অলৌকিকভাবে গভীর সমুদ্র থেকে বেঁচে ফিরলেন তারা

মাছ ধরতে তিন সপ্তাহের জন্য সাগরে গিয়েছিলেন ভারতীয় এই জেলেরা। বড়দিনের আগেই বাড়ি ফিরবেন বলে পরে তারা ফিরে আসেন ২ জানুয়ারিতে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Jan 2023, 06:36 PM
Updated : 15 Jan 2023, 06:36 PM

গতবছর ২৭ নভেম্বর গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন ভারতীয় জেলে এডিসন ডাভিস ও অগাস্টিন নেমাস। কথা দিয়েছিলেন বড়দিনের আগেই বাড়ি ফিরবেন।

এরপর কেটে গেছে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। পরিবারের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ হয়নি তাদের। ১৫ জন জেলের একটি দলের সঙ্গে মাছ ধরতে তিন সপ্তাহের জন্য আরব সাগরে গিয়েছিলেন ডাভিস ও নেমাস।

গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দেরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই প্রথম প্রথম পরিবারের সদস্যরা তেমন দুশ্চিন্তা করেনি। তবে বড়দিনও পেরিয়ে গেলে বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা।

ঘূর্ণিঝড় অখির স্মৃতি তখনও তাদের মনে তাজা। ২০১৭ সালের যে ঝড় ভারতের দক্ষিণ উপকূলে কয়েক ডজন জেলের মৃত্যু ঘটিয়েছিল। তেমন ভয়ংকর কিছু হয়েছে কিনা সে শঙ্কায় ভরে ওঠে তাদের মন।

তবে না, সব শঙ্কা দূর করে দিয়ে অলৌকিকভাবে জেলেরা ফিরে আসেন ২ জানুয়ারিতে।

সাগরে রওনা হওয়ার পর একপর্যায়ে নৌযানের ইঞ্জিন বিকল হলে ব্রিটিশ ভারত মহাসাগরীয় এলাকার এক দ্বীপে আটকা পড়েছিলেন জেলেরা। পরে এক ব্রিটিশ জাহাজ তাদের উদ্ধার করে।

বেঁচে থাকার জন্য দ্বীপে অনেক কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তারা। দ্বীপে পাওয়া নারিকেলের পানি পান করে তারা তৃষ্ণা মিটিয়েছেন।

তামিল নাড়ুর ঠেঙ্গাপাত্তানাম বন্দর থেকে কাঠের ‘কৃষা মোল’ নামের নৌকায় যাত্রা শুরু করেছিল জেলেদের দলটি। সপ্তম দিনে ইঞ্জিন বিকল হলে তাদের নৌকা গভীর সমুদ্রে ভেসে যায়। এভাবে পাঁচদিন চলার পর একটি শ্রীলঙ্কান নৌকার দেখা পান তারা।

নেমাস বিবিসি-কে বলেন, “নৌকার মাঝি এমন জায়গায় আমাদের নিয়ে যান যেখানে পানির গভীরতা ছিল কেবল ৮ মিটার। নিরাপদ ভেবে সেখানে নোঙর করি।”

ভারতীয় জলসীমায় শ্রীলঙ্কার মাছ ধরার নৌকা প্রবেশের অনুমতি নেই। তাই আশপাশের কোনও ভারতীয় নৌকার সাহায্য চেয়ে বেতার সংকেত পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয় তাদের।

তিন দিন পর একটি নৌকা থেকে সাড়া মেলে। তবে সেটির ইঞ্জিন জেলেদের নৌকা ‘কৃষা মোল’কে টেনে নেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। তাই নৌকাটির মালিক গিয়ারবক্স খুলে ভারতীয় নৌকায় উঠে যান, যাতে তীরে কোথাও থেকে সেটি ঠিকঠাক করে নিয়ে ফিরে আসতে পারেন।

ওদিকে, নৌকার জেলেরা কোনওভাবে নোঙরের সঙ্গে নৌকাটিকে ধরে রাখার চেষ্টা করে টিকে ছিলেন। কিন্তু ১৯ ডিসেম্বর হঠাৎই দমকা বাতাসে নোঙরের একটি দড়ি ছিঁড়ে যায়। তিন দিন পর অপর আরেকটি দড়ি ছিঁড়ে গেলে নৌকাটি আবার ভাসতে শুরু করে।

নেমাস বলেন, “আমদের কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনাটুকুই করার ছিল। জানতাম না নৌকা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। বারবার স্ত্রী আর দুই কিশোর সন্তানের কথাই ভাবছিলাম।”

নৌকার জিপিএস ডিভাইস দেখে জেলেরা বুঝতে পারেন, ২৯ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি দ্বীপ আছে। ব্রিটিশ ভারত মহাসাগরের সলোমন দ্বীপপুঞ্জে ছিল সেই দ্বীপের অবস্থান।

সঙ্গে থাকা ছোট এক ডিঙি নৌকায় চালসহ অন্যান্য খাবার নিয়ে দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হন ৯ জেলে। তারা দ্বীপে পৌঁছান। এরপর নৌকায় ফেলে আসা বাকি পাঁচ জেলেকে নেয়ার জন্য সেখানে ফিরে যান দুই জেলে।

কিন্তু ততক্ষণে নৌকাটি আরও দূরে চলে গেছে। ১ ঘণ্টারও বেশি খোঁজার পর নৌকাটি পান বলে জানান ডাভিস।এরপর প্রায় ৫ ঘণ্টা নৌকা চালিয়ে ৭ জেলে দ্বীপটিতে পৌঁছান। সেখানে ছিল না কোনও বসতি। বিরান সেই দ্বীপে দেখা দেয় নতুন চ্যালেঞ্জ। সঙ্গে থাকা খাবার ফুরিয়ে গেলে বাঁচবেন কী করে? বড়জোর ১০ দিন টিকে থাকার মতো খাবার ছিল তাদের।

জেলেরা রান্নায় সমুদ্রের পানি ব্যবহার করতেন। তৃষ্ণা পেলে নারিকেল খুঁজতেন। আবার বৃষ্টির সময় পলিথিন মেলে রেখে পানি সংগ্রহ করতেন।

নেমাস বলেন, “ভেবেছিলাম মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছি। ঠিকমতো ঘুম হচ্ছিল না, খাওয়া-দাওয়াও কমিয়ে দিয়েছিলাম। খাবারের মজুত যে কোনো সময় ফুরিয়ে যাবে বলে ভয় ছিল। কোথায় আছি, কতদিন এভাবে থাকতে হবে, কিছুই জানা ছিল না।”

২৭ ডিসেম্বরে দ্বীপ থেকে কিছু দূরে একটি ব্রিটিশ জাহাজ যেতে দেখেন জেলেরা। তখনই একটি গাছের ডালের সঙ্গে উজ্জ্বল লাল কাপড় বেঁধে সাহায্যের আবেদন জানাতে শুরু করেন।

ডাভিস বলেন, “আমরা যেকোনওভাবে জাহাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি। ২ ঘণ্টা পর জাহাজের চার সদস্য আমাদের কাছে পানি ও ফলের ঝুড়ি নিয়ে আসেন। আমরা ঠিক আছি কি না, জানতে চান।”

এরপর ডিঙিতে করে জেলেদের জাহাজে নিয়ে যাওয়া হয়। জাহাজে ওঠার পর অনেক দিন বাদে গোসলের সুযোগ পান তারা। জাহাজের ক্রুরা তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন, খাবার ও পোশাক দেন।

দক্ষিণ ভারতীয় উপকূলের ভিজিঞ্জাম বন্দরে ২ জানুয়ারি ভারতীয় উপকূলরক্ষীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় জেলেদের। তাদের পরিচয় শনাক্ত ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সারতে লেগেছিল একদিন। এরপর তাদেরকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

নেমাস বলেন, “যখন বাড়ি ফিরলাম, আমার সন্তানেরা আমাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল কী হয়েছিল। আমার কাছে তাদেরকে বলার মতো রূপকথার গল্প ছিল। একই গল্প আমি কতবার করেছি জানি না। ওই দ্বীপে ঘুরে বেড়ানোর সময় আমরা কেউই ভাবিনি বাড়ি ফিরে আসব।”

গা শিউরে ওঠা ওই অভিজ্ঞতার পর এখন থেকে কেবল কাছাকাছি কোথাও মাছ ধরতে যাবেন বলেই জানিয়েছেন নেমাস। তবে ডাভিস বলেছেন ভিন্ন কথা। তার কথায়, “এটাই আমার কাজ। এটাই আমার নিয়তি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক