Published : 13 Mar 2026, 05:21 PM
প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দূরে চলা যুদ্ধের অভিঘাত এখন ভারতের রান্নাঘরে পৌঁছেছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ভারতজুড়ে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট তীব্র হচ্ছে।
ফলে দেশটির অনেক রেস্তোরাঁ তাদের মেনু ছোট করতে, কাজের সময় কমাতে এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে রান্নার গ্যাসের ডিলারদের সামনে দীর্ঘ লাইনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্বালানি সংকট নিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বাণিজ্যিক এলপিজি ব্যবহারকারীরা, বিশেষ করে রেস্তোরাঁ মালিকরা।
‘ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া’র কর্মকর্তা মনপ্রীত সিং বলেন, “পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। রান্নার গ্যাস পাওয়াই যাচ্ছে না।” দেশজুড়েই গ্যাসের এই সংকট অনুভূত হচ্ছে।
মনপ্রীত বলেন, দিল্লি থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারত সর্বত্রই রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেছে। টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেকে কয়লা, কাঠ এবং বৈদ্যুতিক কুকারের দিকে ঝুঁকছেন।
মুম্বাইয়ের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, এলপিজি সংকটে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের মজুত শেষ হয়ে আসছে।
বেঙ্গালুরুর এক বেকারি মালিক হারুন সাইত বলেন, “আমরা এখন কফি ছাড়া আর কিছুই বানাতে পারছি না। ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।”
সংকট মোকাবিলায় কোনও কোনও রেস্তোরাঁ দুপুরের খাবার পরিবেশন বন্ধ করে শুধু রাতের জন্য খোলা রাখছে। অন্যদিকে, বাজারে ইলেকট্রিক কুকারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা তা সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সরকারের দাবি ও বাস্তবতা:
ভারতে ৩০ কোটিরও বেশি এলপিজি গ্রাহক রয়েছেন। সংকটের পরও সরকার দাবি করছে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুজাতা শর্মা বলেন, “ভুল তথ্যের কারণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বেশি বুকিং এবং মজুত করছে। সাধারণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সরবরাহের চক্র এখনও স্বাভাবিক রয়েছে।”
ভারতের ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয় এবং এর ৯০ শতাংশই আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা যুদ্ধের কারণে বর্তমানে কার্যত বন্ধ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার তেল শোধনাগারগুলোকে গৃহস্থালির জন্য এলপিজি উৎপাদন ২৫ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে বাণিজ্যিক ব্যবহারের চেয়ে হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের বিকল্প উৎস:
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্যমতে, ভারতের সামগ্রিক জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা অতিরঞ্জিত হতে পারে। ভারত তাদের প্রয়োজনীয় তেলের ৯০ শতাংশ আমদানি করে, যার অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
কেপলারের বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া জানান, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলেও ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে হ্রাসকৃত মূল্যে তেল আমদানির মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে।
বর্তমানে ভারত মহাসাগরে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি ব্যারেল রুশ তেল ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, যা ভারত ও চীনের জন্য একটি বড় বিকল্প উৎস।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর এক পোস্টে বলেছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভারত একটি বড় অংশীদার এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনাকে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়।
আসল সংকট এলপিজি-তেই
বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরিশোধিত তেল বা রিফাইন করা জ্বালানি নিয়ে ভারত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও আসল দুর্বলতা হলো এলপিজি।
ভারত প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল এলপিজি ব্যবহার করে, যার মাত্র ৪০-৪৫ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়। শোধনাগারগুলো উৎপাদন ১০-২০ শতাংশ বাড়ালেও তা চাহিদার মাত্র অর্ধেক পূরণ করতে পারবে।
বাকি অর্ধেকের জন্য ভারতকে আমদানির ওপরই নির্ভর করতে হবে। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরিশোধিত তেলের ঝুঁকি রাশিয়া থেকে আমদানির মাধ্যমে কমানো গেলেও, আগামী কয়েক সপ্তাহে এলপিজি-র লভ্যতাই হবে ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজারে কালোবাজারি এবং সিলিন্ডার মজুতের অভিযোগও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।