পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হওয়া রাজনৈতিক ব্যর্থতা: বিদায়ী পাক-সেনাপ্রধান

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপকে অসাংবিধানিক বলেছেন দেশটির সেনাপ্রধান।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 Nov 2022, 01:09 PM
Updated : 24 Nov 2022, 01:09 PM

১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হেরে যাওয়া এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) হাতছাড়া হওয়ার কারণ সামরিক নয় বরং তা রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল বলে মনে করেন পাকিস্তানের বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া।

আগামী সপ্তাহে অবসরে যাবেন জেনারেল বাজওয়া। তার আগে বুধবার তিনি পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টারে এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের ইংরেজি ভাষার দৈনিক ডন।

এটিই সম্ভবত সেনাপ্রধান হিসেবে জনস্মুখে দেওয়া তার শেষ ভাষণ। এতে তিনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সম্পর্কে দেশের সাধারণ মানুষের ‘নানা ভুল ধারণা’ তুলে ধরেছেন। আর তখনই তিনি বর্তমান বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলেছেন। যেটি একসময় পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অংশ ছিল।

তিনি বলেন, ‘‘পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষই ১৯৭১ সালের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যেতে চান। আমি এখানে কিছু বিষয় সংশোধন করে দিতে চাই। প্রথমত, সাবেক পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হওয়া রাজনৈতিক ব্যর্থতা ছিল, সেটি কোনও সামরিক ব্যর্থতা ছিল না।”

যুদ্ধে পাকিস্তানের কত সেনা অংশ নিয়েছে সেই তথ্যও নতুন করে দেন তিনি।

বাজওয়া বলেন, ‘‘১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের ৯২ হাজার নয় বরং ৩৪ হাজার সেনা অংশ ‍নিয়েছে। বাকিরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মী ছিলেন। এই ৩৪ ‍হাজার সেনা ভারতের আড়াই লাখ সেনা এবং দুই লাখ মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেছে।

‘‘এত বেশি প্রতিকূলতা থাকার পরও আমাদের সেনারা সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছে এবং দৃষ্টান্তমূলক ত্যাগ স্বীকার করেছে। যা ভারতীয় সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশও স্বীকার করেছেন।”

কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের সেই ত্যাগ দেশে এখনও স্বীকৃতি পায়নি বলেও মনে করেন জেনারেল বাজওয়া। তিন বলেন, ‘‘যা ছিল মহাঅন্যায়।”

২০১৬ সালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়া জেনারেল বাজওয়া দীর্ঘ ছয় বছর সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। দেশটিতে সাধারণত একজন সেনাপ্রধান তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আদেশে পাকিস্তানের পার্লামন্টে থেকে আইন প্রণয়ন করে তার মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানো হয়।

নতুন সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম মুনির।

কে বাজওয়ার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন তা নিয়ে কয়েক সপ্তাহের জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান মুনিরকেই সেনাপ্রধানের দায়িত্বের জন্য বেছে নেন।

পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থায় সেনাবাহিনী অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে থাকে।

দেশটিতে এখন পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ শেষ করতে না পারার পেছনেও সেনাবাহিনীর বড় ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

সর্বশেষ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও তার ক্ষমতাচ্যুতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করেছেন। যেটিকে ‘ভুয়া এবং মিথ্যা’ বলে অভিযোগ প্রত্যাখান করেছেন বাজওয়া।

তবে বুধবার তিনি স্বীকার করেন, গত সাত দশকের বেশি সময় ধরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে দেশটির সেনাবাহিনী। যে কারণে সেনাবাহিনীকে দারুণভাবে সমালোচিত হতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘‘পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দিন-রাত এক করে দেশের সেবায় নিয়োজিত থাকলেও তাদেরকে বেশিভাগ সময় সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে হয়। এর একটি বড় কারণ গত ৭০ বছর ধরে সেনাবাহিনীর দেশটির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা, যা অসাংবিধানিক।

‘‘এ কারণেই গত বছর ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে আর হস্তক্ষেপ করবে না। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, আমরা এই সিদ্ধান্তে কঠোরভাবে অনড় এবং অবিচল থাকব।”

পাকিস্তানের অনেক মহল সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে তাদের কঠোর সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং সমালোচনা করতে গিয়ে ‘অত্যন্ত অনুপযুক্ত ও অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করে’ বলেও আক্ষেপ করেন বিদায়ী সেনাপ্রধান।

তিনি তাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘‘পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল এবং জনগণ সবারই সেনাবাহিনীর সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সমালোচনা করতে গিয়ে ভাষার ব্যবহারে সতর্ক থাকা জরুরি।”

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের ভুলের কারণে দেশ আজ সমস্যার মধ্যে পড়েছে। এসব ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটাও জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক