ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্প: ত্রাণ পৌঁছাতে হিমশিম

পশ্চিম জাভায় প্রবল বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভূমিধস এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে উদ্ধার প্রচেষ্টা বিঘ্নিত হচ্ছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 25 Nov 2022, 10:20 AM
Updated : 25 Nov 2022, 10:20 AM

পশ্চিম জাভায় প্রাণঘাতী এক ভূমিকম্পে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষকে ত্রাণ সরবরাহ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষকে।

প্রবল বৃষ্টিতে সৃষ্ট ভূমিধস এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে উদ্ধার প্রচেষ্টা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

রাজধানী জাকার্তা থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণে সিয়ানজুর শহরে সোমবারের ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্‌প অন্তত ২৭২ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষকে অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাব ও অপ্রতুল চিকিৎসা কারণে এখানেও ভূগতে হচ্ছে তাদের।

দেশটির দুর্যোগ প্রশমন সংস্থার প্রধান সুহারিয়ানতো বৃহস্পতিবার বলেছেন, অনেকে এখনো পর্যন্ত ত্রাণ পান নি। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে পানি, তাৎক্ষণিকভাবে বানানো সম্ভব এমন খাবার, তাঁবু ও ডায়াপার পৌঁছে দিতে ৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়েছে।

ভূমিধসে বন্ধ হয়ে থাকা সড়কগুলো চালু করা গেলে ত্রাণ সরবরাহ সহজ হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

রয়টার্স জানায়, এদিন ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো থেকে কিছুটা দূরে সেনাবাহিনীর স্থাপন করা তাঁবুর ভেতর ছোট শিশু, বৃদ্ধসহ অসংখ্য মানুষকে ঠেলাঠেলি করে থাকতে দেখা গেছে; অনেককে দেখা গেছে স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে ত্রাণের প্যাকেট নেওয়ার লাইনেও।

সুকামানাহ গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, তাদেরকে খাবার রেশন করতে হচ্ছে। তাছাড়া শিশুদের জন্য ওষুধ, ডায়াপার ও দুধসহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছুরই সংকট চলছে।

গ্রামপ্রধানের স্ত্রী এমা হারমাওয়াতি জানান, পয়োবর্জ্য স্তূপ হয়ে থাকায় এবং পানি ও সহজে বহনযোগ্য টয়লেটের অভাবে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো দ্বিতীয়বারের মতো ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে যত দ্রুত সম্ভব ত্রাণ সরবরাহ এবং উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। 

“পরিস্থিতি বেশ খারাপ। এখনও বৃষ্টি হচ্ছে, পরাঘাত অনুভূত হচ্ছে। মাটি নড়বড়ে, তাই সাবধানে কাজ করতে হবে,” উদ্ধারকাজে ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন উইদোদো। তিনি তাঁবু ও পানির সংকটের ব্যাপারেও দৃষ্টি দিতে বলেছেন।

ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া ও ভূতত্ত্ব সংস্থা জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে ভূ-পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে, সে পর্যন্ত পরাঘাত অব্যাহত থাকতে পারে।

বর্ষার কারণে ভূমিধস ও বন্যার ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে বলেছে তারা।

ভূমিকম্পের পর থেকে এখনও নিখোঁজ কয়েক ডজন মানুষের খোঁজে উদ্ধারকারীরা মাটি খননকারী নানান ভারি যন্ত্রপাতির সাহায্যে কাদা ও জঞ্জাল খুঁড়ে চলছেন। ভূমিধসে রাস্তা বন্ধ থাকায় অনেক এলাকায় পৌঁছাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও তত কমছে।

কর্তৃপক্ষ এখন সিজেদিল গ্রামের উদ্ধার তৎপরতায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। গ্রামটিতে ভূমিধসে জনা তিরিশেক মানুষ মাটি চাপা পড়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থার কর্মকর্তা জশুয়া বানজারনাহোর।

বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে।

সোমবারের ভূমিকম্পটি তুলনামূলক কম শক্তিধর হলেও জনবহুল এলাকা ও সেখানে দুর্বলভাবে নির্মিত বহু স্থাপনা থাকায় তুলনামূলক বেশি প্রাণহানি হয়েছে বলে ভাষ্য কর্মকর্তাদের।

খোলা আকাশের নিচে নামাজ

ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত সিয়ানজুরে শুক্রবার লোকজনকে খোলা আকাশের নিচে রাস্তায় কিংবা ধানক্ষেতের পাশে জুমার নামাজ পড়তে হয়েছে।

ইমাম মুহাম্মদ জামহুরের নেতৃত্বে এদিন মসজিদ থেকে ২০০ মিটার দূরে একটি উন্মুক্ত ভলিবল কোর্টে নামাজ পড়েছেন অসংখ্য মুসল্লী। সোমবারের ভূমিকম্প তাদের মসজিদটির দেয়ালে ফাটল ধরিয়েছে, জানালা চুরমার করে দিয়েছে।

“দুর্যোগের পর আমরা এখনও আতঙ্কে আছি। এ কারণে আমরা মসজিদে জুমা আদায় না করে ভলিবল কোর্টে এসেছি। আমি প্রার্থনায়ও সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছি, কেননা দুর্যোগ ফের আঘাত হানতে পারে,” বলেছেন ৫২ বছর বয়সী মুহাম্মদ।

অন্য অনেকের মতোই ভূমিকম্পে ঘর হারানো খাবার বিক্রেতা আসেপ হিদায়াত বলেছেন, মসজিদে না হলেও তিনি যে নামাজ পড়তে পেরেছেন, সেজন্য তিনি কৃতজ্ঞ।

“প্রার্থনা করে যেতে হবে, যদি আমরা আশ্রয়কেন্দ্রেও থাকি, তাও,” বলেছেন তিনি।

ইন্দোনেশিয়ার বেশিরভাগ মানুষই মুসলিম ধর্মাবলম্বী।

উদ্ধারকারী দলগুলো শুক্রবারও কাদা, জঞ্জাল সরিয়ে সেগুলোর নিচে জীবিত বা মৃত কাউকে পাওয়া যায় কিনা, তার খোঁজে সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। ভূমিকম্পের পর এখনও প্রায় ৪০ জন নিখোঁজ বলে জানিয়েছে দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা।

আরও পড়ুন:

Also Read: ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত শিশু উদ্ধার

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক