০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

এক সকালের অনুভব ও অন্যান্য কবিতা

জানালা খুলে দেখি শেষ বিকালের শেষ রোদ / ঝুলে আছে সেনপাড়া ব্রিজের রেলিঙে, / সূর্যরশ্মি ও শাদা প্রজাপতি এক বিন্দুতে এসে পরস্পরকে / ভেদ করে গেছে!

এক সকালের অনুভব ও অন্যান্য কবিতা
চিত্রকর্ম: রফিকুন নবী

সরকার মাসুদ সরকার মাসুদ

Published : 06 Mar 2026, 11:35 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:06 PM

ওইদিকে

তেঁতুলতলার খাল পার হলে পাওয়া যায় 

কাঁটাযুক্ত হলুদ ফুলের বন

ছোট ছোট শাদা প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে 

ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার অন্যমনস্কতার  ভেতর

স্বপ্ন-বাস্তবের ঝোপেঝাড়ে! 

তেঁতুলতলার খাল পার হলে পাওয়া  যায় 

ধামালিয়ার মাঠ। এক লম্বা গ্রীষ্মবিকালে

সুতাকাটা ঘুড়ি ধরবার জন্য 

ছেলেরা দৌড়াচ্ছে ওইদিকে স্বপ্নের ইশারায় 

হায় ! ঘুড়ি খালে পড়ে যায়, আশা ভেসে যায়

শাদা মেঘ উড়ে যায় তীর বেঁধা মাথার ভেতর! 

জানালা খুলে দেখি শেষ বিকালের শেষ রোদ 

ঝুলে আছে সেনপাড়া ব্রিজের রেলিঙে, 

সূর্যরশ্মি ও শাদা প্রজাপতি এক বিন্দুতে এসে 

পরস্পরকে ভেদ করে গেছে! 

ছেলেরা দৌড়াচ্ছে এমন এক দিকে যা ভুল নয়

যা কিছু নির্ভুল তার অনেক কিছুই প্রমাণিত নয়!

চাঁদের  রাত 

যে রাতে জলাভূমির ওপর নেমে আসে চাঁদের

বেলুন,  হিজল গাছ 

হাত বাড়িয়ে দেয় আলোর বেলুনের দিকে 

যে রাতে সরোবরের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় চাঁদ 

বাগানবাড়ির দোলনা নিজে নিজে দোল খায়

সেই রাতে সব দুধ পানি হয়ে যায়, আর

আত্মহত্যাপ্রবণ রমনীর এলোচুল উড়ে যেতে 

চায় বিষাদটিলার চূড়ায় ! 

একটা  কাঁটাগাছের নিচে বসে আমি দেখি

ওই শ্বেতিপড়া চাঁদের মুখে ঘন অবসাদ 

অশ্বত্থের ডালে-ডালে পাতা আছে মনোহর ফাঁদ। 

এক সকালের অনুভব 

কোনো এক মিষ্টি রোদের সকালে মনে হয়েছিল

বেঁচে থাকবো এক শ' বছর! 

রক্তে-মাংসে স্ফূর্তি টের পেয়েছিলাম খুব 

চোখ ছিল ঘাসের ডগায় ফড়িঙের চঞ্চলতায়

নাকফুল ফুটে থাকা উদ্ভিদের স্থির সুষমায়! 

আগুনের ওপর দিয়ে রাতভর হেঁটে অবশেষে 

পৌঁছেছি সকালে। এখন আমার হাঁটুর

ওপর এসে পড়েছে মুলমুলে রোদ 

সোনালু গাছের রিং দুলছে আর ডাকছে 

হলুদ কন্ঠস্বরে: আসো,  

পৃথিবীর সবুজ-হলুদ প্যাচের ভেতর, ভালোবাসো

জংগলের ফাঁকে ফাঁকে থাকা মেঘের কুয়াশা। 

আজ মনে হয় অন্য কথা, কিন্তু সেদিন ভেবেছি

মরবো না আগামী দশ বিশ বছরে! 

অসংখ্য লেখকের ভালো-মন্দ লিখে 

অশ্রুমেশানো কালিতে অনেক প্রয়াণলেখ

রচনার পরে আমি যাবো। তার মানে 

বড়  রাস্তার পাশের শতবর্ষী গাছের মতো

আমি  বাঁচবো বহুকাল ধুলা-বালি মেখে! 

ভাঙা ডাল, আয়না

বনপথে কুড়িয়ে পেলাম ফুলভরা ভাঙা ডাল 

জংগল তালা দিয়ে রাখে অনেক রহস্য 

আবার কোথাও কোথাও রাখে না আড়াল

ঐ তালা খুলি আমি জংগলের চাবি দিয়ে 

তখন আগাছাজড়ানো এক আয়না তাকিয়ে 

থাকে আমার  দিকে! 

আয়নায় মুখ দেখে মন খারাপ হয়, 

আগাছাজড়ানো ওই আয়না নিজেকে দ্যাখে

অন্য এক আয়নায়; এ আরেক বিস্ময়। 

নকিব  চলে গেছে 

জেটির অনুজ্জ্বল আলোয় শুনতে পাচ্ছি

বুক-ভাঙা গান। সদরঘাটে এখন ভরা সন্ধ্যা 

আমি কয়েদির জামা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছি

এদিকে ওদিকে। আমি দেখতে পাচ্ছি 

পানি থেকে ওঠা চাঁদ গাছে উঠে বসে আছে আওরাবুনিয়ায়, ওই দক্ষিণ বাংলায়! 

বিষাদের ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে দিকে-দিকে

বুড়িগঙ্গার পানিতে তাপ রেখে, বিষাক্ত ঢেউয়ে

ইঞ্জিনের গর্জন মিশিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে জলযান, 

নকিব চলে গেছে বহুকাল; দক্ষিণ সমুদ্রের 

উত্তাল ছবি দেখি, নারকেলবনের চাঁদ:

দেখি সৈকতে সূর্যাস্তলাগা জেলেদের ঠেলাগাড়ি 

নকিবের দীর্ঘ ছায়া, ম্লান হাসি পড়ে আছে 

উদ্যানে, লেকের পাড়ে, রৌদ্রদগ্ধ ঘাসে-ঘাসে।