বইমেলা: তুমি কি আর আগের মতোই আছ?

অনেক অনেক বই দেখতাম। সব কেনার মতো টাকা ছিল না। এখন টাকা আছে, কেনার মতো বইয়ের অভাব। বিশেষ করে শিশু সাহিত্যের যে কি দুর্দশা।

শান্তা মারিয়াশান্তা মারিয়া
Published : 1 Feb 2024, 06:18 AM
Updated : 1 Feb 2024, 06:18 AM

অমর একুশে বইমেলা। আগে ছিল গ্রন্থমেলা। গ্রন্থ শব্দটির বদলে এখন বইমেলা। নাম বদলে গেছে, বদলে গেছে অবয়ব। সত্তর ও আশির দশকের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে নব্বই দশকের কথা। তখন পরিসর এত বড় ছিল না। তখন একাডেমি প্রাঙ্গণের ভিতরেই গ্রন্থমেলার রাজ্যপাট। আজকের মতো পুরো সোহরাওয়ার্দি উদ্যান জুড়ে তার পরিসর ছিল না। ছিল না এত এত আর্চওয়ে, নিরাপত্তা বলয়, ওয়াচ টা্ওয়ার। ছিল না প্যাভিলিয়নের এত জাঁকজমক। ছিল না এত মানুষের সমাগম। কিন্তু যা দরকার সেটি ছিল। ছিল প্রাণের স্পর্শ। ছিল লেখক, পাঠকের আড্ডা। ছিল বই বিক্রির ধুম।

মনে পড়ে ছোটবেলায় বাবা মায়ের হাত ধরে বইমেলায় যাবার স্মৃতি। তখন বই কিনতাম দুহাত ভরে। সেসব বই বাড়ি এনে কখন পড়বো সে তর সইতো না।

অনেক অনেক বই দেখতাম। সব কেনার মতো টাকা ছিল না। এখন টাকা আছে, কেনার মতো বইয়ের অভাব। বিশেষ করে শিশু সাহিত্যের যে কি দুর্দশা। আচ্ছা শিশু সাহিত্য কথাটা নাকি সঠিক নয়। কথাটি হবে শিশুদের উপযোগী সাহিত্য। সে যাই হোক। তখন সাজেদুল করিমের ‘দস্যিছেলের দশচক্রে’, এখলাসউদ্দীন আহমেদের এক যে ছিল নেংটি, মুনতাসীর মামুনের এন্ডারসনের রূপকথা, দ্বীপ দীপান্তর, শওকত ওসমানের প্রাইজ ও অন্যান্য গল্প, মোহাম্মদ নাসির আলীর লেবুমামার সপ্তকাণ্ড পড়ার জন্য আমরা ব্যস্ত হয়ে থাকতাম। এখনকার মতো কেবল একঘেয়ে সায়েন্স ফিকশন নয়, যেগুলো কোনটি যে কোনটির অনুকরণে লেখা তা বোঝাই মুশকিল। সেসময় শিশুসাহিত্যে মানবিকতার স্পর্শ ছিল।

আশি ও নব্বই দশকে মেলায় দেখেছি লেখকদের আড্ডা। হুমায়ূন আজাদ, আহমদ ছফা, সৈয়দ শামসুল হক তো ছিলেনই, সেসময়কার তরুণ লেখকরাও আড্ডা দিতেন বাংলা একাডেমির পুকুর পাড়ে, অশ্বত্থতলা, বহেড়াতলায়। এখনকার মতো নিছক টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখানোর জন্য লেখকদের ছুটাছুটি ছিল না। আরও একটা বিষয় ছিল না। সেটা হলো লেখকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রকাশকদের বই প্রকাশের মজার খেলা। সত্যিই এ এক মজার খেলা। লেখক নিজেই নিজের বই একশ বা দুশ কপি কিনে নিবেন এই এক অদ্ভুত নিয়মের জালে বর্তমানে আটকে আছেন অসংখ্য লেখক। আর এ কারণেই মেলায় অনেক লেখকই রীতিমতো ক্রেতা-শিকারী হয়ে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হন। চেনাজানা কাউকে দেখতে পেলেই আর রক্ষা নেই। ঝুলোঝুলি করে তাকে নিজের প্রকাশকের স্টলের সামনে ধরে এনে বই কিনতে দস্তুরমতো বাধ্য করেন। আবার পরিচিত লেখককে এড়াতে অনেক ক্রেতাই নানা রকম কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হন। আমি নিজেও অনেক সময় পরিচিত লেখককে দেখে সরে পড়ি। কারণ আমার হয়তো তার বইটি পড়ার কোন আগ্রহ নেই, আমার আগ্রহ যে ধরনের বইতে হয়তো তিনি সে ধারার লেখক নন। বই কেনার জন্য আমার হয়তো নির্দিষ্ট পরিমাণে বাজেট রয়েছে। আমি নিজে কখনো অনিচ্ছুক কাউকে আমার বই কিনতে অনুরোধ করি না। কারণ অনিচ্ছুক লোককে ধরে বই কিনিয়ে কি লাভ? তিনি তো বাড়ি নিয়ে বইটি পড়বেন না। ফেলে রাখবেন। আমি তো পাঠক চাই, ক্রেতা চাই না।

এইসব কারণে গত কয়েক বছর ধরেই বইমেলা লেখক-প্রকাশক-ক্রেতার ত্রিভুজ প্রেমের করুণ কাহিনিতে পরিণত হয়ে চলেছে। অন্যদিকে রয়েছে লেখকের রয়ালিটি না পাওয়ার অশ্রুভেজা গল্প। এদেশে খুব কম সংখ্যক লেখক ছাড়া অন্যরা যে প্রকাশকের কাছ থেকে রয়ালিটি বাবদ কিছুই পান না তা তো ওপেন সিক্রেট। আমার লেখাটি এই পর্যন্ত পড়ে অনেকে হয়তো বলে বসবেন ‘আরে উনি পান না বলে বলছেন অন্যরাও পায় না।’ ‘অমুকে রয়ালিটি পায়নি, কিন্তু আমি রয়ালিটি পাই।’ এ কথা বলতে বাংলাদেশের লেখকরা এক ধরনের আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। লেখকদের এই ভুয়া আত্মপ্রসাদের সুযোগ নিয়েই কিন্তু প্রকাশকরা লেখকের রয়ালিটি মেরে দেন। প্রকাশকরা কাগজবিক্রেতা, ছাপাখানা, প্রকাশনাশ্রমিক সকলকে টাকা দিতে বাধ্য হলেও শুধুমাত্র লেখককে সম্মানী দিতে যত প্রকার গড়িমসি করার তা করেন। কোন লেখক রয়ালিটি চাইলে বলেন ‘আরে মিয়া, আপনার বই তো ইঁদুরেও কাটে না।’

এক্ষেত্রে বলা উচিত, যদি জানেন যে বইটি বিক্রি হবে না তাহলে প্রকাশ করলেন কেন? নিম্নমানের বই প্রকাশের দোষ শুধু প্রকাশকের নয়। লেখকেরও। বলা ভালো লেখক নামধারী অলেখকদের। যিনি লিখতে জানেন না, যিনি অন্যের লেখা চুরি করেন, যিনি লেখার নামে অশ্বডিম্ব প্রসব করেন তার লেখার এবং বই ছাপানোর দরকারটা কি? আজকাল লেখকরা আর দরিদ্র নন। কারণ যতরাজ্যের আমলা, কামলা, গামলা, সেলিব্রিটি আর ইউটিউবার সকলেরই কয়েকখান করে বই আছে। গল্প উপন্যাস কবিতা যেমন তেমন করে লিখবেন। তাও না পারলে মোটিভেশনাল বই এর নামে হাবিজাবি প্রকাশ করবেন।

আপনি হয়তো একজন মডেল, একজন খেলোয়াড়, একজন অভিনয়শিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, কর্পোরেট বস, ব্যাংকার, সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী। যাই হোন না কেন, আপনার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আছে এবং সেদিক দিয়ে আপনি সফল। বেশ তো। আপনাকে বই লিখতে হবে কেন? লিখতে হবে কারণ এটি স্ট্যাটাস সিম্বল। আগে বেশি টাকা হলে বাঙালি আরেকটি বিয়ে করতো কিংবা একজন নৃত্যগীত পটিয়সী সুন্দরী রক্ষিতা রাখতো। এখন টাকা হলে নারী পুরুষ যিনিই হোন স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে একটি অখাদ্য বই মেলায় প্রকাশ করেন। অনেকে নিজেই লেখেন, অনেকে লিখিয়ে নেন টাকার বিনিময়ে। তারপরে সেই বই দেদারসে বিক্রি হয়। কারা কেনেন? যারা তাকে তেল দিতে ইচ্ছুক তারাই কেনেন। অনেক উচ্চমানের লেখক এই কেনা দেখে নিজের অবিক্রীত বইয়ের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।তবে তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, হতাশ হবেন না। আপনার যদি আত্মবিশ্বাস থাকে যে, আপনি ভালো লেখেন তাহলে ধৈর্য্য রাখুন। সময়ই বলে দেবে সাহিত্যের অঙ্গনে কে টিকে থাকবে আর কে ঝরে যাবে।

বইমেলায় এখনও অনেক ভালো মানের বই প্রকাশ হয়। কিন্তু সেগুলো নিম্নমানের বইয়ের ভিড়ে হারিয়ে যায়। এমনিতেও কিন্তু ষোলকোটি মানুষের দেশ হিসেবে আমাদের বই বিক্রির পরিমাণ অনেক কম। তিন চারশ কপি বই বিক্রি হলে মনে হয় অনেক বিক্রি হয়েছে। বইমেলায় লোকের অভাব নেই। কিন্তু তাদের মধ্যে ক্রেতা কজন? যত মানুষ বইমেলায় ঢোকে তারা যদি প্রত্যেকে একটি করে বই কেনে তাহলেও কোন স্টলে কোন বই পড়ে থাকার কথা নয়। এক প্যাকেট সিগারেটের দামে, দুই প্লেট চটপটির দামে একটি বই কেনা যায়। কিন্তু অনেক মানুষ সেটুকুও ব্যয় করতে নারাজ। অথচ তারাই বই মেলায় ঢোকার মুখে ফুলের মুকুট, মালা চুড়ি কিনছেন, বন্ধুবান্ধবীকে এটা ওটা খাওয়াচ্ছেন। তার মানে পকেটে টাকা আছে কিন্তু বই কেনার বেলায় সেটি পকেট থেকে বের হচ্ছে না।

আরও মজার খেলা চোখে পড়ে। অনেকে বইমেলায় ঢুকে কোন একটি বই হাতে নিয়ে সেলফি তুলে তারপর বইটি রেখে দেন। কেনেন না।

যাহোক এত অভাব অভিযোগ, নেই নেই সবকিছুর পরও তো আমাদের একটি বইমেলা আছে। অমর একুশে বইমেলা।

সেই কোন প্রাচীন বিশ্বে সুমেরিয়ায় মাটির ফলকের উপর আঁচড় কেটে লেখা হয়েছিল গিলগামেসের কাহিনী। ব্যাবিলনে গড়ে উঠেছিল মাটির ট্যাবলেট বইয়ের লাইব্রেরি। মিশরের প্যাপিরাস, চীনের কাগজ আর ব্লক প্রিন্টিং, গঙ্গা-পদ্মা, সিন্ধু, নর্মদা নদীর অববাহিকায় মানুষের হাতে লেখা তালপাতার পুঁথি, তুলোট কাগজ, মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির বুকে হারিয়ে যাওয়া  চামড়ার উপর লেখা কত কিতাব, ডেডসি স্ক্রল, জার্মানির গুটেনবার্গ বাইবেল, মানব সভ্যতার কত আনন্দ বেদনার গল্প বুকে করে প্রবাহিত হচ্ছে বই। এখন ই-বুকের যুগ। আমার কাছে মনে হয়, বইয়ের ফরমেট যাই হোক, বই তো বই-ই, তাই না? সৃষ্টিশীল মানুষ চিরদিনই লিখবে আর মননশীল পাঠক চিরদিনই খুঁজে নেবে সেই লেখা।

আমার কাছে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, শৈশব ও তরুণবেলার সব আবেগ, প্রভাতফেরী, প্রেম, বসন্ত সবকিছু মিলেমিশে এক হয়ে যায় বইমেলায়।