিয়েছেন। আমার কাছে বোলারদের বিনয়ী মনে হয়েছে।”

হাসান হাফিজহাসান হাফিজ
Published : 13 Nov 2022, 02:31 AM
Updated : 13 Nov 2022, 02:31 AM

জননন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন ১৩ নভেম্বর। ১৯৪৮ সালের এই তারিখে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মৃত্যু ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক পদ থেকে স্বেচ্ছা-অবসর নিয়ে লেখালেখি ও চলচ্চিত্র নির্মাণে মনোনিবেশ করেন। বহুমাত্রিক তাঁর সত্তা ও প্রতিভা। কথাশিল্পী, নাট্যকার, কলামিস্ট, রম্যলেখক, চলচ্চিত্রনির্মাতা, গীতিকার, সৌখিন জাদুশিল্পী, পর্যটক, তুখোড় আড্ডাবাজ, বৃক্ষপ্রেমিক, বন্ধুবৎসল, দুর্দান্ত গল্পবলিয়ে--একের মধ্যে অনেক গুণের সমাবেশ। তাঁর ক্রীড়ানুরাগও ছিল প্রবল। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে আমি যখন দৈনিক জনকণ্ঠে সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগদান করি, তার পরের বছর ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। সেবারই প্রথম বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসরে যোগ দেয়। অভিষেক ম্যাচটি ছিল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। তারিখ ১৭ মে ১৯৯৯।

আমার ওপর দায়িত্ব বর্তায় হুমায়ূন আহমেদের নিয়মিত একটি কলাম যেন জনকণ্ঠে ছাপা হয় নিয়মিত, সে ব্যবস্থা করা। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বা অপরাধে (!) এই শাস্তি। পেশাগত কারণে সেটা বাধ্য হয়ে সেই গুরুদণ্ড আমাকে হজম করতে হয়। জীবিকা বলে কথা! এড়ানোর কোনো উপায় ছিল না। হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে লেখা আদায় করা (একটা দুটো নয়, বেশ কয়েকটা) যে কী সুকঠিন কাজ, তা ভুক্তভোগীরাই কেবল জানেন। এর চেয়ে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করা হয়তো সহজতর। আনন্দের কথা, সেই অগ্নিপরীক্ষায় ব্যর্থ হইনি। উত্তীর্ণ হয়েছিলাম ডিস্টিংশনসমেত! টুর্নামেন্ট চলাকালীন বেশ কয়েকটা লেখা আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলাম। দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত তাঁর দু’টি লেখা (ক্ষুদ্রাকার অতিথি কলাম) এখানে। এগুলো এখনো অব্দি তাঁর কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় নি। ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’ বের হয় ২৭ মে ১৯৯৯ এবং ‘বাংলাদেশের খেলা ও আমার ঈদের নাটক’ ছাপা হয় ২৯ মে ১৯৯৯। এখনও পর্যন্ত অগ্রন্থিত লেখা দুটি প্রকাশ করার মাধ্যমে তাঁর জন্মদিনটি স্মরণ করা হলো।

বাংলাদেশের খেলা ও আমার ঈদের নাটক

অনেককাল আগে বাংলাদেশ টিভির জন্য আমি ঈদের নাটক লিখতাম। রোজার ঈদের রাতে সেই সব নাটক প্রচারিত হতো। খুব সম্ভব ছ’টি বা সাতটি নাটক লিখেছি। নাটক দেখে দর্শকদের লাভ কি হয়েছে জানি না। আমার লাভ একটাই, ঈদ মাটি। নাটক কেমন হবে, এই টেনশনে ঈদের দিনটা অসহ্য বোধ হতো। মেহমানরা বাসায় এসে আমাকে দেখে প্রথম যে প্রশ্নটা করত, সেটা হচ্ছে “কি ব্যাপার হুমায়ূন সাহেবের কি শরীর খারাপ?” ঈদের নাটক লেখা আমি ছেড়ে দেই মূলত টেনশন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য।

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলা দেখতে গিয়ে আমার মনে হলো, আমাদের খেলোয়াড়দেরও কি এই অবস্থা হচ্ছে? টেনশন থেকে মুক্তি পাবার জন্য তাঁরা কি খেলা ছেড়ে দেবার কথা ভাবছেন? নিজের দলের সাফল্যের আনন্দ যেমন সীমাহীন, ব্যর্থতার বেদনাও তেমন সীমাহীন। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা যখন বল মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল বল না ওরা যেন আমার পিঠে ব্যাট মেরেছে। আমি আর্তনাদ করতে করতে মাঠের বাইরে ছুটে যাচ্ছি। আবার আমাদের ব্যাটসম্যানরা যখন বল মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছেন, তখন নিজেকে বল মনে হচেছ, তবে পাখি বল। যে পাখি আনন্দে নাচতে নাচতে, উড়তে উড়তে সীমানার বাইরে যাচ্ছে। এই আলো এই অন্ধকার নিয়ে খেলা দেখার কষ্ট যে এত প্রবল, সে ধারণা আগে ছিল না।

গত খেলায় মজাদার কি ঘটেছে তা বলি। আকরাম খান ব্যাট করতে এলেন। দর্শকরা প্রায় এক সঙ্গে বলল, “কখন আউট হবে? কখন আউট হবে?” যখন শূন্য রানে তিনি আউট হলেন দর্শকদের একজন বললেন, বাঁচলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাঁচলেন কেন?

তিনি বললেন, খান সাহেব ত্রিশ থেকে চল্লিশটা বল নষ্ট করে শূন্য রানে বিদায় হতেন, এখন অল্প বল নষ্ট করেই বিদায় হয়েছেন। আকরাম খাঁর দ্রুত আউট হওয়া বাংলাদেশের জন্য অভিশাপের মুখোশ পরা আশীর্বাদ। কেউ শূন্য রানে আউট হলে বড় বড় খেলোয়াড়দের উদাহরণ টানা হয়--যারা শূন্য রানে আউট হয়েছেন। শচীন তেন্ডুলকার কবে কোথায় শূন্য পেয়েছেন... এইসব। তাদের ব্যাপার ভিন্ন। তারা কোন একটা খেলায় শূন্য পান, কিন্তু আগের এবং পরের দশটায় সেঞ্চুরি করেন। কোন খেলোয়াড় প্রতিটা খেলায় শূন্য করবেন এবং আমরা তাঁর শূন্যকে শচীন তেন্ডুলকারের শূন্যের সঙ্গে তুলনা করব, তা হয় না।

যে সব দিনে বাংলাদেশের বোলিং ভাল হয়, অবধারিতভাবে সে সব দিনে তাদের ব্যাটিং হয় খারাপ। ব্যাটিং ভাল হলে বোলিং খারাপ। কোন কোন দিন ফিল্ডাররা লাফ দিয়ে শূন্য থেকে উড়ন্ত বল লুফে নেন। আবার তিনিই কোন কোন দিন হাতে বল ধরেও মাটিতে ফেলে দেন। মাটিতে ফেলে দেবার পর খুবই নাটকীয় ভঙ্গিতে সেই বলটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাঁদের মুখ দেখে মনে হয় তারা বলটাকে বলছেন, কিরে ব্যাটা, তুই এমন হাত থেকে পড়ে গেলি কেন?

অনেক কঠিন কথা বলেছি, এবার কিছু তরল কথা। স্কটল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ খেলায় জেতার পর ভোরের কাগজে কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের একটি কার্টুন ছাপা হয়েছে। কার্টুনটি দেখে অনেকদিন পর খুব মজা পেলাম। কার্টুনটি হলো-- গৃহিণী রুটি বেলার বেলুন নিয়ে রুদ্র মূর্তিতে স্বামীকে খুঁজছেন। স্বামী বেচারা খাটের নিচে লুকিয়ে আছেন। ভয়ে তার আত্মা উড়ে যাচ্ছে। গৃহিণী বলছেন, মিনসে কই? সে না বলেছিল বাংলাদেশ স্কটল্যান্ডের সঙ্গে হারবে? 

বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী

আজ আবারো আমাদের খেলা। আমরা খেলব ক্যাঙ্গারু দেশের সঙ্গে। এক ধরনের উত্তেজনা বোধ করছি। মন বলছে কোনো একটা অঘটন ঘটে যাবে। একেকটা খেলা হচ্ছে আমাদের রানের সংখ্যা বাড়ছে। প্রথমবারের ১১৬, তারপর ১৮২, শেষবারে ১৮৫। সহজ অঙ্কের নিয়মে আমরা এবার ২০০ করব। কেউ কেউ বলতে পারেন, খেলা কোনো অংক নয়। তাদের কথা ঠিক আছে, কিন্তু মন মানছে না যে। মন বলছে, আমরা ২০০ অতিক্রম করব এবং আমাদের বোলাররা খাঁটি রয়েল বেঙ্গলদের মতো ঝাঁপ দিয়ে পড়বে।

একটু অন্যরকম হিসাব করি। অস্ট্রেলিয়ানদের জন্যে এ খেলা জেতা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাদের শুধু জিতলেই হবে না, রান রেটে ভাল কিছু করতে হবে। করতে না পারলে বিদায়। কাজেই যথেষ্ট টেনশন নিয়ে খেলবে। ইনশাল্লাহ এই টেনশনই তাদের কাল হবে।

বাংলাদেশ অতি দুর্বল টিম--এটাও তাদের মাথায় থাকবে। খেলার মধ্যে তাচ্ছিল্য থাকবে। অস্ট্রেলিয়ানরা তাচ্ছিল্য করতে ভালবাসে। এই তাচ্ছিল্যের খেলাই তাদের কাল হবে। আমাদের নামী দামী ব্যাটসম্যান্যরাও হয়ত চক্ষুলজ্জার খাতিরেও দুএকটা রান করবেন। আকরাম সাহেব পুরো খেলায় কিছুই করবেন না তা তো হয় না। কিছু নিশ্চয়ই করবেন।

আমি বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের কোন কর্তা ব্যক্তি হলে আকরাম সাহেবকে ডেকে বলতাম-- ভাই আপনি দয়া করে চোখ থেকে  কালো চশমাটা খোলেন। মুখের চুই্ংগাম ফেলে দিয়ে মন লাগিয়ে খেলেন। জুনিয়র ব্যাটসম্যানদের উপদেশ দিয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। বুঝতে পারছি মাঠ থেকে বল কুড়াতে গেলে ভুঁড়িতে চাপ পড়ছে। একটু কষ্ট তো করতেই হবে।

আমি কি রূঢ় কথা বলে ফেলেছি? হ্যাঁ বলেছি। মনের দুঃখে বলেছি। আকরাম সাহেব যদি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তেমন কিছু করেন সঙ্গে সঙ্গে সব ভুলে যাব এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক খেলায় তাঁকে দলে না নেয়া হলে খুবই হৈ চৈ করব। বাংলাদেশের মানুষ খারাপটা মনে রাখে না। দ্রুত ভুলে যায়।

বাংলাদেশের বোলাররা ভাল দেখিয়েছেন। আমার কাছে বোলারদের বিনয়ী মনে হয়েছে। সব সময় দেখা যায় ভাল বোলাররা এক ধরনের অহংকারে ভোগেন। বাংলাদেশের বোলাররা এই অহংকার থেকে মুক্ত। তার চেয়ে বড় কথা, আত্মবিশ্বাসের অভাব তাদের মধ্যে নেই। তাদের বল করা দেখে বার বারই বলতে ইচ্ছা করে, সাবাস!

বাংলাদেশের সমর্থকদের একটা ব্যাপার চোখে পড়ল। সমর্থকরা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, কিংবা বাংলাদেশ চিরঞ্জীব হোক ধ্বনি দিচ্ছেন না। তারা বলছেন “বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।”

খেলা শেষ করে এরা যখন দেশে ফিরবেন তখন স্লোগানের ধরন বদলাবে। “বাংলাদেশ চিরঞ্জীব হোক” বা “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ধ্বনি উঠবে। দেশের বাইরে আমাদের একটিই পরিচয়-- বাংলাদেশ। পুনশ্চঃ আমার কাছে থেকে জনকণ্ঠের জন্য লেখা নিতে এসেছেন কবি হাসান হাফিজ। লক্ষ্য করলাম, তার গলা ভাঙ্গা। হাঁসের মতো ফ্যাস ফ্যাস করছেন। কি ব্যাপার জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, বাংলাদেশ জেতার পর এমন চিৎকার দিয়েছি যে গলা শেষ। শুধু আমার একার না। আমাদের অফিসের সবারই গলা ভাঙ্গা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক