Published : 28 Jan 2026, 02:59 PM
এক বছর আগে ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতি নিয়ে ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে বসেছিলেন, অনেকেই তখন একে চীনের শ্লথ অর্থনীতির জন্য ব্যাপক সমস্যা হিসেবে দেখছিলেন।
সেসব আশঙ্কাকে দূরে ঠেলে বেইজিং অন্য বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে রেকর্ড উদ্বৃত্তে দেশের অর্থনীতিকে আরও কয়েক কদম এগিয়ে নিয়েছে।
যেখানে ট্রাম্পের নীতি ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন মিত্র বলে পরিচিত দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক শীতল করেছে, চীন সেখানে কানাডা ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করায় মনোযোগ দিয়েছে, বলছেন বিশ্লেষকরা।
এর ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ২০২৫ সালে ছুঁয়েছে রেকর্ড এক লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার, মাসিক বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ পৌঁছেছে ১০ হাজার কোটি ডলারে, এমনকী বিশ্বজুড়েও চীনা মুদ্রা ইউয়ানের ব্যবহার বেড়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বুধবার সন্ধ্যায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার যখন সাম্প্রতি সময়ে তিক্ত হওয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে চীনে নামবেন, বেইজিং তখন বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত করার আশা দেখতেই পারে, মত বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের।
২০ লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতি ও ৪৫ লাখ কোটি ডলার মূল্যের স্টক ও বন্ড বাজারের সহায়তায় চীন এখন বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই ‘স্থিতিশীল অংশীদার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, বলছেন বোস্টন কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক আলেক্সান্দার তোমিক।
অলস্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টের ডেরিক আরউইন বলেছেন, “নিজেদেরকে আস্থাযোগ্য ও স্থিতিশীল বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে হাজির করতে চীন ভালো ও সঠিক কাজটাই করেছে বলে আমি মনে করি।
“তারা মূলত বলছে, দেখো, তোমাদের বড় বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র এখন খানিকটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। আমরা ধারাবাহিকতা ও নিশ্চয়তা দিতে পারি। এটা ঠিক বলেই মনে হয় আমার।”
এ কারণেই ২০১৮ সালের পর এবারই প্রথম ব্রিটিশ কোনো প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাচ্ছেন। তার এ চারদিনের সফরের আগে এ মাসেই চীন ঘুরে গেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। কানাডার শেষ কোনো প্রধানমন্ত্রী বেইজিং গিয়েছিলেন ২০১৭ সালে।
কার্নির সফরকালে দুই দেশ নিজেদের মধ্যে থাকা শুল্ক বাধা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি করেছে, গড়েছে ‘নতুন কৌশলগত সম্পর্ক’। কার্নি এবার চীনকে ‘অনেক বেশি অনুমানযোগ্য ও আস্থাশীল অংশীদার’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে সৃষ্ট ঝুঁকির কারণে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য দেশ বা জোটের সঙ্গে চুক্তি করার দিকে কেবল যে চীনেরই চোখ রয়েছে তা নয়। ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মঙ্গলবার ‘মাদার অব অল ডিলস’ নামে খ্যাতি পাওয়া একটি বাণিজ্য চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছে।
বহুল আকাঙ্ক্ষিত এ চুক্তির ফলে ভারত ও ইইউ উভয়ই অন্য পক্ষের বাজারে তার বেশিরভাগ পণ্য কম শুল্কে প্রবেশ করাতে পারবে। তাদের মধ্যে বাণিজ্যও কয়েকগুণ বাড়বে এবং দক্ষিণ এশীয় দেশটিতে ইউরোপের রপ্তানির পরিমাণ ২০৩২ সাল নাগাদ দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
চীনের অর্থনৈতিক দৃঢ়তা
বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরেই ভূরাজনৈতিক নানান মতবিরোধ নিয়ে দ্বন্দ্বে আছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর বাণিজ্য, প্রযুক্তিসহ একাধিক ফ্রন্টে এই দ্বন্দ্ব-উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
গেল এপ্রিলে ট্রাম্প চীনের পণ্যে ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপ করে বসেন, পরে অবশ্য তা অনেকখানি কমান এবং ‘অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতেও’ পৌঁছান। এর পাল্টায় বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাজারগুলোতে তার রপ্তানি বাড়ায় এবং নিজেদের ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানি ও বাজারগুলোকে সহায়তা দিতে নানান পদক্ষেপ নেয়।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো চীনা পণ্য ২০ শতাংশ কমলেও আফ্রিকায় ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ১৩ দশমিক ৪ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
“অনেক দেশ আগে চীন-বান্ধব না থাকলেও এখন বেইজিংয়ের দিকে ঝোঁক বাড়িয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ অপ্রত্যাশিত আচরণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যত কঠিন হবে, ততই চীনের সুযোগ উন্মুক্ত হতে থাকবে,” বলেছেন তোমিক।
দেশজুড়ে লোকজন কেনাকাটা কমিয়ে দেওয়ায় এবং আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদী মন্দার সঙ্গে জুড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনা, তারপরও চীন গত বছর ৫% প্রবৃদ্ধির সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পেরেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে একের পর এক পদক্ষেপও নিয়েছে; টেলিকম, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো সেবাগুলোতে অন্যদের প্রবেশাধিকার সহজ করতে বেইজিং, সাংহাই ও অন্য এলাকায় অনেক পাইলট প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে।
ডিসেম্বরে দেশটি তাদের মাসিক বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ দেখেছে ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি, যা এর আগে কখনোই দেখা যায়নি। তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৩৬ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে, বলছে ব্যাংকের তথ্য।
বাণিজ্য যুদ্ধ চলাকালেও এর শেয়ার বাজারকে চাঙ্গা দেখা গেছে। গত বছর সাংহাই সূচক ২৭% বেড়েছে।
বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি নিয়ে ট্রাম্পের মারমুখী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলার ক্রমশ আকর্ষণ হারাচ্ছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেইজিং ইউয়ানকে সামনে আনার চেষ্টা করছে বলে বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অনেক আন্তর্জাতিক ব্যাংক-ই এখন চীনের বাইরে ইউয়ানে লেনদেন বাড়াতে জোর দিচ্ছে এবং চীন ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্য করিডোরগুরোতে ইউয়ানে দ্রুত লেনদেন সারার অবকাঠামো বানাচ্ছে, বলেছেন তারা।
“ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো জায়গায় নিয়ে আসতে চীনকে বেশ কয়েকবারই আমরা চেষ্টা করতে দেখেছি, এবং পরে তারা পিছুও হটেছে। এবার ব্যাপারটা ভিন্ন, ট্রাম্পের নীতিগুলো ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে বেশ সহায়ক হচ্ছে,” বলেছেন চীনে সক্রিয় একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের এক কর্মকর্তা।
অন্য দেশের সঙ্গে চীনের লেনদেনের অর্ধেকের বেশি এখন ইউয়ানেই হয়, অথচ ১৫ বছরে আগেও চীনের এমন লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্য। চীনের ব্যাংকগুলো বিদেশে যে ঋণ দিচ্ছে তার প্রায় অর্ধেকই এখন ইউয়ানে (সরকারি নাম আরএমবি) দেওয়া হচ্ছে বলেও পিপলস ব্যাংক অব চায়না (পিবিওসি) এবং স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব ফরেন এক্সচেঞ্জের (এসএএফই) তথ্যে বলা হচ্ছে।
ডলারের বিপরীতে গত বছর ইউয়ানের দরও বেড়েছে প্রায় সাড়ে চার শতাংশ।
উদ্বেগ থাকছেই
অনেক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক চীনের এই নতুন, বন্ধুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দিচ্ছেন।
নতুন নতুন বাণিজ্য চুক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস তার মিত্র ও অংশীদারদের এত সহজে বেইজিংয়ের প্রতি আস্থাশীল করে তুলবে না।
“চীনের বাণিজ্য কৌশল, অর্থনৈতিক জবরদস্তি ও সমুদ্রসীমা ও ঐতিহাসিক বিরোধ সমাধান না করা নিয়ে অনেক দেশেরই গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
“এই মুহূর্তে চীন ট্রাম্প প্রশাসনের উত্তেজক কথাবার্তা ও পদক্ষেপের তুলনায় অনেক বেশি সংযত ও বাস্তববাদী হিসেবে হাজির হতে পারে। কিন্তু বেইজিংয়ের বাস্তব আচরণ আশ্বস্ত করার মতো নয়,” বলেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক ফেলো প্যাট্রিসিয়া কিম।