Published : 05 Oct 2025, 12:18 AM
মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে আরব সাগরে একটি বন্দর নির্মাণ ও পরিচালনার প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের উপদেষ্টারা, যা মূলত স্পর্শকাতর ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের শক্ত অবস্থান তৈরির সুযোগ করে দেবে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস লিখেছে, ‘দুঃসাহিসক’ সেই পরিকল্পনায় মার্কিন বিনিয়োগকারীদের পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ খণিজসম্পদ খাতে প্রবেশে সাগর তীরবর্তী মাছের শহর পাসনিকে একটি টার্মিনাল হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাসনি ইরান থেকে ১০০ মাইল ও পাকিস্তানের গোয়াদর থেকে ৭০ মাইল দূরে। চীনের সহায়তার তৈরি একটি বন্দরও রয়েছে সেখানে।
আনুষ্ঠানিক কিছু না হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তৃত ভূ-রাজনৈতিক বিশাল পরিবর্তনকে পুঁজি করার উপায়গুলো পাকিস্তানের কর্মকর্তারা কীভাবে অন্বেষণ করছেন, ওই প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে সেটিই ফুটে উঠছে।
পাকিস্তান সেনাপ্রধানের দুজন উপদেষ্টা বলছেন, গত মাসের শেষের দিকে হোয়াইট হাউসে ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে কয়েক মার্কিন কর্মকর্তার কাছে ওই প্রস্তাব পৌঁছেছে। আসিম মুনিরের সঙ্গেও সেটি আলোচনা করা হয়েছে। তবে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা সেই প্রস্তাব নিয়ে কোনো আলোচনা করেননি।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সর্ম্পক বজায় রাখতে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগতভাবে যে পরিকল্পনা বা দিকগুলো তুলে ধরছেন, সেগুলোরই একটি আরব সাগরে বন্দর নির্মাণের প্রস্তাব।
এ ছাড়া ট্রাম্প-সমর্থিত ক্রিপ্টো উদ্যোগ, আফগানিস্তানভিত্তিক আইএসআইএস-কে এর বিরুদ্ধে সহযোগিতা আরও গভীর করা, গাজা শান্তি পরিকল্পনা অনুমোদন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের বাজারে প্রবেশের প্রস্তাবও রয়েছে পাকিস্তানের।
গত বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত বন্ধে ট্রাম্প কৃতিত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্প-মুনির সম্পর্ককে ‘ঘনিষ্ঠ’ বলছেন মার্কিন ও পাকিস্তানি কূটনীতিকরা।
দুই দশক উষ্ণ সম্পর্কের পর গ্রীষ্মে দিল্লির সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের কৃতিত্ব দাবির বিষয়টি ভারত অস্বীকার করলেও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সরাসরি তার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। এমনকি যুদ্ধ বন্ধের কারণে ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার কথা বলেছেন তারা। বিপরীতে ট্রাম্পও সেনাপ্রধান মুনিরের প্রশংসা করেছেন।
গত সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পর ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রধামন্ত্রীর একটি ছবি দেখা যায়। সেখানে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কিছু নমুনা ট্রাম্পকে দেখান মুনির ও শরিফ।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের এক উপদেষ্টা বলেন, ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পর পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের গোটা চিত্র পাল্টে গেছে। ওই সময়ের আগে সম্পর্ক খুব খারাপ ছিল। সম্পর্ক যেভাবে দেখানো উচিত, সেটি আমরা তখন করিনি। ফলে গত দুই দশক ভারত সেই শূন্যস্থান দখল করে।”
এ উপদেষ্টা বলেন, পাসনিতে প্রস্তাবিত বন্দরটি একটি রেলপথের মাধ্যমে যুক্ত হবে। পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকার খনিজ সেই রেলপথে পরিবহন করা হবে। খনিজের মধ্যে বিশেষ করে তামা ও অ্যান্টিমনির কথা বলেন তিনি, যেগুলো মূলত ব্যাটারি, অগ্নিপ্রতিরোধী ও ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস লিখেছে, বন্দরটি তৈরিতে খরচ হতে পারে ১২০ কোটি ডলার। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত উন্নয়ন অর্থায়ন মিলে প্রকল্পের অর্থের যোগান হতে পারে। এটিকে বিশ্ব মঞ্চে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরার উপায় হিসেবে দেখছেন পরিকল্পনার সমর্থনকারীরা। কারণ দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তাদের সঙ্গে গত মাসে ইসলামাবাদ নিরাপত্তা চুক্তিও করেছে।
বন্দর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরান ও মধ্য এশিয়া পাসনির কাছাকাছি হওয়ায় তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য বিকল্প পথগুলো খুলে দেবে। গোয়াদরের ভারসাম্যে পরিবর্তন এবং আরব সাগর ও মধ্য এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধি করবে।
বন্দর পরিকল্পনা আরও বলা হয়, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীনে গোয়াদরে চীনের বিনিয়োগ দ্বৈত-ব্যবহারের উদ্বেগ তৈরি করে। গোয়াদার চীনা নৌঘাঁটি হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মার্কিন উদ্বেগের ইঙ্গিত করছে এটি। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইসলামাবাদ ও বেইজিং।
চীন ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ। অস্ত্রশস্ত্র ও বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও বিনিয়োগের বেশিরভাগই দিয়েছে চীন। গত মে মাসের সংঘাতে ভারতের বিমান ভূপাতিত করতে চীনের বিমান ও অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করে পাকিস্তান।
পাসনিতে বন্দর পরিকল্পনায় সেখানে সরাসরি ঘাঁটির বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। আর আসিম মুনিরের উপদেষ্টারাও বলছেন, সেটি মার্কিন সামরিক স্থাপনা হিসেবে কাজ করবে না।
স্নায়ুযুদ্ধ ও ওয়ান-ইলেভেনের পর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর ছিল পাকিস্তানের। কিন্তু ২০০১ সালে আফগানিস্তানে ওয়াশিংটন নেতৃত্বে যুদ্ধের সময় তালেবানকে সমর্থন দেওয়ার পর সম্পর্ক ছিন্ন হয়। পাকিস্তান এখন বিনিয়োগ-বাণিজ্যের ওপর জোর দিয়ে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের এক উপদেষ্টা ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, “নেতাদের আমি বলেছি যে চীন থেকে আমাদের বের হওয়া উচিত। চীনের সঙ্গে আমাদের পরামর্শের দরকার নেই। কারণ এটি গোয়াদার আলোচনার বাইরে।”
এর আগে পাকিস্তানের খনিজসম্পদ খাতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ দেখা গেছে মিসৌরিভিত্তিক কোম্পানি ‘ইইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালস’ এর একটি চুক্তিতে। সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সামরিক প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই করেছে কোম্পানিটি।
পাকিস্তানের খনিজ সম্পদ খাত দেশটির জিডিপির মাত্র ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। দেশটির বেশিরভাগ খনিজ এলাকা পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে। ওই এলাকাগুলো বিদ্রোহপূর্ণ। গত বছর ওই অঞ্চলে সংঘাতে প্রায় ২ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে।
খনিজ সম্পদ জিডিপির মাত্র ৩ শতাংশ অবদান রাখলেও রাষ্ট্রীয় ‘পাকিস্তান কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’ এর চেয়ারম্যান হুসেইন আবিদি বলেন, বিশাল খনিজ সম্পদ ভাণ্ডারের সম্ভাবনা রয়েছে পাকিস্তানে।
পাসনি বন্দর পরিকল্পনাকে প্রথাগত সম্পর্কের বদলে অর্থনৈতিক বন্ধনের মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের উপায় হিসেবে দেখছেন হুসেইন আবিদি।