Published : 26 Jul 2026, 09:24 PM
কাইফি আজমি (১৯১৯-২০০২)
উর্দু সাহিত্যের অন্যতম প্রথিতযশা কবি, প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট কণ্ঠস্বর এবং মানবতাবাদী চিন্তার উজ্জ্বল প্রতিনিধি। তাঁর কবিতায় প্রেম, সাম্য, সামাজিক ন্যায়, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এক অনন্য শিল্পরূপ লাভ করেছে।
কবিতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন গীতিকার, চিত্রনাট্যকার এবং সমাজমনস্ক সাংস্কৃতিক কর্মী। তাঁর রচনায় ব্যক্তিমানুষের অনুভব যেমন গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনি ইতিহাস, রাজনীতি এবং সময়ের সংকটও পেয়েছে শিল্পসম্মত প্রকাশ।
সময়ের সীমা অতিক্রম করে কাইফি আজমির কবিতা আজও বিশ্বজুড়ে পাঠকদের নতুন করে ভাবায়। মানবতার পক্ষে তাঁর নির্ভীক উচ্চারণ, ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁকে আধুনিক উর্দু কবিতার এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
গিরগিটি
.......
মূল উর্দু: কাইফি আজমি
ভাষান্তর: তারিক সুজাত
.......
একটি গ্রীবায়
লক্ষ লক্ষ মুখ,
প্রতিটি মুখেই
সহস্র ক্ষতের দাগ।
প্রতিটি ক্ষতই
একেকটি রুদ্ধ-দুয়ার,
সে পথে আলোর
নেই-যে প্রবেশাধিকার,
আলোও পারেনি
বেরিয়ে আসতে আর।
জন্মেছে সে কোন গর্ভে,
কেউ কি জানে?
কোথায়-বা তার বেড়ে ওঠা,
কেউ কি জানে?
তার আগমনই-বা কোন দেশ থেকে,
কেউ কি জানে?
সব ভাষাতেই পটু সে
কথার বুননে,
আর খোলা জানালার মতো
পুরাতন ক্ষতগুলো
মেলে দেয়।
আর সে-যে আমার হৃদয় পানে
তাকিয়ে বলছে:
তোর ধর্ম
তোর মহান প্রভু,
তোর সংস্কৃতির
সকল প্রতীক
আজ
মহাসংকটে,
চারদিক জুড়ে',
ঘনিয়ে আসছে
গাঢ় অন্ধকার।
হিমশীতল
হয়ে আসে
রক্ত,
বুজে যায়
আমার
দু'চোখ।
মনে হয় যেন
এ পৃথিবীতে
কোনো বন্ধু নেই-যে আমার,
চারিধারে শুধু শত্রু।
আর এ পৃথিবী
জীবন্ত আমাকে
গিলে খাচ্ছে।
কোমরে রণসাজ,
এমন এক
হিংস্র-দানব
আকাশের দিকে উড়ে যায়
নিশ্ছিদ্র রাত্রির
গাঢ় অন্ধকারে,
নিংড়ে নেবে সে
আলোর আনন্দটুকুও;
এমনকি খুবলে খাবে সে
আমার আকাশের তারাগুলো।
দেখ, বিদীর্ণ পৃথিবীর খণ্ডিত দেহ,
তার মাঝে জন্ম নিচ্ছে
মানুষের দীর্ঘ মিছিল।
তারা বলে,
আমি নাকি তাদেরই একজন।
যদি সত্যিই তাদের হই,
তবে এ-আমি কে?
না, আমি তো কারুর নই,
আমি যে কেবল আমারই।
নিঃসঙ্গতার গভীর থেকে
জন্ম নিয়েছি আমি।
যা কিছু আমার,
সবই তো এসেছে
একাকী পথচলায়;
আমাকে খোঁজার কেউ নেই
এই জনারণ্যে।
যদি একবার তাল মিলিয়ে চলি
তোমাদের সঙ্গে,
তবে আমি ভুলে যাব আমারই
একান্ত চলার পথ।
এমনি অনেক প্রশ্ন
যার উত্তর আমিও খুঁজে মরি।
কোনো লাভ নেই-
হাতড়ে ফিরি,
তবু অজানাই থেকে যায়।
এমনই সব প্রশ্ন
বার বার জেগে ওঠে মনে।
আর আমি
ডুবে যাচ্ছি
চোরাবালির গহ্বরে।
মনে হয় তাকে মেরে ফেলি
কিন্তু যতবারই আঘাত করি,
নিজেরই বুকে ফেটে যায় ক্ষত
কপাল বেয়ে
রক্ত ঝরে পড়ে।
আমি তো বুঝি না
এর সঙ্গে
আমার সম্পর্ক কোথায়?
তুমুল তুফানে,
কণ্ঠে তুলেছি আজান।
ঘুটঘুটে কালো রাতে
বাজিয়েছি শঙ্খ-ধ্বনি।
সবার দেখার জন্য
বাইরে ঝুলিয়ে রেখেছি ক্রুশ।
প্রতিটি বসত থেকে
সরাতে চেয়েছি তাকে।
ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছি
নগরের বহুদূরে।
ফের উচ্চারিত হলো,
জেগে ওঠো।
তোমার হৃদয় জুড়ে জমে থাকা
বরফের স্তর সরিয়ে ফেলো,
তাকে তুমি গলিয়ে দাও
তোমার আলিঙ্গনের উষ্ণতায়।
যা ইচ্ছে করো,
অন্যায় হলেও।
কিন্তু এসো, আজ রাতে
আমরা মানবতার উৎসব করি।
তবু সে আবার
আমারই গোটানো আস্তিন থেকে
বের হয়ে এলো,
দ্রুত নিভিয়ে দিল
সদ্য-জ্বলে-ওঠা শিখাটি।
আবারও আমার মুখে
ঘষে দিল অন্ধকার।
হৃদয়ের যা বলার ছিল,
তা-ও আর বলা হলো না।
দোরগোড়ায় পৌঁছেও
ফিরে গেল বরযাত্রীর বহর।
অতঃপর
আমাকে একপাশে ডেকে সে বললো:
আজ জীবনের আরেকটি নাম-
ভয়;
ভয়ই সেই মাটি,
যেখানে সাম্প্রদায়িকতার
বিষবৃক্ষ বেড়ে ওঠে,
যেখানে সাগরের ঢেউও
সমুদ্র ছেড়ে
নিজের পথ খুঁজে নিতে চায়।
যতদিন মানুষের হৃদয়ে
বাসা বেঁধে থাকবে ভয়,
আমাকে শুধু
পাল্টে নিতে হবে মুখ;
বদলে ফেলতে হবে
ভাষা, উচ্চারণ, কণ্ঠস্বর।
কেউই তখন আর
ধ্বংস করতে পারবে না আমাকে,
উদযাপিত হবে না আর
মানবতার উৎসব।
টীকা
............
উর্দু সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি কাইফি আজমির 'গিরগিটি' কবিতাটি কেবল একটি প্রতীকনির্ভর কবিতা নয়; এটি ভয়, সাম্প্রদায়িকতা, ছদ্মবেশী ক্ষমতা এবং বিবেকহীনতাকে নিয়ে রচিত এক গভীর মানবতাবাদী উচ্চারণ। বহুরূপী 'গিরগিটি' এখানে এমন এক শক্তির প্রতীক, যা সময়, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে ক্রমাগত বদলে নিতে পারে, কিন্তু যার অন্তর্নিহিত প্রকৃতি অপরিবর্তিত থাকে।
আজ যখন স্বদেশ ও বিশ্বের নানা প্রান্তে ভয়, বিভাজন, যুদ্ধ, অসহিষ্ণুতা, ঘৃণার রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের ওপর নানামুখী আঘাত আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে, তখন কাইফি আজমির এই কবিতা নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসে। এই অনুবাদটি ভয়কে অতিক্রম করে মানুষ ও মানবতার পক্ষে দাড়ানোর এক বিনীত আহ্বান।