১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

জোড়াফুল মমতার হাতছাড়া, উপনির্বাচন হবে ‘দিদির’ হাতে আঁকা প্রতীক ছাড়াই

২৮ বছর পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্বাচনে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ছাড়াই লড়তে হবে তৃণমূলের দুই পক্ষকে।

জোড়াফুল মমতার হাতছাড়া, উপনির্বাচন হবে ‘দিদির’ হাতে আঁকা প্রতীক ছাড়াই

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়–কোনো পক্ষই আপাতত জোড়াফুল পাচ্ছে না। ছবি: আনন্দবাজার

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 18 Sep 2026, 12:54 PM

Updated : 18 Sep 2026, 03:23 PM

তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীক ‘জোড়াফুল’ এবং ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম নিয়ে চলমান দ্বন্দ্বে আপাতত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্ত দিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দলের ওপর কার অধিকার থাকবে, তা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো পক্ষই দলের নাম বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।

ফলে, ২৮ বছর পর এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্বাচনে ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ছাড়াই লড়তে হবে তৃণমূলের দুই পক্ষকে। আগামী ৬ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো লিখেছে, ১৯৬৮ সালের ‘নির্বাচনি প্রতীক (সংরক্ষণ ও বরাদ্দ) আদেশ’-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বহাল থাকবে বলে বৃহস্পতিবার রাতে এক নির্দেশিকায় জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

সেখানে বলা হয়েছে, কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক দলে বিভাজন দেখা দিলে এবং দুই বা তার চেয়ে বেশি পক্ষ যদি মূল দলের স্বীকৃতি দাবি করে, তবে নির্বাচন কমিশন সব পক্ষের যুক্তি শুনবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে, কোন পক্ষকে স্বীকৃত দল হিসেবে গণ্য করা হবে, অথবা কাউকে সেই স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না।

কমিশন বলছে, উপনির্বাচনের জন্য সময় কম থাকায় এই মুহূর্তে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। তাই দুই পক্ষকে সমান অবস্থানে রেখে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার মধ্যে দুই পক্ষকেই নিজেদের জন্য আলাদা তিনটি নামের বিকল্প এবং তিনটি মুক্ত প্রতীকের প্রস্তাব কমিশনে জমা দিতে হবে। তারা চাইলে নতুন নামের সঙ্গে 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস'-এর নামের যোগসূত্র রাখতে পারবে।

কমিশনের ‘মুক্ত প্রতীক’ বা ফ্রি সিম্বলের তালিকায় ১৮৪টি প্রতীক রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাঁশি, কাঁচি, দূরবীন, মাইক, আলমারি, এসি বা কম্পিউটার মাউসের মতো নানা প্রতীক। তবে এসব প্রতীক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ইতোমধ্যে হাস্যরস শুরু হয়েছে।

সিপিএমের এক নেতা মজা করে বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ‘বাঁশি’ মানানসই হতে পারে। অন্যদিকে, কেউ কেউ বলছেন ঋতব্রত শিবিরের জন্য ‘কাঁচি’ উপযুক্ত হতে পারে, যা দিয়ে দলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করার ইঙ্গিত দেওয়া যেতে পারে। আবার ‘মাইক’ প্রতীক ঋতব্রতের মত সুবক্তার জন্য ভালো হতে পারে বলে কারও কারও ভাষ্য।

কেন এই দ্বন্দ্ব?

১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' প্রতিষ্ঠা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নতুন দলের স্বতন্ত্র পরিচয়ের জন্য তিনি নিজেই একটি অর্থবহ প্রতীকের স্কেচ তৈরি করেন, যা পরে জাতীয় নির্বাচন কমিশনে অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়।

এই প্রতীকে সবুজ ঘাসের বুক চিরে দুটি ফুলকে ফুটে থাকতে দেখা যায়। ‘তৃণমূল’ শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের অধিকার এবং মাটির কাছাকাছি থাকার রাজনীতি তুলে ধরতেই ঘাসফুলের এই ধারণাটি বেছে নিয়েছিলেন মমতা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত প্রায় তিন দশক ধরে এই ‘জোড়াফুল’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক লড়াই, আন্দোলন এবং তার জনপ্রিয় স্লোগান ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। সাধারণ ভোটারদের কাছে দলের পরিচিতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই সহজবোধ্য প্রতীকটি বড় ভূমিকা রেখেছে।

অবশ্য তৃণমূলের পরাজয়ের পর শিল্পী সোমনাথ চৌধুরী দাবি করেন, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজিত পাঁজার অনুরোধে তিনিই নতুন রাজনৈতিক দলের জন্য ‘ঘাসফুল’ প্রতীকটি নকশা করেছিলেন। তার দাবি, পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটিকে নিজের নকশা হিসেবে উপস্থাপন করেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের এই সংকটের শুরু চলতি বছর বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পর থেকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়কার ঘনিষ্ঠ নেতারা এখন তার বিরোধিতা করছেন।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি অংশ দলের নতুন জাতীয় কর্মসমিতির গঠনের ঘোষণা দিয়ে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান করেছে।

মমতা শিবিরের দাবি, ২০২৬ সালের জুনে দলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে নতুন পদাধিকারীদের নাম নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু ঋতব্রত শিবিরের বক্তব্য, আগের কমিটির মেয়াদ ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গেছে। ফলে মমতার নেওয়া সিদ্ধান্তের কোনো সাংগঠনিক বৈধতা নেই।

সেই বিরোধের প্রভাব প্রকট হয়েছে আসন্ন উপনির্বাচনে। রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে দুই পক্ষই তৃণমূলের পরিচয়ে প্রার্থী দিয়েছে।

রেজিনগরে অরূপ রায়ের অনুমোদিত ফর্ম নিয়ে সফিউজ্জামান শেখ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদিত ফর্ম নিয়ে রবিউল আলম চৌধুরী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

আর নন্দীগ্রামে অরূপ রায় শিবিরের পক্ষে এহতেশামুল হক এবং মমতা শিবিরের পক্ষে সঞ্চিতা প্রধান (দে) মনোনয়নত্র দাখিল করেছেন।

একই দলের নামে দুই প্রার্থী থাকার কারণেই কমিশন ওই অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আনন্তবাজার লিখেছে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পর মমতা শিবিরের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে মমতার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, দলের নেত্রী মনে করছেন, এটি কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের একটি ষড়যন্ত্র।

অন্যদিকে, ঋতব্রত শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ নেতা আখরুজ্জামান বলেছেন, “আমরা আশা করেছিলাম প্রতীক আমরা পাব। যেহেতু উপনির্বাচনের তাড়া রয়েছে, তাই কমিশনের এই অন্তর্বর্তী নির্দেশকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা আশাবাদী, ভবিষ্যতে এই প্রতীক আমরাই পাব।”

পুরনো খবর

পশ্চিমবঙ্গে অস্তিত্ব সংকটে তৃণমূল, বাঁচাতে পারবেন মমতা?