ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: কী কী নিয়ে সমঝোতা, কোথায় চ্যালেঞ্জ
নয়া দিল্লিতে ভারত-ইইউ সম্মেলনে চুক্তি সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কয়েক বছরের দীর্ঘ আলোচনার পর বহুল আকাঙ্ক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
মঙ্গলবার নয়া দিল্লিতে ভারত-ইইউ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে অনেকেই অনুমান করছেন।
এই চুক্তির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক, কী কী বিষয়ে সমঝোতা ও কোন কোন জায়গায় চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার সারসংক্ষেপ উঠে এসেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে।
অনুমোদন ও প্রভাব
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে তা কার্যকরের আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুমোদিত হতে হবে। এই অনুমোদন প্রক্রিয়া শেষ হতে ন্যূনতম এক বছর লাগতে পারে।
অবশ্য সব বাধা পেরিয়ে চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে, টেক্সটাইল ও জুয়েলারির মতো ভারতীয় পণ্যের রপ্তানি বাড়বে, যা গত বছরের অগাস্ট থেকে মার্কিন ৫০% শুল্কের ধাক্কায় বিপর্যস্ত।
দিনকয়েক আগে ইইউ আইনপ্রণেতাদের এক ভোট ইইউ-দক্ষিণ আমেরিকা চুক্তিকে ইউরোপীয় জোটের শীর্ষ আদালতে চ্যালেঞ্জ করার পথ খুলে দিয়েছে, যা বোঝাচ্ছে কোনো চুক্তির ইইউ পার্লামেন্টে অনুমোদিত হওয়া কতটা জটিল। ভারত-ইইউ এফটিএ-র ক্ষেত্রেও এ ধরনের জটিলতা থাকলে অনুমোদন পেতে সময় বেশি লাগতে পারে।
বিনিয়োগ সুরক্ষা ও ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) নিয়ে আলোচনা পৃথকভাবে হবে। যার ফলে এফটিএ-তে কেবল পণ্য, সেবা ও বাণিজ্য নীতিরই প্রাধান্য থাকবে।
যে কারণে এ চুক্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ
এটা হতে যাচ্ছে চার বছরের মধ্যে ভারতের নবম বাণিজ্য চুক্তি। বিশ্ব বাণিজ্য অনেক বেশি রক্ষণশীল হয়ে ওঠায় নয়া দিল্লি যে এখন বিভিন্ন বাজারে তার পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে মনোযোগ বাড়াচ্ছে এসব চুক্তিতে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
এদিকে ইইউ চাইছে তার সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বৈচিত্র্য আনতে, পাশাপাশি চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে। এই চুক্তি তাকে সেই সুযোগ তো দেবেই সঙ্গে করে দেবে ভারতের ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলারের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ।
ভারত যেভাবে লাভবান হবে
ইইউ ভারতের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার, এ তালিকায় আরও আছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার কোটি ডলার। এ সময়ে ভারত ২৭ দেশের ইউরোপীয় জোটটিতে তিন হাজার কোটি ডলারের পরিষেবা ও ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
ভারতীয় পণ্যে ইইউ-র গড় শুল্ক মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ; তবে টেক্সটাইল ও পোশাকের মতো শ্রমঘন খাতের ক্ষেত্রে এই শুল্ক ১০ শতাংশের মতো বলে জানাচ্ছে দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিসিয়েটিভ।
২০২৩ সাল থেকে ইইউ ভারতের তৈরি পোশাক, ওষুধ, যন্ত্রপাতির মতো অনেক পণ্য থেকে জিপিএস (জেনারালাইজড সিস্টেমস অব প্রেফারেন্সেস) সুবিধা তুলে নেওয়া শুরু করে। এর ফলে ভারতীয় পণ্য অন্য অনেক দেশের পণ্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ হারিয়েছিল। নতুন এফটিএ নয়া দিল্লিকে ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার সুযোগ করে দেবে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া উচ্চ হারের শুল্কের প্রভাব কমাতে সুযোগ করে দেবে।
ইইউ-র সঙ্গে এই এফটিএ-তে ভারত তার তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা রপ্তানি ও দক্ষ পেশাজীবীদের সহজ প্রবেশাধিকারও চাইতে পারে।
ইইউ-র কী লাভ
ভারতে ইইউ পণ্যর শুল্ক বাধা তুলনামূলক বেশি। ২০২৪-২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৬ হাজার ৭০ কোটি ডলারের পণ্যকে ভারতে ঢুকতে গড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়েছে।
বিশেষ করে গাড়ি, গাড়ির যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক ও প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে এ শুল্ক অনেক বেশি। এফটিএ-তে শুল্ক কমলে ভারতে গাড়ি, যন্ত্রাংশ, এয়ারক্রাফট ও রাসায়নিক খাতে ইইউ কোম্পানিগুলোর সুযোগ বাড়বে; সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে বিনিয়োগ, ক্রয় ও পরিষেবার প্রবেশাধিকার বাড়বে।
কোথায় কোথায় চ্যালেঞ্জ
কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্য বাদ থাকছে। এসব খাতের ৯৫% পণ্যে শুল্ক প্রত্যাহারে ইইউ-র আকাঙ্ক্ষায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত। তারা শুল্ক আরোপ করা পণ্যের সংখ্যা কমিয়ে ৯০ শতাংশে আনার ইঙ্গিত দিয়েছে।
গাড়ি, ওয়াইন ও স্পিরিট নিয়ে এখনও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ আছে। দেশীয় উৎপাদকদের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ভারত এসব পণ্যে ব্যাপক হারে শুল্ক কমানোর বদলে ধাপে ধাপে শুল্ক কমিয়ে আনা বা কোটা ঠিক করে দেওয়ার কথা ভাবছে।
ভারত ইইউ তথ্যনীতিতে ‘তথ্য-নিরাপদ’ মর্যাদা চায়, এমনটা হলে তথ্য আদান-প্রদানে আইনি বাধা কমে আসবে, ইউরোপের দেশগুলোতে ভারতের বিনিয়োগ সম্ভাবনাও বাড়বে। এর পাশাপাশি নয়া দিল্লি তার পেশাজীবীদের ইইউ দেশগুলোতে সহজ প্রবেশাধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তাবাবদ দ্বিগুণ অর্থ প্রদানের হাত থেকেও মুক্তি চায়।
অন্যদিকে ইইউ চায় ভারতের আর্থিক ও আইনি পরিষেবায় বিস্তৃত প্রবেশাধিকার এবং শ্রম, পরিবেশ ও মেধাস্বত্ত্বের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি। এসব খাতে নয়া দিল্লি ঢিলেঢালা নীতিতে চলতে চায়।
ভারতের আপত্তি যেখানে
যে দুটো বিষয়ে নয়াদিল্লির প্রধান উদ্বেগ, তার একটি হচ্ছে কার্বন নির্গমনের ভিত্তিতে ইইউর ধার্য বাড়তি কর বা কার্বন বর্ডার লেভি। শুল্ক কমায় ভারতীয় রপ্তানিকারকদের যে লাভ হত, এই কর তা কমিয়ে দেবে। আর আরেকটি হচ্ছে নিয়মকানুনের ক্ষেত্রে ধীরগতি, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও সনদপ্রাপ্তিতে বাড়তি খরচের মতো উচ্চ অ-শুল্ক বাধা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যে একের পর এক ধাক্কা ব্রাসেলস ও নয়া দিল্লিকে একটি বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য সমঝোতার দিকে ধাবিত করছে।
তবে শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে কিনা তা নির্ভর করবে কার্বন কর, পরিষেবার প্রবেশগম্যতা ও অ-শুল্ক বাধাগুলো কীভাবে নির্ধারিত হয় তার ওপর।
