১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ট্রাম্পের ‘ইকোনমিক ডি-ডে’: ইরানের অর্থনীতিতে কতটা ধাক্কা দিতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র?

দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অভাবে নতুন নিষেধাজ্ঞাও ব্যর্থ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্রাম্পের ‘ইকোনমিক ডি-ডে’: ইরানের অর্থনীতিতে কতটা ধাক্কা দিতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 21 Aug 2026, 01:59 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:52 PM

ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প; তবে প্রায় ছয় মাস পার হলেও সেই সংঘাত চরম অচলাবস্থায় আটকে রয়েছে। ফলে সামরিক জয় কিংবা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার সম্ভাবনা দিন দিন ঝাপসা হয়ে আসছে।

এই অচলাবস্থা কাটতে ট্রাম্প এক ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বা চরম অর্থনৈতিক অবরোধের নীতি ঘোষণা করেছেন। 

এর আওতায় বিশ্বের যে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে কোনো প্রকার লেনদেন বা ব্যবসা অব্যাহত রাখলে তাকে ‘ভয়াবহ’ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। 

বিবিসি লিখেছে, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়ে আসছে। সংঘাত যত গড়াচ্ছে, দেশটি ততটাই অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সহ্য করার এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আগের সমস্ত কৌশল যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে আরও নতুন নিষেধাজ্ঞা কি আদৌ ফলপ্রসূ হবে?

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ দেবে, তার সুনির্দিষ্ট কৌশল বা কার্যপদ্ধতি কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ২৪ অগাস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে এর বিস্তারিত কাঠামো প্রকাশের আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানকে সহায়তা করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে–এমন যে কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত, সে তারা বন্ধু হোক বা শত্রু।

বেসেন্ট কড়া ভাষায় বলেন, “আপনারা হয় আমাদের পক্ষে, না হয় আমাদের বিপক্ষে। আপনারা যদি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া, অর্থ স্থানান্তর করা, তাদের কাছ থেকে তেল কেনা কিংবা সমুদ্রপথে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করেন, তাহলে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ও যুক্তরাষ্ট্র সরকার পূর্ণ শক্তি দিয়ে আপনাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করবে।”

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই নিষেধাজ্ঞাকে সংঘাতের একটি ‘নতুন ধাপ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, অর্থনৈতিক চাপই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা সবচেয়ে ‘কার্যকর’ হাতিয়ার।

‘ক্লে ট্র্যাভিস অ্যান্ড বাক সেক্সটন শো’-তে ভ্যান্স বলেন, “তারা আমাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে চাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা হল, গত কয়েক সপ্তাহে আমাদের চেয়ে তারা অনেক বেশি চাপ অনুভব করেছে। আমরা এই চাপ বজায় রাখব, কারণ চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের এটাই সেরা উপায়।”

দীর্ঘদিন ধরেই নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান

১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের প্রায় শুরু থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। 

বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক সমঝোতা (জেসিপিওএ) থেকে ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন বেরিয়ে আসার পর এই অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র করা হয়।

আর এবার ইরান যুদ্ধ শুরুর সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় ইরানের শাসকগোষ্ঠীর আর্থিক প্রবাহের ওপর মার্কিন ট্রেজারি-সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ চলছে।

ওয়াশিংটন ডিসির আটলান্টিক কাউন্সিলের ভূ-কৌশল বিশেষজ্ঞ ও পেন্টাগনের সাবেক নীতি উপদেষ্টা ইমরান বায়ুমি বিবিসিকে বলেন, অন্য কোনো পথ ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে না পারায় ওয়াশিংটনের জমে থাকা হতাশা থেকেই সর্বশেষ এই ঘোষণাটি এসেছে।

তিনি বলেন, “এটি মূলত এই সত্যের স্বীকৃতি যে যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে এক প্রকার আটকে গেছে। অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলানোর এটি আরেকটি চেষ্টা মাত্র।”

বায়ুমি বলেন, “এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত আরেকটি অস্ত্র মাত্র। তবে সামরিক বা অর্থনৈতিক কোনো দিক দিয়েই মার্কিন প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট কোনো দীর্ঘমেয়াদী কৌশল আমরা দেখতে পাচ্ছি না। যুক্তরাষ্ট্র আসলে শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করতে চায়, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।”

মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল অফিসে (ওএফএসি) আট বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞ মাইকেল পার্কারের। তিনি মনে করেন, এই নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য হবে নিষেধাজ্ঞার ‘অর্থনৈতিক ব্লাস্ট রেডিয়াস’ বা প্রভাবের পরিধি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া। 

মূলত যেসব তৃতীয় দেশ এখনও ইরানের সঙ্গে লেনদেন করছে এবং যাদের অর্থনীতি মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীল, তাদেরকে টার্গেট করা হচ্ছে।

পার্কার বলেন, “এতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন নীতি মানতে বাধ্য করার জন্য গৌণ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার (সেকেন্ডারি স্যাংশন) হুমকি ব্যবহার করেছে। কিন্তু মার্কিন ডলারের সঙ্গে যুক্ত এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে লেনদেনে সম্পৃক্ত যে কোনো সংস্থাকে সরাসরি টার্গেট করার এই অস্ত্রটি এতদিন এক প্রকার অব্যবহৃতই ছিল।”

উদাহরণ হিসেবে পার্কার এমন সব বিদেশি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছেন, যারা ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে বা তাদের সরকারি তহবিলে অর্থ পাঠাতে সহায়তা করে।

এদিকে, মার্কিন এই পদক্ষেপের জবাবে ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। 

তবে সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপ্রচলিত ও গোপন পথ ব্যবহার করে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান যে বেশ দক্ষ, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। 

যেমন, ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ট্র্যাকার বন্ধ রাখা গোপন জাহাজে তেল পরিবহন করা অথবা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নাম না থাকা নতুন নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করার কৌশল ইরান ইতোমধ্যে দেখিয়েছে। 

লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হামুদা বলেন, “আপনি দেখতে পাবেন যে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নাম সামনে আসছে, কারণ ইরান খুব দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। যে নিষেধাজ্ঞাই আরোপ করা হোক না কেন, তারা ঘুরে যাওয়ার জন্য নতুন কোনো পথ বের করে নেয়।”

তিনি বলেন, ইরানের পাল্টা পদক্ষেপগুলো প্রায়ই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন করে তোলে।

হামুদার মতে, “নিষেধাজ্ঞাগুলো শুধুই কাগজে-কলমে থাকে, আসল কঠিন কাজটা হয় নেপথ্যে। বিশ্বজুড়ে বহু টিম এগুলো প্রয়োগ করতে এবং জড়িত পক্ষগুলোকে সনাক্ত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, আর সে কারণেই ইরানও প্রতিনিয়ত নতুন পথ খুঁজছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে চীন কিংবা আমেরিকার মিত্র তুরস্ক ও ইরাকের ওপর। 

ওএফএসির সাবেক বিশেষজ্ঞ মাইকেল পার্কারের মতে, টার্গেট করা দেশগুলো ডলারভিত্তিক বাণিজ্যে ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে ইরানকে ব্যাংকিং সুবিধা দেবে কি না, তার ওপরই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আসল শক্তি নির্ভর করছে।

তবে ভূ-কৌশল বিশেষজ্ঞ ইমরান বায়ুমি মনে করেন, চীনসহ অন্য দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে দরকষাকষি করবে, মার্কিন নির্দেশ অন্ধভাবে মানবে না। 

তার মতে, একটি সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের ঘাটতি থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন হাতিয়ারও শেষ পর্যন্ত হয়ত বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না।