মহামারী, যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট: আধুনিক দাসত্বের ফাঁদে ৫ কোটি মানুষ

অন্তত ২ দশমিক ২ কোটি মানুষ জবরদস্তি বিয়ের সম্পর্কে জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Sept 2022, 05:42 PM
Updated : 12 Sept 2022, 05:42 PM

মহামারী, যুদ্ধ আর জলবায়ু সংকট গত পাঁচ বছরে মানুষের রোজকার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে; নতুন এক গবেষণা বলছে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক দেশেই লাখ লাখ মানুষকে আধুনিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন, বিশ্বের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষকে এখন বাধ্যতামূলকভাবে দাসের মত শ্রম দিতে হচ্ছে কিংবা জবরদস্তি বিয়ের শিকার হতে হয়েছে, যা ২০১৬ সালের সবশেষ পরিসংখ্যানের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি।

সোমবার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ওয়াক ফ্রি এবং ইন্টারন্যাশনাল ওরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।

আধুনিক দাসত্ব কী?

সিএনএন লিখেছে, কোনো হুমকি, আক্রমণ ও প্রতারণার ফাঁদে আটকে বিয়ে করতে কিংবা শ্রমদাসের জীবনযাপনে দিতে বাধ্য হওয়াকে আধুনিক দাসখত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। ১৮০টি দেশে জরিপ চালিয়ে সেই বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন ওই তিন সংস্থার গবেষকরা।

তারা বলছেন, কোভিড-১৯, সশস্ত্র সংঘাত এবং জলবায়ু বদলের মত বিপর্যয়ে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাখাতে নজিরবিহীন দুর্দশা দেখা দিয়েছে দেশে দেশে। বেড়ে গেছে দারিদ্র্য, ঝুঁকিপূর্ণ দেশান্তর এবং লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা। আর এ সবই আধুনিক দাসত্বের কারণ হয়ে উঠছে।

আইএলওর মহাপরিচালক গাই রাইডার বলেন, মানুষের মৌলিক অধিকার হরণকে কোনো কিছু দিয়েই বৈধতা দেওয়া যায় না।

“আমরা জানি কী করতে হবে। এবং আমরা জানি তা করা সম্ভব। কার্যকর জাতীয় নীতিমালা ও আইন এখানে প্রাথমিক শর্ত। যদিও কোনো সরকারের পক্ষে একা এসব করা সম্ভব নয়।”

গবেষণা প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, নারী, কন্যাশিশু এবং অরক্ষিত মানুষদের সুরক্ষা দিতে শক্তিশালী আইন করার পাশাপাশি সব রকমের সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা হলে তা আধুনিক দাসত্ব কমিয়ে আনবে; এমনকি একদিন এর ইতিও ঘটাবে।

সুরক্ষিত নয় নারী ও কন্যাশিশু

গবেষণার বরাতে সিএনএন বলছে, অন্তত ২ দশমিক ২ কোটি মানুষ এখন জবরদস্তি বিয়ের সম্পর্কে জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, যা ২০১৬ সালের চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেশি।

আর জোরপূর্বক বিয়ের দুই তৃতীয়াংশই ঘটছে নারী ও কন্যাশিশুদের সঙ্গে। তাতে নারী ও কন্যাশিশুরা যৌন সহিংসতা ও শোসনের বড় রকমের ঝুঁকিতে পড়ছে।

এ প্রতিবেদন বলছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা বেশি দেখা যায়। তবে জনসংখ্যা আমলে নিয়ে আরব অঞ্চলেই জোরপূর্বক বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি।

কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আধুনিক দাসত্বের শেকড়কে অনেক গভীরে ছড়িয়ে দিয়েছে; জবরদস্তি বিয়ের ঘটনাও এ সময় বেড়েছে।

সিএনএন লিখেছে, লকডাউন চলাকালে অনেক দেশেই দিনমজুরদের রোজকার উপার্জন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের কাজে পাঠাতেন। তাতে তাদের অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা হত।

মহামারী সামলাতে ভারতের রাজধানী দিল্লির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে লকডাউন চলেছিল। ফলে ৪০ লাখ শিশু ৬০০ দিনের বেশি সময় ধরে শ্রেণিকক্ষ দেখেনি।

অলাভজনক সংস্থা টিচ ফর ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা শাহিন মিস্ত্রির ভাষ্যে, মহামারীর সময় দরিদ্র পরিবারগুলো যে আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছিল, তাতে করে সরকারি স্কুলগুলোর ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে গেছে।

”বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে, শিশুর প্রতি সহিংসতাও বেড়ে গেছে। পুষ্টিও একটি ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে, যেহেতু অনেক শিশুই স্কুল মিলের ওপর নির্ভর করত।”

আইএলও, ওয়াক ফ্রি আর আইওওএম এর গবেষণায় অবশ্য এই সব পরিস্থিতি বিস্তারিত আসেনি।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “কোভিড-১৯ মহামারীর যে প্রভাব, তা আংশিকভাবে বিভিন্ন উপাত্তে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেসব পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে, তা আসলে মহামারীর পুরো পরিস্থিতিকে বিচার করার জন্যই।”

শিশু ও জবরদস্তি শ্রম

২০১৬ সালের চেয়ে ১১ শতাংশ বেড়ে গেছে জবরদস্তি শ্রম; দুই দশমিক আট মিলিয়ন মানুষ বাধ্য হচ্ছে এভাবে শ্রমজীবী হতে। এদের প্রতি আট জনে একজনই শিশু বলে জানাচ্ছে এ প্রতিবেদন।

যে শিশুরা এরকম শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের অর্ধেককে মূলত যৌনকাজে ব্যবহার করা হয়। শিশুদের অপহরণ, মাদক, প্রতারণা, ঘুষ লেনদেনে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এমনকি সশস্ত্র সংঘাতেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন, নির্মাণ ও কৃষি কাজে ৮৬ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্মীদের নিয়মের বাইরে শ্রম দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। পুরো বিশ্বে এরকম যত ঘটনা ঘটছে, তার অর্ধেক ঘটছে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে।

শিল্প কারখানায় নিয়োগ দেওয়া কর্মীদের বেলায় লিঙ্গ পরিচয় ভেদেও কাজে বাধ্য করার উদাহরণ রয়েছে। নারীকে ঘরের কাজের জন্য বাধ্য করা হয়, অন্যদিকে পুরুষদের নির্মাণ কাজে শ্রম দিতে হয় বাধ্য হয়ে।

নারীদের বেলায় হয়রানি ও বিনা মজুরিতে কাজে বাধ্য করার ঘটনা যেমন দেখা গেছে, তেমনি পুরুষকে বাধ্য করা হয় সহিংস হুমকি ও জরিমানা করে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক