Published : 14 Feb 2026, 01:41 AM
চব্বিশের আন্দোলনের পথ ধরে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের যাত্রায় বড় ধরনের সংঘাতবিহীন এবারের নির্বাচনকে ভোটের সংস্কৃতিতে এক ধাপ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন নির্বাচন ও রাজনীতির বিশ্লেষকরা।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দুই বছর যেতে না যেতেই আয়োজন করা এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীকে সংসদে পাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে।
দলের বিদ্রোহীদের ভোটে থাকার উত্তাপ দূরে সরিয়ে রেখে বিএনপির প্রার্থীরা ২৯৭ আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়েছেন; যাদের একটি বড় অংশ প্রথমবার সংসদে যাচ্ছেন। সংসদের আরেক পাশে বসতে যাওয়া জামায়াতের ৬৬ জয়ীদের মধ্যে মাত্র তিনজনের আগে সংসদে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হয়ে যাওয়া ভোটের পর এই ফলাফল নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সেই সঙ্গে দিনভর আলোচনা আর চায়ের আড্ডায় ঘুরেফিরে আসছে কেমন হল এবারের ভোট; যাতে ‘হ্যাঁ’ ভোটও জয়ী হয়েছে বড় ব্যবধানে।
ভোট নিয়ে আলোচনার মধ্যেই এক সময়ের জোট সঙ্গী বিএনপির বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনেছে ভোটে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। সেই সঙ্গে ফলে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পরদিন শুক্রবার ৫৯ দশমিক ৪৪ ভোট পড়ার তথ্য দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গণভোটের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটে রায় দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন (৬৮.০৬%)। বিপরীতে সংস্কার বাস্তবায়নে অসম্মতি জানিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন (৩১.৯৪%)।
এবারে মোট ভোটার ছিলেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন।

গড়ে ৬০ শতাংশ ভোট পড়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশন।
কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “খুব সুন্দর ভোট হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব সন্তুষ্ট। সব মিলিয়ে সঠিক নির্বাচন হয়েছে, গ্রহণযোগ্য হয়েছে।”
সমসাময়িক নির্বাচনগুলোর মধ্যে ‘সবচেয়ে ভালো’ নির্বাচন বলেও মত দেন তিনি।
ত্রয়োদশ সংসদের এ নির্বাচনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর মানদণ্ডে ‘অধিক গ্রহণযোগ্য ও আস্থাযোগ্য’ হিসেবে বর্ণান করেন।
স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন ভোটাররা, ছিল প্রশ্নও
নানা অভিযোগ ও প্রশ্নের সবশেষ তিন নির্বাচনের পর এবার স্বতস্ফূর্তভাবে ভোটারদের কেন্দ্রে আসাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
আপাতদৃষ্টিতে নির্বাচন ভালো হলেও ভোটের ‘ন্যয়সঙ্গতা নিয়ে’ দলগুলোর পক্ষ থেকে ওঠা প্রশ্নকে উড়িয়েও দিচ্ছেন না তিনি।
“যদি কোনো রকম ম্যানিপুলেশন হয়ে থাকে, কারসাজি হয়ে থাকে সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। আপাতত দৃষ্টিতে তো মনে হচ্ছে যে এটা ভালো নির্বাচনই হয়েছে,” যোগ করেন তিনি।
ভোটের পরদিন শুক্রবার রাতে নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মনে হচ্ছে যে যারা ভোট দিতে চেয়েছে ভোট দিতে পেরেছেন। এমন কোনো অঘটনও ঘটেনি। বড় ধরনের কোনো সহিংসতা হয়নি। তো মনে হয় আমার দৃষ্টিতে ভালোই নির্বাচন হয়েছে।
“যদিও প্রশ্ন রয়েছে, যারা অনেকে যোগ্য ছিলেন, অনেকে অযোগ্য ছিলেন তারাও হয়তো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছেন। এনসিপির অভিযোগ আছে, যারা অযোগ্য তারাও অনেকে হয়তো নির্বাচন করার সুযোগ পেয়েছে। তো অযোগ্য ব্যক্তিরা যদি নির্বাচন করার সুযোগ পায় তখন নির্বাচনের সমীকরণই বদলে যায়।”
নির্বাচনের ‘সঠিকতা’ এবং ভোট ‘ন্যায়সঙ্গত হওয়া’ নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যারা জিতেছে তারা জিতেছে নিশ্চয়ই। আবার যারা জেতার কথা তারা হয়তো জিততে পারেনি।
“শুধু নির্বাচন আয়োজন নয়, ভোটের ন্যায্যতা ও সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করাও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। এ নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন রয়েছে।”
সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর জয়কে ‘অভিনন্দনযোগ্য’ হিসেবে আখ্যা দেন এই নির্বাচন বিশ্লেষক। বলেন, “যে দলগুলো এ সংস্কারগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে চেয়েছে, অঙ্গীকার করেছে; তাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। এখন দেখা যাবে তারা কীভাবে কাজ চালায়।”

নৌকাবিহীন নির্বাচনে ৫৯% ভোট, কতটা গ্রহণযোগ্য?
আরেক নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীমের দৃষ্টিতেও এ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোট জনগণের কাছে ফিরেছে।
আওয়ামী লীগবিহীন এ নির্বাচনে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের ভোট দেওয়ার ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “নির্বাচন ভালো হয়েছে, বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল।“
‘ভোট হবে না’ বা ‘সহিংসতা হবে’- নির্বাচন ঘিরে এমন গুজবের মধ্যে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ছাড়াই ‘সুন্দর নির্বাচন দেখতে’ পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই নির্বাচনে ‘টার্ন আউটটা’ বড় বিষয় ছিল। যেহেতু বাংলাদেশে ভোটারদের মধ্যে ‘ভোট ব্যাংকের’ একটা ব্যাপার আছে। বড় দলের নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে তারা অন্য দলকে ভোট দিতে চায় না।
“যেহেতু আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে ছিল না, কাজেই একটা অংশ ভোট দিতে যে যাবে না, এটা আমরা আগেই বুঝেছিলাম। একই সঙ্গে যে ওই যে গুজবগুলোর কারণে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও ভায়োলেন্স হবে- এই আশঙ্কা থেকে অনেকে ভোট কেন্দ্রে যায়নি।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত গত তিন নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তের কমিশন এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন আব্দুল আলীম।
ভোট পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তারপরও টার্নআউটটা গ্রহণযোগ্য। আমরা যদি আন্তর্জাতিক মানগুলো দেখি তার সঙ্গে যদি মেলাই তাহলে এটা গ্রহণযোগ্য টার্ন আউট। সবকিছু মিলিয়ে আমি বলব যে একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হয়েছে, যেখানে ভোটাররা নিজেদের ভোট দিয়েছে।
“এখানে কোনো ভয়, ভীতি, ইন্টিমেশন কোনো কিছু ছিল না। অর্থাৎ এই যে রেজাল্টটা, এতে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে।“
নতুন ভোটার, পোস্টাল ব্যালট, তরুণদের ভোটের মাঠে ‘নির্ধারক’ হিসেবে থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আগে বলেছি-তরুণরাই নির্ধারক হবে। নারী ভোটারদের উপস্থিতিও ছিল। প্রবাসী ও দেশের পোস্টাল ভোট, যুব ভোটারতো ফ্যাক্টর বটেই।
“দেশে তারা একটা পরিবর্তন দেখতে চায়। হয়তো তারা ওইভাবে ভোট দিয়েছে।”
গণভোটে হ্যাঁ এর জয়কে ‘দৃষ্টান্ত’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, সবশেষ ১৯৯১ সালের গণভোটের হ্যাঁ ভোটের চেয়ে বেশি এবারেরটা বেশি। এটা নিয়েও কোনো প্রশ্ন করারতো সুযোগ নাই।

সরকারকে কৃতিত্ব দিলেন আবদুল আউয়াল
১৯৯১ সালের গণভোটসহ বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, বিগত সরকারের যে হঠাৎ এরকম পতন হবে এটাও অনেকের মাথায় ছিল না। ওই ঘটনার পরে এ নির্বাচন ভালো হবে বলে ধারণা ছিল। ভোটের আগে সেনাবাহিনী বা ডিসি-ইউএনওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেও সেটা মনে হয়েছে। তবে এত ভালো হবে এটা চিন্তাতেও ছিল না।
তার মতে, নির্বাচনে দুই দলের প্রধান তারেক রহমান বা শফিকুর রহমানের মত তারকা প্রার্থীরা ভালো করার চেষ্টা করেছেন। তেমনি কোনো কোনো প্রার্থী আবার অন্য প্রার্থীর সঙ্গে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করেছে এবং তা থেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচন ‘চমৎকার’ হওয়ার কৃতিত্ব অন্তবর্তী সরকারকে দিচ্ছেন লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক এই রেক্টর। বলেন, “নির্বাচনের মেইন খেলোয়াড় হলো সরকার। মানে সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে এবং সরকার যদি ইসিকে বা মাঠ প্রশাসনকে সাপোর্ট দেয়, তাহলে মাঠ প্রশাসনও নির্বাচনের জন্য সেভাবে তৈরি হয়।”
রাজনৈতিক দল ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ভোটের মাঠে টাকা লেনদেন’ এর মত অনিয়মের ঘটনাগুলোর ব্যাপক প্রচার কোনো রাজনৈতিক দলর সমর্থনে প্রভাব ফেলেছে বলেও মনে করছেন তিনি।

আগের ভোটের চেয়ে পার্থক্য কোথায়?
রাজনীতির বিশ্লেষক কাজী মাহবুবুর রহমান দেশের গত পাঁচ দশকের নির্বাচনের ইতিহাসের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে তুলনায় এবারের নির্বাচনের মধ্যে ‘ইতিবাচক’ পার্থক্য দেখতে পেয়েছেন। তার দৃষ্টিতে এবারের ভোট ছিল ‘স্মরণীয়’।
তিনি বলছিলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে এ নির্বাচন যেমন স্বতঃস্ফূর্ত, সহিংসতামুক্ত এবং আনন্দঘন ছিল, তেমনি অর্থের অপব্যাবহার ও নির্বাচনি দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এজন্য এ ভোটটাকে আমরা আলাদা করে রাখব।”
ভোটের মাঠে বেশির ভাগ নাগরিক যেমন অর্থের প্রলোভনে সাড়া দেননি, কারসাজির সুযোগ দেননি; তেমনি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ‘অনিয়মের’ বিষয়ে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করেছিল বলে তার পর্যবেক্ষণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “এ কারণে যারা চেষ্টা করেছে নির্বাচনি দুর্নীতি করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর সহিংসতাটা একদম শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বাংলাদেশে আমরা যেভাবে অকারণে-বেকারণে, কারণে-অকারণে যেভাবে আমরা দেখি সহিংসতা থাকে, সেই সহিংসতাটা কিন্তু ছিল না।
“এসব কারণেই আমি বলছি এ নির্বাচনটা আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রম। সরকার, নির্বাচন কমিশন, সেনাবাহিনীসহ দেশের নিরাপত্তা এজেন্সিগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের বাহবা পেতে পারেন “