Published : 17 Dec 2024, 07:41 PM
ভারতে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় পেশ হয়েছে 'এক দেশ, এক নির্বাচন' সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল।
বিরোধীদের আপত্তির মধ্যেই মঙ্গলবার দুটি বিল পেশ করেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়াল। বিল দুটি হচ্ছে- ১২৯তম সংবিধান সংশোধনী বিল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন (সংশোধনী) বিল।
লোকসভায় বিল পেশ হতেই কংগ্রেস পার্টি, তৃণমূল এবং সমাজবাদী পার্টির সাংসদরা বিরোধিতায় সরব হন। বিল পেশ করা হবে কিনা তা নিয়েও বিরোধীরা ভোটাভুটির দাবি তুলেছিল।
স্পিকার সেই দাবি মেনে নেন। নতুন পার্লামেন্ট ভবনে প্রথম ইলেকট্রনিক সিস্টেমে ভোটাভুটি হয়। বিল পেশের পক্ষে ভোট দেন সরকার পক্ষের ২৬৯ জন সাংসদ। আর বিপক্ষে ১৯৮ জন।
বিল পেশের পর সরকার জানায়,বিলটি তারা যৌথ সংসদীয় কমিটিতে পাঠাতে চায়। কমিটিতে প্রায় সব দলের সদস্য থাকবে। তারা বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রতিবেদন দেবে। সেই সুপারিশ মেনে বিলে পরিবর্তন করতে পারে সরকার।
এর পর বিল পাস হলে পৌঁছবে রাজ্যসভায়। সেখানে পাস হলে সই করবেন রাষ্ট্রপতি। এরপর তা পরিণত হবে আইনে।
কি বলা হয়েছে বিলে?
বিল দু’টিতে যে সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে- রাজ্য বিধানসভাগুলোর মেয়াদ এবং লোকসভায় মেয়াদ একই সময়ের মধ্যে নিয়ে আসা। অর্থাৎ, লোকসভা এবং বিধানসভার মেয়াদ একই সঙ্গে শুরু হবে, একই সঙ্গে শেষ হবে।
সহজ কথায় বলতে গেলে, ভারতজুড়ে একই সময়ে হবে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন। অর্থাৎ, রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মেয়াদ শেষ হবে একই সময়ে।
বর্তমানে ভারতে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হয়। যে রাজ্যে যখন সরকারের মেয়াদ শেষ হয়, তখন সেই রাজ্যে হয় বিধানসভা নির্বাচন।
এক দেশ এক নির্বাচনের সুবিধা কী?
‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অনেক দিন ধরেই আগ্রহী। লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহারেও এ বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল।
এই নিয়ম চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের যুক্তি, এ ব্যবস্থায় ভোট প্রক্রিয়ার জন্য যে বড় অঙ্কের খরচ হয়, তা কমে যাবে। ভোটের আদর্শ আচরণবিধির জন্য বার বার সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ থমকে থাকবে না।
তাছাড়া, সরকারি কর্মীদের উপর থেকেও ভোটার তালিকা তৈরি ও ভোট সংক্রান্ত নানা কাজকর্মের চাপ কমবে। একই সময়ে নির্বাচন হলে প্রশাসনিক কাজেও প্রভাব কম পড়বে। লোকবল ও সময় বাঁচবে।
বিলের সমর্থকরা বলছেন, গোটা দেশে একসঙ্গে নির্বাচন হলে ভোটারদের মধ্যে তার ভালো প্রভাবই পড়বে। সকলে একসঙ্গে ভোট দেবেন। এতে বাড়বে ভোটের হারও।
বিরোধিতা কেন?
একসঙ্গে দেশজুড়ে নির্বাচন করার ব্যবস্থা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বিরোধীদের যুক্তি, এই ব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় আঘাত এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পরিপন্থি।
এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিজেপি দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তাদের।
কংগ্রেস নেতা মনীশ তিওয়ারি বলেন, বিধানসভার মেয়াদ, লোকসভার উপর নির্ভর করতে পারে না। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী এটা হয় না। ভারত হল ইউনিয়ন অফ স্টেটস। কেন্দ্রের উপর নির্ভর করা সংবিধান বিরোধী।'
সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের মতে, গণতন্ত্র একের শাসন নয়, বহুর। এখানে একের স্থান নেই। 'এক দেশ, এক ভোট 'তাই গণতন্ত্রবিরোধী।
শিবসেনা নেত্রী প্রিয়াংকা চতুর্বেদীর অভিযোগ, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার মানসেই এ বিল আনা হয়েছে। এই বিল সংবিধান-বিরোধী।
বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর আশঙ্কা, ‘এক দেশ এক ভোট’ ব্যবস্থা কার্যকর হলে লোকসভার ‘ঢেউয়ে’ বিধানসভাগুলো ‘ভেসে যাবে’।
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সাংসদ এবং বিধায়ক নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেটুকু বৈচিত্রের সম্ভাবনা রয়েছে, বিজেপি’র এই প্রচেষ্টায় তা ভেঙে পড়বে বলে অভিযোগ করেছে কংগ্রেস
বিল পাস হবে?
বিরোধীদের তীব্র আপত্তির মুখে সরকার বিল পাস করাতে পারবে কিনা সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, বিল পাস করাতে গেলে লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন দরকার। আর দু’টি বিলই সংবিধান সংশোধন বিল।
নিম্নকক্ষ লোকসভা কিংবা উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা- কোথাও সরকারের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।
বিজেপি কীভাবে এ বিল লোকসভায় পাশ করাবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডিএমকে’র এক সাংসদ বলেছেন, “সরকারের যখন দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই নেই, তারা কিসের ভরসায় এ বিল সংসদে পেশ করছে?
কংগ্রেস নেতা শশী থারুর মনে করেন, এ বিল নিয়ে সরকার খুব বেশিদূর এগোতে পারবে না সেটি স্পষ্ট।
তবে কোনও পরিবর্তন বা সংশোধনী ছাড়া বিল দু’টি যদি সংসদে পাশ হয়েও যায়, তা হলেও সেটি কার্যকর হতে অনেক সময় লাগবে। ২০৩৪ সালের আগে এ ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।