Published : 05 Oct 2025, 10:34 PM
আমি আহমদ রফিককে যখন চিনতে শুরু করি তখন তিনি আমার কাছে কবি, প্রাবন্ধিক, ভাষা-আন্দোলনের কর্মী হিসাবে শুধু নামে পরিচিত। তেমন একটা পড়িনি তাঁর লেখা। যদিও তখনই মনে হয়েছিল কবি হিসাবে তিনি সাহিত্যিক মহলে তেমন একটা গৃহীত হননি। কারণ কবিতা প্রসঙ্গে একসঙ্গে যাঁদের নাম বলা হতো তাঁদের সঙ্গে তাঁর নাম প্রায় কখনোই উচ্চারিত হতে শুনিনি। তবে কবিতা কম লেখেননি তিনি। মৃদু হলেও নিজের একটা স্বরও যে ছিল না তা নয়। তবে আশির দশকেই তাঁর ওপর দৃষ্টি ফেলার আন্তরিক চেষ্টা করেছিলেন আন্ওয়ার আহমদ। যদ্দূর মনে পড়ছে তাঁর ‘কিছুধ্বনি’ পত্রিকায় আহমদ রফিকের কবিতা নিয়ে প্রথমে বিশেষ সংখ্যা বের করে ও পরে এর সঙ্গে আরো কিছু লেখা যোগ করে বের করেছিলেন ‘আহমদ রফিক: কবি ও কবিতা’ নামে একটি বই। আহমদ রফিক আনওয়ার আহমদকে স্নেহ করতেন। সাহিত্যের জন্য তাঁর পাগলামিতে সমর্থনও যোগাতেন তাঁর আবদারে নিয়মিত লেখা দিয়ে। আন্ওয়ার ভাইই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে; প্রায়ই নিয়ে যেতেন তাঁর কাছে, সেই ১৯৮৪-৮৭ পর্বের কথা বলছি, সেই সময়ের কথা সেটা। রফিক ভাই তখন বেইলি রোডে সাগর পাবলিশার্সরে কাছে একটা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসতেন। তাঁর স্ত্রী রুহুল হাসিন তখনো সক্রিয়! দু চারবারের কথাতেই তাঁর ব্যক্তিত্বের অনাড়ম্বরতা ও সহজতা তাঁকে আমার নিকটজন ভাবতে শেখায়! তাঁর সঙ্গে আড্ডা হতো সেখানেই, বুঝতাম লেখার জন্য আন্ওয়ার ভাইয়ের চাপ সন্তুষ্ট মনেই গ্রহণ করতেন। মনে আছে তাঁর লেখা দিতে সাধারণত দেরি হতো না। সম্পাদক হিসাবে লেখা পাওয়ার ব্যাপারে আন্ওয়ার ভাইয়ের ভরসা ছিল রফিক ভাইয়ের প্রতি। সে সময়টায় পত্র-পত্রিকায় রফিক ভাইয়ের পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো পড়া হয়ে যেত।
শিক্ষার্থী হিসাবে মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন। ভাষা-আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে ডাক্তার হওয়াতেও বাধা পড়েছিল। পেশাগত জীবনে তিনি দীর্ঘ একটা সময় একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে নিজেও কয়েকজনকে নিয়ে শুরু করেছিলেন একটি নতুন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। কিন্তু সহযোগীদের অনৈতিকতাকে মানতে না পেরে সে প্রতিষ্ঠান থেকে সরে আসেন। এমনকি নিজের প্রাপ্য অংশও গ্রহণ করেননি।
রফিক ভাইয়ের ‘আরেক কালান্তরে’ বইটার সম্পর্কে কারো কারো কাছে ততদিনে শোনা হয়ে গেছে। ‘আরেক কালান্তরে’ (১৯৭৭) লিখে তিনি রবীন্দ্র চর্চায় প্রথম পরিচিতি পান। পরিচয়ের পরে জানতে পারলাম ‘নাগরিক’ (১৯৬৩-১৯৭১) নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার মূল ব্যক্তি; সম্পাদক হিসাবে অবশ্য অন্য একজনের নাম থাকত। তখনকার গুরুত্বপূর্ণ লেখকেরাই লিখতেন। আমি যখন বইয়ের জগৎ প্রকাশ করি তখন তিনি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন যে, ‘নাগরিক’ বই-সমালোচনাকে গুরুত্ব দিত। আমি ‘বইয়ের জগতে‘র সম্পাদকীয়তে সে-কথা উল্লেখও করেছিলাম। আমি যখন যেতাম তখন ‘ছোটগল্প:পদ্মাপর্বের রবীন্দ্রগল্প’ বইয়ের রচনাগুলো লিখছেন। পদ্মাপর্বের গল্পগুলো নিয়ে সম্ভবত রফিক ভাইই প্রথম একটা পূর্ণাঙ্গ বই লিখলেন। প্রকাশিত হওয়ার আগেই এই বইয়ের দু একটা লেখার আমি পাঠক ও প্রুফরিডারও। বয়সে অনেক প্রবীণ হলেও প্রায় কিশোর আমার মতামতকে অবহেলা করতেন না। আমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার সময় ভাষা-আন্দোলন নিয়ে লেখা তাঁর কোন বই তখনো বের হয়নি। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে যে তাঁকে পরে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান করা হয় সে পরিচয় তখনো উল্লেখ করার মতো হয়নি। কিন্তু এটা মনে আছে রবীন্দ্রনাথের লেখা ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত লেখাপত্র তখন পড়ছিলেন। তাঁর সে পড়াশোনা ছিল রবীন্দ্রনাথকে কেবল সাহিত্যিক হিসেবে না দেখে আরো বিস্তৃত পরিসরে দেখার অভিপ্রায়। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রকাশনা গণ প্রকাশনী থেকে বের হলো তাঁর কৃষি ও ব্যাংক ভাবনা বিষয়ে বই। সেই বইয়ে তিনি দেখান রবীন্দ্রনাথের ব্যাংক মুনাফা নিশ্চিত করার ব্যাংক ছিল না। তিনি কৃষকদের জন্য সহযোগিতামূলক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গরিব কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নানা কারণে সংকট উৎরাতে পারেন না, তখন ঋণ পরিশোধ অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেসময় যদি ঋণ আদায়ে বাধ্য করা হতো তাহলে রবীন্দ্রনাথও হয়ে উঠতেন অত্যাচারী জমিদার বিশেষ। গ্রামীণ ব্যাংক ধারণায় রবীন্দ্রনাথকেই পথিকৃৎ মনে করতেন তিনি।
রবীন্দ্র চর্চার তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী নিদর্শন আহমদ রফিকের বই ‘রবীন্দ্র-সাহিত্যের নায়িকারা : দ্রোহে ও সমর্পণে’ (২০০৩)। এই রকম দৃষ্টিতে রবীন্দ্র সৃষ্টিকে সম্ভবত বেশি দেখা হয়নি। বইটি নিয়ে আমি একটি আলোচনাও লিখেছিলাম। আমাদের সমাজে অগ্রসর অংশের প্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা চিহ্নিত তাঁরা তাঁদের প্রগতি চেতনার সপক্ষে সাধারণত রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করেন। খণ্ডিত চমকপ্রদ রবীন্দ্র-উদ্ধৃতি ব্যবহারের নিদর্শন এত বেশি যে, রবীন্দ্র-উদ্ধৃতির মধ্য দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্যের সুস্পষ্ট পরিচয়ও দেওয়া যে সম্ভব, এ-কথা সাধারণত মনে আসে না। আহমদ রফিক তাঁর আলোচ্য বইটিতে রবীন্দ্রভাষ্যের অনেক পরস্পরবিরোধী দৃষ্টান্ত হাজির করে তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মানসগঠনে তাঁর পিতামহ, পিতা ও সমাজ-প্রতিবেশ কীভাবে প্রভাব ফেলেছে তার নারীতাত্ত্বিক ইতিবৃত্ত রচনা সেই বইয়ের উদ্দেশ্য।
বইটির রচনার উদ্দেশ্য সন্ধান করতে গিয়ে অনুভব করেছিলেন, লেখক এই বইয়ে একদিকে সন্ধান করেছেন রবীন্দ্রনাথের নারীতত্ত্ব, অন্যদিকে সেই নারীতত্ত্বের আলোকেই বিচার করে দেখতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের শিল্পসামর্থ্যকে। তাঁর চোখে পড়েছে যে সমাজে ও পরিবারে নারী ও পুরুষের আধিপত্য ও অধিকারগত অবস্থান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা অনেক ক্ষেত্রেই স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। প্রগতি ও রক্ষণশীলতা এই দুই বিপরীতের প্রতিফলন বেশ স্পষ্টভাবেই অনুভব করা যায় রবীন্দ্র-সাহিত্যে। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথের রক্ষণশীলতার উৎস দেখেছেন।

চ্যানেল আইয়ের রবীন্দ্র মেলায় তাঁকে সম্মাননা দেয়ার সময় বাঁদিক থেকে ছড়াকার আমীরুল ইসলাম, আহমদ রফিক এবং নিবন্ধের লেখক আহমাদ মাযহার
তিনি যখন ‘রবীন্দ্র চর্চা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখন প্রাতিষ্ঠানিক গঠন কেমন হতে পারে তা নিয়ে আলাপের জন্য সায়ীদ স্যারের সঙ্গে আমিই ছিলাম তাঁর যোগসূত্র। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রেও আমার সঙ্গেই ছিল তাঁর নৈকট্য। রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের কোনো কোনো অনুষ্ঠানেও তাঁর আহ্বানে আমি অংশ নিয়েছি। রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে তিনি রবীন্দ্রচর্চাকে আরো গভীরে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যাচর্চার সামগ্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে কাজটিকে বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এক সময় হতাশ হয়েই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আরো বেশ কয়েকটি বই লিখেছিলেন তিনি। যেমন ‘প্রসঙ্গ : বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ. (২০০২); ‘রবীন্দ্রভাবনায় গ্রাম : কৃষি ও কৃষক’ (২০০২), ‘রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ’ (১৯৮৭), ‘রবীন্দ্রভুবনে পতিসর’ (১৯৯৮), ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প’ (১৯৯৬), ‘প্রসঙ্গ : বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ’ (২০০২), ‘রবীন্দ্রনাথ: এই বাংলায়’ (২০১১), ‘রবিবাউল ও তার বিচিত্র ভাবনা’ (২০১২) ‘রবীন্দ্রনাথ, ‘গীতাঞ্জলি’ ও নোবেল পুরস্কার’ (?), ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার একটি অধ্যায়’ (?), ‘বাংলাদেশের রবীন্দ্রনাথ’ (?)। আমার এই তালিকার বাইরেও দুএকটা বই থেকে যাওয়া সম্ভব। রবীন্দ্রচর্চা তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত বয়ে নিয়েছেন। আবদুশ শাকুর রবীন্দ্রনাথের জীবনী লিখছিলেন বাংলা একাডেমির দায়িত্ব পেয়ে। তাঁর অকাল প্রয়াণে সে কাজ অসমাপ্ত রয়ে যায়। প্রবীণতর আহমদ রফিক বয়সকে হারিয়ে কঠোর পরিশ্রমে এগিয়ে নিয়ে গেছেন সে কাজ।
রবীন্দ্রচর্চার পাশাপাশি ভাষা-আন্দোলন নিয়ে তাঁর কাজ প্রচুর। নিজে একদিকে তিনি অংশগ্রহণকারী, অন্যদিকে ইতিহাসের সাক্ষ্য রচনাকারীও। ভাষা-আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল যেমন তাঁর সক্রিয় রাজনীতি চর্চার অংশ, তেমনি তাঁর সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তারও উৎস। নানা পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা আন্দোলন নিয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। ‘ভাষা আন্দোলন : গ্রাম কৃষি ও কৃষক’ (২০০২), ‘একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস’ (১৯৮৮); ‘ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য’ (১৯৯১), ‘ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা’ (১৯৯৩), ‘ভাষা-আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব (২০০২), ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ (২০১৫), ‘একুশের দিনলিপি’ (২০১৬), ‘একুশের মুহূর্তগুলো’ (২০১৭), ‘ফিরে দেখা অমর একুশ ও অন্যান্য ভাবনা’ (২০২৩)। এইসব বইয়ে যেমন আছে একদিকে একুশের ঘটনাবলির উপস্থাপন, অন্যদিকে তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য!
বাংলাদেশের রাজনীতি সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়েও লিখেছেন কয়েকটি বই। এসবই তাঁর রাজনীতি লগ্নতার নিদর্শন। এই ধারার কয়েকটি বই হচ্ছে ‘বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি’ (১৯৮৬), ‘জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা: ‘বাঙালি বাংলাদেশ’ (১৯৯৭), ‘বাংলাদেশ জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা’ (২০০০), ‘কিছু রাজনৈতিক ভাবনা’ (২০২২), ‘একাত্তরে পাকবর্বরতার সংবাদভাষা’ (২০০১), ‘এই অস্থির সময়’ (১৯৯৬), ‘রাজনীতির স্বদেশ বিদেশ’ (২০১১), বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধ (২০১২), সংস্কৃতি চর্চা ও অসমাপ্ত লড়াই’ (২০১৮), ‘সাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতি ভাবনা’ (?)।
কবি হিসেবে তিনি প্রধান সারিতে না থাকলেও মাঝে মাঝেই বই বেরিয়েছে। যেমন, ‘বাউল মাটিতে মন’ (১৯৭০), ‘রক্তের নিসর্গে স্বদেশ’ (১৯৭৯), ‘বিপ্লব ফেরারী, তবু’ (১৯৮৯), ‘পড়ন্ত রোদ্দুরে’ (১৯৯৪), ‘ভালোবাসা ভালো নেই’ (১৯৯৯), ‘মিশ্র অনুভূতির কবিতা’ (২০১৯), ‘একগুচ্ছ রাজনৈতিক কবিতা’ (২০১৯); যথারীতি নির্বাচিত, শ্রেষ্ঠ ও সমগ্র কবিতার সংকলন হয়েছে। তাতে বোঝা যায় কবিতা লেখায় তাঁর সক্রিয়তাও সাহিত্য মহলের দৃষ্টির বাইরে পড়ে যায়নি। ষাটের দশক পর্যন্ত ছোটগল্পও লিখেছেন কিছু। একটি মাত্র গল্প-সংকলন আমার চোখে পড়েছে তাঁর, নাম ‘অনেক রঙের আকাশ’ (১৯৬৬)।
শুধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই নয়, রবীন্দ্র-উত্তর প্রধানদের অন্তত তিনজন নজরুল, জীবনান্দ ও বিষ্ণু দে-কে নিয়েও লিখেছেন বই। এগুলো তাঁর দীর্ঘ ও নিবিড় পাঠের পরিচায়ক। ‘নজরুল কাব্যে জীবনসাধনা‘ (১৯৫৮), ‘বাঙলা বাঙালি আধুনিকতা ও নজরুল’ (১৯৯৯), ‘জীবনানন্দ দাশ: সময়, সমাজ ও প্রেম’, ‘বিষ্ণু দে: কবি ও কবিতা’ (২০১০)। এ ছাড়া বাংলা কবিতার নানা দিক নিয়েও বই লিখেছেন। দুটি বইয়ের তো বিষয় বেশ আকর্ষণীয়ই। ‘বাংলাদেশের কবিতা: দশকভাঙা বিচার’ (২০১৪), ‘কবিতা, আধুনিকতা ও বাঙলাদেশের কবিতা’ (২০০১),।
লিখেছেন বিভিন্ন ব্যক্তির কর্ম ও সাহচর্যের স্মৃতিকথারব বইও। ‘স্মরণীয় বরণীয় আপন বৈশিষ্ট্যে’ (২০১৪), ‘একান্ত বিচারে বিশিষ্টজন’ (২০১৩), ‘স্মৃতিবিস্মৃতির ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ’ (?), ‘পথ চলতি যা দেখেছি’ (?), ‘চিত্রে ভাস্কর্যে রূপসী মানবী’ (?)
জীবনদৃষ্টিতে বাম রাজনীতির দিকেই ছিল তাঁর ঝোঁক; কিন্তু সচেতন ছিলেন সে রাজনীতির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও। তাঁর রাজনীতি বোধের গোড়া ছিল শৈশবে। তিনি নিজেই বলেছিলেন, দলীয় রাজনীতির সক্রিয়তা থেকে সরে এলেও তিনি রাজনীতি সচেতন মানুষ। শৈশব কেটেছে জন্মগ্রাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে। পরে বড় ভাইয়ের চাকরিসূত্রে ১৯৩৭ সালে গিয়েছেন নড়াইলে। তিনি ১৯৪৭ সালে নড়াইল মহকুমা হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশ করেন। পরে তিনি বিজ্ঞান শাখায় সরকারি হরগঙ্গা কলেজ, মুন্সীগঞ্জ থেকে ১৯৪৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক (এমবিবিএস) ডিগ্রি অর্জন করেন। ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাহিত্যকর্মে মনোযোগ দেন।
শৈশবে জীবনবোধ গঠনে নড়াইলে বসবাস তাঁর মনোজগতকে প্রভাবিত করেছিল। হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং পেশাজীবী প্রধান রাজনীতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতি সচেতন শহর ছিল তখনকার নড়াইল। নিজেও বিভিন্ন লেখায় বা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেই পরিবেশের প্রভাব ও প্রকৃতিপ্রদত্ত ব্যক্তিবৈশিষ্ট্যে সক্রিয় রাজনীতি ও প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি ছিল তাঁর আকর্ষণ, সে সময়ের মুসলিম তরুণদের মতো মুসলিম লীগের রাজনীতির প্রতি নয়। জানিয়েছেন, ‘ভগৎ সিংহ ও তাঁর সহকর্মীরা’ নামে একটি পুস্তিকা পড়ে খুব অভিভূত হয়েছিলেন সে সময়। ‘যুগান্তর’ ও ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকা পড়ে নিয়মিত অনুসরণ করতেন দেশের ও দুনিয়ার রাজনৈতিক হালচাল। তখনই মনে হতো, এত বড় উপমহাদেশের নাগরিক হওয়া আর বিভক্ত একটা ভূখণ্ডের অধিবাসী হওয়ার মধ্যে অনেক ফারাক। ওই বয়সেই নানা যুক্তিতে দেশ বিভাগকে গ্রহণ করতে পারেননি তিনি। তাঁর অনেক বন্ধু মনে করেছেন, পাকিস্তান হওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু তিনি মনে করেছেন, না, দরকার যেমন ছিল, তেমনি আবার দরকার ছিল না বিভিন্ন কারণে। তাঁর কাছে সেই অন্য কারণগুলোই বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই বিষয়টা নিয়ে কিছু একটা লেখা দরকার। এর গোড়া একেবারে আমার ছাত্রজীবনে, অবিভক্ত ভারতে। ‘দেশভাগ:ফিরে দেখা’ (২০১৪) বইয়ে তাঁর সে বিষয়ের সুদীর্ঘ কালের পঠন পাঠন অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি তুলে ধরেছেন। তাঁর এই বইটি নিয়ে তাঁর একটি আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম ২৯১৪ সালে। সেটা ছিল এ বিষয়ে আমার জন্য চোখ খুলে দেয়া এক আলাপ!
গ্রামসি বলেছিলেন, বুদ্ধিজীবী কেবল বইয়ের মানুষ নয়; সমাজের প্রতিটি শ্রেণি থেকেই এমন “অর্গানিক বুদ্ধিজীবী” জন্ম নেন যাঁরা তাঁদের শ্রেণির জীবন, সংগ্রাম ও স্বার্থকে চিন্তা ও সংস্কৃতিতে রূপ দেয়। তাঁরা কেবল ধারণা তৈরি করেন না, বরং বাস্তব সামাজিক পরিবর্তনের সাথে যুক্ত থাকেন। সারা জীবন ধরে আহমদ রফিকও সেভাবে তাঁর স্বদেশের স্বশ্রেণির মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও স্বার্থকে নিয়ে বৌদ্ধিক অনুশীলন চালিয়ে গেছেন। তাঁর এই আত্মদৃষ্টিময় কর্মময়তা তাঁকেও একজন যথার্থ ‘অর্গানিক বুদ্ধিজীবী’র ভূমিকায় উত্তীর্ণ করেছে।