Published : 14 Jan 2026, 10:28 PM
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচনি আচরণ বিধির ‘লঙ্ঘন করলেও’ নির্বাচন কমিশনের ‘নির্লিপ্ত ও নিশ্চুপ’ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান।
বুধবার সন্ধ্যায় গুলশানে দলটির নির্বাচনী অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমাদের কোনো কাজে কোনো কনফিউশন যাতে না হয়, সেজন্য আমাদের চেয়ারম্যান তার উত্তরাঞ্চল সফর স্থগিত করেছেন। আমরা যেখানে নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখার জন্য এত উদ্যোগী, সেখানে আমরা তো আশা করতেই পারি যে, অন্য সবাই নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনে শান্তি শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনি পরিবেশ অটুট রাখার জন্য কাজ করবেন।”
কিন্তু তা হচ্ছে না ‘মন্তব্য করে’ বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান কিছু আলোকচিত্র সংবাদ সম্মেলনে দেখান।
তিনি বলেন, “আপনারা ছবিগুলোতে দেখতে পাবেন যে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের প্রধানরা পর্যন্ত তারা এমন বক্তব্য রাখছেন, এমন সব ব্যানার নিয়ে কথা বলছেন, যেটা স্পষ্টতই নির্বাচনি আচরণ বিধির লঙ্ঘন।
“আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনি কর্মকর্তারা সাধারণ প্রার্থীদের প্রতি যেমন কঠোর আইন পালন করার ব্যাপারে আগ্রহী, সকলের ব্যাপারেই তেমনি আইনানুগ আচরণ করবেন।”
নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা নির্বাচন কমিশনে বলে এসেছি, এখন আপনাদের মাধ্যমে বলছি, নির্বাচন কমিশনের এই নির্লিপ্ততা কিংবা নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিশ্চুপতা সুষ্ঠ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করছে। এটা অনুচিত বলে আমরা মনে করি এবং আমরা আশা করি তারা তাদের আচরণের পরিবর্তন আনবে।
“সব রাজনৈতিক দলের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, তারা নিজের দায়িত্বেই এই কাজগুলো থেকে বিরত থাকবেন।”
এই বিএনপি নেতা বলেন, “আমরা আশা করব, বাংলাদেশে আরো যারা রাজনৈতিক দল আছেন, তারাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন এবং সুষ্ঠ নির্বাচনের পথে কোনো বাধার কারণ হবেন না। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনি কর্মকর্তাবৃন্দ যার যা দায়িত্ব, যার যা ভূমিকা, যার যার ক্ষমতা সেটা তারা প্রয়োগ করবেন বলে আমরা আশা করি।”
‘সবাইকে নিয়ে নির্বাচন চাই’
নজরুল বলেন, “আমরা আপনাদেরকে সাক্ষী রেখে বলতে চাই, বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা… এর কৃতিত্ব যদি কেউ দাবি করতে পারে, সেটা বিএনপি। আমরা একদলীয় স্বৈর শাসনের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি, আমরা রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে দেশকে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে পরিণত করেছি, আমরা এক এগারোর সরকারকে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারে বাধ্য করেছি।
“এবারও প্রায় ১৭/১৮ বছর ধরে আমরা অবিরাম লড়াই করেছি। আমাদের বহু সাথীর ঘুম হয়েছে, খুন হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন, মিথ্যা মামলায় নির্যাতিত হয়েছেন। আমরা সবাইকে নিয়ে একটা শান্তিপূর্ণ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন চাই। সেজন্য আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছি।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, “আপনাদের মাধ্যমে আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, দেশের মানুষ যারা বহু বছর ভোট দিতে পারে নাই, তার মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারে নাই, তারা যাতে নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে শান্তি এবং শৃঙ্খলার মধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। এই ব্যাপারে আমাদের ভূমিকা আমরা পালন করছি, আমরা তাদের সমর্থন চাই আমরা তাদের সহায়তায় সহযোগিতায় আমাদের যে কর্মসূচি সেটা পালনের ইচ্ছা রাখি।”
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান বলেন, “আমরা বারবার বলে এসেছি যে, আমরা নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই, সবার জন্য সমান সুযোগ চাই। দল বড় হোক বা ছোট হোক, ব্যক্তি ক্ষমতাবান হোন বা না হোন, পদবিধারী হোন বা সাধারণ নাগরিক হোন, সবার জন্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকা দরকার।”
‘পোস্টাল ব্যালট প্রসঙ্গে’
ছাপানো পোস্টাল ব্যালটে তিনটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক একেবারে প্রথম দিকে আর বিএনপির প্রতীক ভাঁজে স্থান পাওয়ার প্রসঙ্গটি তুলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আপনারা বুঝবেন যে বিষয়টা খুব স্পষ্টতই উদ্দেশ্যমূলক। আমরা এটাকে খুবই অন্যায় এবং অনৈতিক মনে করি। আমরা মনে করি যে এটা দ্রুত সংশোধন হওয়া প্রয়োজন, এটা নির্বাচন কমিশনের সংশোধন করা উচিত এবং দরকার হলে আপনারা পুনরায় ছাপেন, এ ব্যাপারে যথেষ্ট সময় আছে।
“আমরা এটাও আলোচনা করেছি যে, এই পোস্টাল ব্যালট নিয়ে আরো কিছু ঘটনা ঘটছে। আপনারা কেউ খেয়াল করে থাকতে পারেন যে, বাহরাইনে একজন জামায়াত নেতার বাসায় দুইশর বেশি ব্যালট পেপার নিয়ে কাজ করার ভিডিও, প্রায় সাত মিনিটের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।”
নজরুল ইসলাম খান বলেন, “ব্যালট পেপার আপনার একটা আমানত। আমার ব্যালট পেপার আমি ছাড়া আর কেউ দেখার সুযোগ নাই। এটা শুধু উচিত না তা না, এটা বেআইনি। আপনারা জানেন যে ভোট কেন্দ্রে আপনি যে ব্যালট পেপারটা নেন এই ব্যালট পেপার নিয়ে আপনি একটা এনক্লোজারের মধ্যে যান এবং সেখানে আপনি ব্যালট পেপার ভোট দিয়ে আপনি সেখানে বাক্সে ফেলে আসেন।
“এর মাঝখানে আর কারো এই ব্যালট পেপার দেখার বা আর কারো এই ব্যালট পেপার হাতে নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। অথচ দেখা যাচ্ছে যে, এক বাড়িতে অনেক ব্যালট পেপার নিয়ে তারা কাজ করছে। তাহলে ব্যালট পেপারের বা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যে ন্যায্য প্রক্রিয়া, যে আইনানুগ প্রক্রিয়া সেটা ব্যাহত হল।”
তিনি বলেন, “একই ঘটনা আমরা আজকেও পেয়েছি ওমানের একটা গ্যারেজে গাড়ির উপরে অনেকগুলো ব্যালট পেপার নিয়ে একজন কাজ করছে এবং যিনি করছেন তার নাম হুমায়ুন কবির এবং সেখানকার যারা বসবাস করেন তাদের জানিয়েছেন যে, তিনি জামায়াতের একজন কর্মী। এসব ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
“গতকালও আমরা শুধু বাহরাইনটা জানতাম, সেটা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলেছি, যে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা আপনারা নেন। তারা (ইসি) বলেছেন, যে তারা শুনেছেন এবং তারা দূতাবাসের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।”
নজরুল বলেন, “আমাদের ধারণা, এই দুই জায়গায় এটা ধরা পড়েছে, কিন্তু এছাড়াও অন্যান্য দেশে এই একই কৌশলে ব্যালট পেপার নিয়ে এই ধরনের ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে বা হতে পারে।”
‘এই ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা একটা সুষ্ঠ নির্বাচন চাই। আমরা চাই, জনগণ এই নির্বাচনে আস্থা রাখুক। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হবে সেই সরকারও কোনোরকম কারসাজি করে ক্ষমতায় এসেছে এমন কোনো অভিযোগ না উঠুক।
“কিন্তু এই যে আপনার এনআইডি কার্ড নিয়ে, বিকাশ নম্বর নিয়ে, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, এগুলো সবই অনৈতিকভাবে, বেআইনিভাবে নিজেদের পক্ষে অধিক ভোট সংগ্রহের অপচেষ্টা বলে আমরা মনে করি।”
তিনি বলেন, “আমরা শুধু নিন্দা জানাই না প্রতিবাদ জানাই না। আমরা এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের শাস্তি দাবি করছি। আমরা নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছি যে, এটা বেআইনি কাজ এবং যারাই বেআইনি কাজ করেছে খুব দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে যদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে হয়ত অন্যরা সাবধান হবে।”
অন্যদের মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ইসমাইল জবিহউল্লাহসহ অন্য সদস্যরাও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।