১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ট্রাম্পের ৫০% শুল্ক এড়াতে সময় আছে ২০ দিন, কী করবে ভারত?

মূল প্রশ্ন হল, ভারত সরকার এই শুল্ক এড়াতে কি চুপিসারে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক পরিহার করবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়াবে?

ট্রাম্পের ৫০% শুল্ক এড়াতে সময় আছে ২০ দিন, কী করবে ভারত?
নরেন্দ্র মোদী। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Aug 2025, 01:16 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:32 PM

ইউক্রেইন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ চাপ প্রয়োগের কৌশলে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে ভারত।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যে শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার "শাস্তি" হিসেবে।

ভারত এই সিদ্ধান্তকে “অন্যায়” ও “অযৌক্তিক” বলে কড়া নিন্দা করেছে। শুল্কের এই নতুন হার কার্যকর হবে ২৭ অগাস্ট থেকে। অর্থাৎ, ভারতের হাতে এখন মাত্র ২০ দিন সময় আছে এই শুল্কের চাপ এড়ানোর জন্য।

এতে করে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি কর আরোপিত বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছে ভারত। একই সঙ্গে ব্রাজিলের পাশে জায়গা করে নিয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে একই ধরনের শুল্কের শিকার।

ভারতের বক্তব্য, রুশ তেলের আমদানি মূলত বাজারচালিত এবং জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে। তবে এই শুল্কের ফলে ভারতের রপ্তানি খাত ও প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 ৮,৬৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি হুমকিতে:

বর্তমানে বছরে ৮, ৬৫০ কোটি ডলারের ভারতীয় পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। ট্রাম্পের উচ্চহারের শুল্ক আরোপ স্থায়ী হলে এই রপ্তানি পণ্যের বেশিরভাগই বাণিজ্যিক ভিত্তি হারাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভারতের বেশিরভাগ রপ্তানিকারক বলছেন, ১০-১৫ শতাংশ শুল্কের বোঝাও তারা কষ্টে টানেন। সেখানে ৫০ শতাংশ শুল্কের হার তাদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে।

জাপানি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান নমুরা বলছে, এই শুল্ক কার্যকর হলে তা কার্যত এক ধরনের "বাণিজ্য অবরোধ"-এর শামিল হবে এবং প্রভাবিত পণ্যের রপ্তানি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। এটি ভারতের ১৮ শতাংশ রপ্তানি ও ২ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি’র উৎস। ট্রাম্পের শুল্কের ফলে ভারতের জিডিপি ০.২ থেকে ০.৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

 সবচেয়ে বড় ধাক্কা টেক্সটাইল-গয়নায়

ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাত আপাতত অতিরিক্ত শুল্কের আওতায় আসছে না। কিন্তু কর্মনির্ভর খাত—বিশেষ করে টেক্সটাইল ও রত্ন-গয়না—গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা কিশোর।

ভারতীয় টেক্সটাইল শিল্পের সংগঠন সিআইটিআই’র রাকেশ মেহরা এই শুল্ককে বস্ত্র রপ্তানিতে “বিশাল ধাক্কা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

উত্তেজনা বাড়ার এই সময়ে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের এই সিদ্ধান্তকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া বলেই অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন ভারত?

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, চীন ও তুরস্কও রাশিয়ার তেল কেনে, তাহলে কেবল ভারতকে কেন টার্গেট করা হল?

প্রাক্তন রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর উর্জিত প্যাটেল বলেন, “যেটা ভারতের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল, সেটাই এখন ঘটছে।”

তিনি আশাবাদী, এটি সাময়িক এবং চলতি মাসের প্রস্তাবিত বাণিজ্য আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে। না হলে তার মতে, এক ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যার পরিণতি এখনই আঁচ করা কঠিন।

ভারতের সামনে কী বিকল্প রয়েছে?

ট্রাম্পের শুল্কের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণেই তা স্থায়ী হোক এমনটি তেমন কেউ চাইবে না। ফলে ২৭ অগাস্ট এই শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগের ২০ টি দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

এই সময়ে দরকষাকষির পথে ভারতের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবেই নজরে রাখবে উৎকণ্ঠায় থাকা বাজারগুলো।

মূল প্রশ্ন হল: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকার এই শুল্ক এড়াতে কি এখন চুপিসারে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক পরিহার করবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়াবে?

চ্যাথাম হাউসের চিয়েতিজ বাজপেয়ির মতে, ভারতের রুশ অস্ত্র নির্ভরতা কমানো ও তেলের অন্যান্য উৎস সন্ধান ট্রাম্পের শুল্কারোপের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। 

তাই কিছু নমনীয়তা দেখিয়ে ভারত বর্তমান বৈদেশিক নীতি পরিচালনার আওতায় সমঝোতার পথ খোলা রাখতে পারে।

বাজপেয়ির মতে, রাশিয়ার সঙ্গে সতর্কতার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেছে ভারত। তবে রাশিয়া ভবিষ্যতে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারই থেকে যাবে। 

ওদিকে, আন্তর্জাতিক শান্তি বিষয়ক থিংক ট্যাংক কার্নিগ এনডোওমেন্ট এর বিশেষজ্ঞ অ্যাশলে ট্যালিজ বলছেন, “ভারত এখন একটি ফাঁদে পড়েছে। 

“কারণ, ট্রাম্পের চাপের মুখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমালেও প্রকাশ্যে সেকথা বলতে পারবেন না এই ভয়ে যে, একথা বললে সেটা ট্রাম্পের ব্ল্যাকমেইলের কাছে ভারতের আত্মসমর্পণ করার মতোই দেখাবে।”

অনেক বিশেষজ্ঞ আবার বলছেন, ট্রাম্পের শুল্কের এই পদক্ষেপ ভারতের জন্য কৌশলগত সম্পর্ক পুনরায় ভেবে দেখার একটি সুযোগ করে দিয়েছে।

‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’-এর বিশেষজ্ঞ অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ট্রাম্পের শুল্কের এই পদক্ষেপ হয়ত ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও সরে গিয়ে রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মোদী এ মাসেই সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে চীন সফর করবেন। ২০২০ সালের গালওয়ানে চীনের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের পর প্রথম এই সম্মেলনে যাচ্ছেন মোদী। কেউ কেউ বলছেন, ভারত-রাশিয়া-চীন ত্রিপাক্ষিক আলোচনা আবার শুরু হতে পারে।

আপাতত ভারতের মনোযোগ অগাস্টের বাণিজ্য আলোচনার দিকে। কারণ, এমাসেই ভারতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচক দল। আলোচনা এর আগে থমকে ছিল কৃষি ও দুগ্ধ খাত নিয়ে। এই দুই খাতে ছাড় দেওয়া মোদী সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

অন্যদিকে, আরেকটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের চীন-প্লাস-ওয়ান বিনিয়োগ কৌশলের কি হবে? ভিয়েতনামের মতো দেশ তুলনামূলক কম শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে ট্রাম্পের শুল্কের কারণে গতিশীলতা কমার ঝুঁকি আছে।

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, বিনিয়োগকারীদের ভাবাবেগে এর প্রভাব সীমিত হতে পারে। অ্যাপলের মতো সংস্থাগুলি এখনো ভারতে উৎপাদনে আগ্রহী এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো খাত শুল্কবহির্ভূত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এও দেখবেন যে, ভারত তাদের রপ্তানিকারকদের সহায়তা দিতে কী পদক্ষেপ নেয়।

জাপানের ফার্ম নমুরা বলছে, রপ্তানিকারকদের সহায়তা করতে ভারত সরকার এখনও সরাসরি ভর্তুকির পথে হাঁটেনি। তবে রপ্তানিতে অগ্রগতি ও অনুকূল বাণিজ্যে অর্থায়নের প্রস্তাবিত যেসব প্রকল্প ভারত সরকারের হাতে আছে, তা ট্রাম্পের আরোপ করা এত বড় মাত্রার শুল্কের প্রভাব সামাল দিতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

উচ্চ ঝুঁকি বিরাজ করার মধ্যে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিই পারে বাণিজ্য চুক্তি পুনরুদ্ধার করতে, যে চুক্তি কয়েক সপ্তাহ আগেই হাতের মুঠোয় আছে বলে মনে হয়েছিল।

এই মুহূর্তে অবশ্য ভারত সরকার শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বলেছে, তারা তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।

ভারতের বিরোধীদল কংগ্রেস পার্টি এরই মধ্যে ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্কের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’ আখ্যা দিয়েছেন এবং  “ভারতকে অন্যায্য চুক্তিতে বাধ্য করার অপচেষ্টা” বলে মন্তব্য করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোদীর মজবুত ‘মেগা পার্টনারশিপ’ কি এখন তার পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে? ভারত কি এখন এর জবাব দেবে?

বার্কলেজ রিসার্চ সেন্টার বলছে, পাল্টা জবাব দেওয়ার সম্ভাবনা ভারতের নেই। তবে তা করাটা অসম্ভবও নয়। কারণ, এমন নজির আছে।

২০১৯ সালে অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের জবাবে ভারত আপেল ও বাদামসহ ২৮টি মার্কিন পণ্যে শুল্ক বসিয়েছিল। তবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি পর সেই শুল্কের কিছু ২০২৩ সালে আবার তুলে নেওয়া হয়।