Published : 28 Jan 2026, 01:35 AM
এবারের ভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর বার্তা ছিল ‘সমালোচনা’ আর ‘দোষারোপের রাজনীতি’ এড়ানোর; তবে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হতেই অতীতের মতো সেই পথই বেছে নিয়েছে তারা।
আনুষ্ঠানিক প্রচারের শুরু থেকেই দুই বড় জোটের তরফে একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। কখনও নেতারা সরাসরি বলছেন, কখনও কোনো দলের নাম না নিয়ে আকারে ইঙ্গিতে অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করছেন, কখনওবা বিভিন্ন অভিযোগ আনছেন পরস্পরের বিরুদ্ধে।
শুধু বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য নয়, ভোটের প্রচারকে কেন্দ্র করে চুয়াডাঙ্গা লালমনিরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে দীর্ঘদিন সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা শুরু না হওয়ায় দলগুলো এমন প্রচার কৌশল থেকে বের হতে পারেনি।
প্রচারে একে অপরের প্রতি বিষোদগার করে ভোটার টানার কৌশল কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশও করেছেন তারা।
ভোটারদের কাছ থেকে এ বিষয়ে এসেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একজন ভোটার বলেছেন, রাজনৈতিক বিষোদগার একটা ব্যাধি। এ ব্যাধি থেকে বেড়িয়ে আসা উচিত।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, সেই জায়গা থেকে তারা এমন প্রচার কৌশল দেখতে চান না। প্রচারে অতীতের ঘটনা নিয়ে ‘বদনাম’ করা ঠিক না, এমন মন্তব্য তাদের।
তবে কথার এ লড়াইকে অনেকে নির্বাচনি আমেজ হিসেবেও দেখছেন। কেউ কেউ এও বলছেন, প্রচারে নেমে নেতারা কী বলছেন, সেই বক্তব্য শোনার মতো অবসর তাদের নেই।
সবশেষ ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।
ভোটের দিন বিএনপি জোট দেশজুড়ে নাশকতা চালাতে পারে- এমন ‘তথ্য থাকার’ দাবি করে প্রচার চালায় আওয়ামী লীগ। এর বিপরীতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘যোগসাজশে’ সরকার ‘কারচুপির’ ভোট করবে- এমন অভিযোগ ছিল বিএনপির।
নির্বাচনের আগে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “ওদের (বিএনপি-জামায়াত) একটা চরিত্র আছে ওইরকম, নির্বাচন চলাকালীন সময়ে হঠাৎ বলবে, ‘আমরা নির্বাচন করব না। আমরা প্রত্যাহার করে নিলাম’।
“সন্ত্রাস করে মানুষ হত্যা করা…আমরা ক্ষমতায়; তারপরও আমার দলের এতগুলো মানুষ তারা হত্যা করেছে।”

পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিএনপি-জামায়াত-ঐক্যফ্রন্ট নাশকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির ‘গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে’, এমন দাবিও ছিল আওয়ামী লীগের।
আর বিএনপি বলেছিল, আওয়ামী লীগ সরকারি সংস্থাকে নিয়ে মাঠে নেমেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে এলাকায় ভয়ভীতি দেখানো শুরু করেছে।
এর পরের দ্বাদশ সংসদের লড়াইয়ে বিএনপি না থাকলেও নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে এসেছিল, ততই দুটো রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্যে উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি করেছিল।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, আন্দোলনের মুখে সরকার ‘পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।’
ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ছিল, দলটি বাড়াবাড়ি করলে খালেদা জিয়াকে ফের জেলে পাঠাবেন।
যেভাবে চলছে এবারের প্রচার
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে যশোরের এক অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, মঞ্চে এক রাজনৈতিক দল আরেক দলের সমালোচনা, দোষারোপ করে থাকে। তারা এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চান।
“এই দোষারোপের রাজনীতি করলেতো মানুষের পেট ভরবে না। কী করলে মানুষের পেট ভরবে, সেই কাজগুলো আমরা শুরু করতে চাই।”
অপরদিকে প্রচারের শুরুর দিন নির্বাচনি সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কারো সমালোচনা করতে চাই না।”

এমন বার্তার পরও ভোটের প্রচারে দুই দলকেই একে অপরের বিপক্ষে ‘আক্রমণাত্মক’ কথা বলতে দেখা গেছে। প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছে কথার লড়াই।
ভোটের প্রচারে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি ভোট চুরির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
গত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের সমাবেশে তিনি বলেন, গত ১৫ বছর ১৬ বছর ভোট ডাকাতি হয়েছে, বর্তমানে আরেকটি দল এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
“পত্রিকায় পড়েছি আমরা, সোশাল মিডিয়াতে দেখেছি যে ব্যালট পেপার তারা গায়েব করে দিচ্ছে; সব ব্যালট পেপার নিজেদের পক্ষ নিয়ে নিয়েছে অর্থাৎ আবার ভোট চুরির প্রক্রিয়া তারা শুরু করেছে।”

হবিগঞ্জের সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা অতীতে কী দেখেছি? কিছু হলেই পাশের এক দেশে চলে যায় কেউ কেউ, চলে যায় না? এখনও চলে গিয়েছেন। আবার গতকালকে আমরা দেখেছি যে, এক লোক পালিয়ে গিয়েছিল? কোথায় পালিয়ে গিয়েছিল জানেন? পিন্ডি পালিয়ে গিয়েছিল।
“এই বিকাশ নম্বর নিচ্ছে, এনআইডি নম্বর নিচ্ছে, মা-বোনদের বিভ্রান্ত করছে বিভিন্ন কথা বলে।”
সেদিনই ঢাকায় নির্বাচনি সমাবেশে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপিকে ইঙ্গিত করে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ডের নামে ‘খাজনা’ তোলার অভিযোগ করেন।
“আমরা ওই ধরনের কোনো কার্ডের ওয়াদা দিচ্ছি না। ২০০০ টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনো কিছু সমাধান হবে? আর আমার ভাই নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তাতে আবার ভাগ বসিয়ে দেওয়া হবে; ‘খাজনা আগে, তারপর অন্যটা’, ‘২০০০ এর ১০০০ আমার খাজনা-আমাকে আগে দাও, তারপরে তোমারটা তুমি বুঝে নাও’।”
জামায়াতের ওই সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমরা শুনছি, বিভিন্ন কার্ড দেওয়া হবে। আমরা চাই কার্ড দেওয়া হোক, জনগণ সুবিধা পাক। কিন্তু এই কার্ড জনগণ পর্যন্ত পৌঁছাবে তো? ২০০০ টাকার কার্ড নিতে ১০০০ টাকা ঘুষ দেওয়া লাগবে না তো?”

শনিবার পাবনায় প্রচারে নেমে জামায়াত আমির বলেন, ‘অবৈধ পথ’ ধরে ৬ তারিখের পর অনেকের ‘কপাল’ খুলে গেছে।
সেদিন সিরাজগঞ্জের জনসভায় অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের নেতাকর্মীরা কোনোকিছু দখল আর চাঁদাবাজি করেনি দাবি করে তিনি বলেন, “কী স্ট্যান্ড ওইটা আমি বলতে গেলাম না, ওইটা বললে একদল খুব রাগ করে।”
শুক্রবার জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি সমাবেশে যোগ দিয়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে একটি দল আওয়ামী লীগের ভূমিকায় নিজেদেরকে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে।
“তাদের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিতে জাতি অতিষ্ঠ। এবারের নির্বাচন নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম-খুন চলবে কি না।”
‘ভোটাররা আর আক্রমণাত্মক কথা শুনতে চায় না’
আক্রমণ এড়ানোর বার্তার পরও ভোটের প্রচারে দলগুলো সেখান থেকে বের হতে পারল না কেন, সেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল ভোটের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কাছে। তারা এসব বক্তব্যকে ‘আক্রমণাত্মক’ হিসেবে মানতে নারাজ। উত্তর আসে, ‘অযৌক্তিক সমালোচনা করা হচ্ছে না’।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কটাক্ষ নয়, ভোটারদের সামনে তারা দলটির (জামায়াত) অতীত তুলে ধরছেন।
“বলবই জামায়াত একটা স্বাধীনতাবিরোধী দল। যে এই দেশটাই চায় নাই, সে আবার এ দেশের শাসন ক্ষমতা নিতে চায়। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমি হাজারবার বলব। আমাকে যদি তখন পাইতো, আমাকে ওরা বাঁচাইয়া রাখতো?”
জামায়াতের মুখপাত্র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এগুলো রাজনীতির সৌন্দর্য। এর অংশ হিসেবেই দলগুলো বক্তব্য রাখছে।
“দলীয় নেতৃবৃন্দ যখন কথা বলেন, তখন তো এসব বিষয় বিবেচনা করেই কথা বলেন। আমাদের অবস্থান থেকে আমরা সাধরণত অন্যের সমালোচনার চেয়ে আমাদের পরিকল্পনাই বলি।
“যখন কোনো দল আমাদের সমালোচনা করে, তখন এগুলো জনগণকে পরিষ্কার করার জন্য যতটুকু সমালোচনা করার ততটুকু করি, বা সাবধান করার জন্য বলি। আমরা যৌক্তিকভাবেই বলি, কোনো অযৌক্তিক সমালোচনা করি না।”
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের লড়াইয়ে নেতারা যেসব বক্তব্য রাখছেন তা সংঘাত উসকে দিতে পারে।
তাদের পর্যবেক্ষণ, দেশে দীর্ঘদিন সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা হয়নি। ফলে এবারও দলগুলো এমন প্রচার কৌশল বেছে নিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাব্বীর আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে কথাটা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়–সেই উপলব্ধি দলগুলোর মাঝে তৈরি না হলে সংঘাত তৈরি হতে পারে। ফলে নির্বাচন কমিশনকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ তার।
“এখানে তো রেফারি থাকতে হবে। ওমুকে এটা বলছে, প্রতিদিন নোটিস পাঠাবে–আপনি ঠিক বলছেন না। বারবার যখন একজনকে সতর্ক করে দেওয়া হবে, তখন সে কিছুটা হলেওতো শুনবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক বলেন, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ না করাটাই সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ।
“নির্বাচনি প্রচারণায় থাকবে, জনগণের জন্য কে কী করবে। আমি ফ্যামিলি কার্ডের চেয়ে বেটার কিছু দেব বা এটা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না–এমন বক্তব্য দিতে পারে। আবার ‘চাঁদা দিতে হবে’, এই খোঁচা মারার তো দরকার নাই।”
নির্বাচনি প্রচারে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে ‘অপরাধ মাফ হওয়ার’ পাশাপাশি ধর্মীয় বিভিন্ন প্রসঙ্গ উঠে এসেছে জামায়াতের কয়েকজন নেতার বক্তব্যে।
প্রচারের মাঠে দলটির বিরুদ্ধে ‘শেরকির’ অভিযোগ তুলে তারেক রহমানও বলেন, “আল্লাহ সতর্কবার্তা হিসেবে দেশে ভূমিকম্প দিয়েছে।”
অধ্যাপক সাব্বীর এসব প্রসঙ্গ টেনে বলেন, নির্বাচনি আচরণবিধিতে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ রাখা প্রয়োজন।
“এগুলো বলা যায় না রাজনৈতিক প্রচারণায়। এবারে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে যে টানাহেঁচড়া নির্বাচনি প্রচারণায়, আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই। যারা যারা এটা লঙ্ঘন করেছে–তাদেরই শাস্তির আওতায় আনা দরকার।”
প্রথমদিনের প্রচারে তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকাও সামনে তুলে ধরেন।
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক সাব্বীর আহমেদ বলেন, “এটা বেশি বললে মানুষ বেশি খাবে না। কারণ এদেরকে পুনর্বাসন করেছে বিএনপিই। এখন যদি জামায়াত বলে, আপনারা তো আমাদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করছিলেন, এখন আমাদেরকে এই বলে গালি দেন কেন?”
যেভাবে প্রচার চলছে, তাতে রাজনৈতিক দলগুলো যে অতীতের কার্যক্রম থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি–সে বার্তাই দিচ্ছে বলে মনে করেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, সমালোচনা হতেই পারে; তবে সেটি বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। বর্তমানে ভোটাররা আর আক্রমণাত্মক কথা শুনতে চায় না।
“তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য কী ব্যবস্থা করবে, দেশের অর্থনীতি কীভাবে পুনর্গঠিত হবে–মানুষ এসব কথায় আশ্বস্ত হতে চায়। এমন আশ্বস্তও আবার হতে চায় না, যা কথার কথা হয়েই থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সে পথে হাঁটতো, তাহলে একটা বড় পরিবর্তন দেখা যেত। কিন্তু হলো না; এটা দুর্ভাগ্যজনক।
“যেকোনো ধরনেরই উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়, সহিংসতা বাড়িয়ে দেয়, কর্মীদের মনোবল অন্যভাবে চাঙ্গা করে। নেতারা যদি দায়িত্বশীলভাবে কথা বলে, তাদের কর্মীরাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারে। এটা যেভাবে যাচ্ছে, এটা যদি আরও বেশির দিকে যায়; তাহলে সহিংসতাই রূপ নেবে।”

কোনো বিষয়ে অভিযোগ থাকলে নির্বাচনি অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটিকে জানানোর পরামর্শ নির্বাচন কমিশনের।
ইসির সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি অ্যান্ড অ্যাডজুডিকেশন কমিটির কাছে আপনারা জানান, জানিয়ে আমাদেরকে কপি দেন। আই উইল ফলো ইট।
“কিন্তু আমাকে যদি বলেন যে, আপনি ঘুরে ঘুরে গিয়ে দেখেন—তাহলে এটা আমার প্রতি অবিচার করা হবে।”
প্রচারে ‘আক্রমণ’, কীভাবে দেখছেন ভোটাররা?
মসনদে যেতে ‘সাধারণ মানুষের’ দৃষ্টি আকর্ষণে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন দলগুলোর নেতারা। এ বিষয়ে সেই ভোটাররা নেতাদের এমন প্রচার নিয়ে বলছেন¬, গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, ভোটের লড়াইয়ে এসে রাজনৈতিক দলগুলো সেখান থেকে সরে গেছে। ফলে তা খুব ভালোভাবে দেখার সুযোগ নেই।

সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক রিদোয়ান আহমেদ রিয়ন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিরোধী দল এবং ক্ষমতাসীন দল একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে, এই চর্চাটা তারা নির্বাচনি প্রচারণা থেকে শুরু করে।
“এটার ভুক্তভোগী হই আমরা। এটাকে নোংরা রাজনীতির একটা বৈশিষ্ট্য বলতে পারি।”
ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন বলছেন, এমন প্রচার কৌশল জনগণের প্রত্যাশার পরিপন্থি।
“বিষোদগারের যে ধারা চলছে, এটা আসলে আমাদের কারোরই কাম্য নয়। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের মধ্যে থাকার কথা।”
ব্যাংক কর্মকর্তা তাসফিয়া সারাহ বলছেন, সুষ্ঠু সমালোচনা থাকতে পারে। তবে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে ‘আতঙ্ক’ না ছড়ানোর প্রত্যাশা তার।
“ক্ষমতায় এসে তারা আমাদের জন্য কী করবেন, এসব কথা বলতে পারেন।”

পৌঢ় ইলিয়াস মিয়া মনে করেন, প্রচারে অতীতের ঘটনা নিয়ে ‘বদনাম’ করা ঠিক না।
“আগে কী হইছে না হইছে–এটা দেখার ব্যাপার না। এখন নতুন করে দেশ সাজাইবার চাই। নতুন-পুরাতন কথা কইয়া কইয়া আরেকজনের বদনাম করব, এটা আমরা চাই না। এটা আমরা মানি না।”
তবে ভোটারদের কেউ কেউ এমন প্রচারে অস্বাভাবিক কিছু দেখছেন না।

মহাখালীর রিকশাচালক সাজ্জাদ মিয়া বলেন, “নির্বাচনের জন্য একজন আরেকজনরে দোষারোপ করব, চাইব যে কে ভোট একটা বেশি নিতে পারে। এটা চলবই।”
কেউ কেউ বলছেন, প্রচারে নেমে নেতারা অনেক কথাই বলেন। কে কী বলছেন সেই বক্তব্য শোনার মতো অবসর না থাকার কথা বলেছেন তারা।
মিরপুরের রিকশাচালক হোসেন আলী বলেন, “গরিব মানুষ, আমি আছি আমার পেটের ধান্দায়। যা আয় করি, দুইটা খাইয়া লইয়া বাইচ্চা আছি।”

‘দোষারোপের’ প্রচার কি ভোট বাড়াবে?
আপাতদৃষ্টিতে নেতাদের ‘বিদ্বেষমূলক’ বক্তব্যকে ভোটার টানার কৌশল বলে মনে করা হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, দোষারোপের প্রচার ভোটের সমীকরণ বদলাবে না, বরং ভোট আরও কমাতে পারে।
যাদের রায়ে নেতারা নির্বাচিত হবেন, তারা বলছেন, নেতাদের কথায় প্রভাবিত না হয়ে তারা এবার জেনে বুঝেই ভোট দেবেন।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, ভোটারের মানসিকতার পরিবর্তন এসেছে; তারা এখন সবকিছু পরিচ্ছন্ন দেখতে চায়।
“অনেক ভোটারই আছে নেতাদের কথাবার্তা দিয়ে পরবর্তীতে তারা দেশ চালানোর সময় কতটুকু সহনশীলতার পরিচয় দেবে–এটা ভাবে। যে প্রতিশ্রুতি আসছে, সেটা যেন বাস্তবায়নযোগ্য হয়, সেগুলোই ভোটারদের টানবে।”
ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন বললেন, “বিষোদগার করে ভোট বাড়বে, এরকম আশা করাটা বোকামি। কমেও যাইতে পারে। রাজনৈতিক বিষোদগার একটা ব্যাধি। এই ব্যাধি থেকে বেড়িয়ে আসা উচিত।”
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা হাফছা আক্তার বলেন, “এমনে এমনে ভোট দিমু না। যারা দেশ ভালো চালায়, হেগোরেই দিমু। যে আমাদের লগে ভালো আচরণ করে, তারেই ভোট দিবার চাই আমরা।”

শাহবাগের বই বিক্রেতা হাবিবুর রহমান বলেন, “আমরার যারে ভাল লাগে, তারে ভোট দিমু। অমুকে খারাপ, তমুকে খারাপ এটা–আমাদের দেখার দরকার নাই।”
নিজের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন যে দল ঘটাতে পারবে, তাকেই ভোট দেওয়ার কথা বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনীষা ইরা।
“প্রচারণায় কী বলছে এসবে গুরুত্ব দিতে চাই না। তাদের ইশতেহার দেখব, সেটা কতটা সময়োপযোগী—সেটাই বেশি গুরুত্ব পাবে।”