Published : 06 Aug 2026, 11:35 PM
মিয়ানমারে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে শান্তি আলোচনার এক বিরল পথ খুলছে। এর নেপথ্যে আছে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির পরিবর্তন, যেখানে সেনাবাহিনী সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরে এসেছে এবং আলোচনায় বসার জন্য আঞ্চলিক চাপও বাড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবর্তনের হাওয়া সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারের ছায়া সরকার এবং প্রধান প্রধান জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্মিলিত মোর্চা ‘দ্য স্টিরিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য ইমার্জেন্স অব আ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন’ (এসসিইএফ) এর অবস্থান থেকে।
এসসিইএফ গত মাসে থাইল্যান্ড ও ফিলিপিন্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর জানিয়েছে যে, তারা সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আলাদাভাবে মিয়ানমারের সামরিক আলোচনা কমিটির সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন।
মিয়ানমারের জান্তা প্রধান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং এখনও এসসিইএফ-কে আলোচনার অংশীদার হিসেবে মেনে নেননি। তবে এই সপ্তাহে হ্লায়িং থাইল্যান্ড সফর করছেন।
থাইল্যান্ড চায় আঞ্চলিক জোট আসিয়ান যেন তাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে ধীরে ধীরে আবার সম্পর্ক স্থাপন করে। তাই হ্লাইংয়ের এই থাইল্যান্ড সফর মূলত যুদ্ধবিরতি বা শান্তি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর চেষ্টাকেই সামনে আনছে।
‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এর গবেষণা ফেলো মরগান মাইকেলস মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং এসসিইএফ এর কথা উল্লেখ করে বলেছেন, “দেখে মনে হচ্ছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বা তাতমাদোকে উৎখাত করার যে প্রকাশ্য লক্ষ্য প্রতিরোধ যোদ্ধারা আগে ঘোষণা করেছিল, তারা এখন তা থেকে সরে এসেছে।”
তিনি এও বলেন, "তারপরও, তাতমাদো এবং এসসিইএফ দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু হতে এখনও অনেক দেরি। তবে সামনের দিনগুলোতে হয়ত আমরা অন্তত তাদেরকে 'সংলাপ নিয়ে আলোচনার' দিকে এগিয়ে যেতে দেখতে পাব।"
‘আলোচনার দ্বার খোলা’
‘দ্য স্টিরিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য ইমার্জেন্স অব আ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন’ এর মুখপাত্র স নিমরোড বলেছেন, এসসিইএফ এর উদ্দেশ্য হল, বেসামরিক নাগরিকদের আধিপত্য নিশ্চিত করা এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে যে কোনও রাজনৈতিক ভূমিকা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া।"
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, "এটি আমাদের চূড়ান্ত দাবি। তবে আপাতত আমরা আলোচনা-ভিত্তিক রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সংলাপের জন্য প্রস্তুত এবং রাজনৈতিক আলোচনার জন্য আমাদের দ্বার খোলা।"
অর্থবহ সংলাপের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে, এসসিইএফ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ করা এবং সব রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মিয়ানমারের নতুন সরকারও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছিল। সেনাবাহিনী পরিচালিত নির্বাচনের মাধ্যমে এই নতুন সরকার মিয়ানমারের ক্ষমতায় এসেছে এবং এর ফলে মিন অং হ্লাইং বেসামরিক দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
মিন অং হ্লাইং মুখে বলছেন, তিনি শান্তি চান। গত সপ্তাহে তিনি পার্লামেন্টে বলেন "শান্তি আমাদের আকাঙ্ক্ষা, আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।" যদিও সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে, হ্লায়িং ক্ষমতায় আসার পর থেকে সাধারণ মানুষের ওপর সামরিক বাহিনীর হামলা অনেক বেশি বেড়ে গেছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে সংঘাতে এ পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তবে বর্তমানে বিরল কূটনৈতিক উদ্যোগ মিয়ানমারের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও সহিংস গৃহযুদ্ধ থামাতে প্রথম এক আশার আলো হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
জান্তা বাহিনী উন্নতির দিকে
সংঘাতের প্রথমদিকে মিয়ানমার জান্তা বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও, চীনের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পাওয়ার মধ্য দিয়ে তারা সম্প্রতি নিজেদের অবস্থান কিছুটা পুনরুদ্ধার করেছে।
সামরিক কৌশলগত সীমান্ত এলাকাগুলো সেনাবাহিনী পুনর্দখল করার চেষ্টা করছে। তাছাড়াও, মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলীয় বাগো এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় ডাউই অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর তীব্র অভিযানের কারণে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কিছু এলাকা থেকে পিছু হটেছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দুজন যোদ্ধা।
“আগে ধারণা করা হত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তারা ভেঙে পড়েনি বরং রাজনৈতিক ও সামরিক দুইভাবেই টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে," বলেছেন মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন বিশ্লেষক অং কো কো।
আলোচনার জন্য কূটনৈতিক চাপ
এসসিইএফ ভুক্ত কিছু জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ছে বলে তিনজন বিশ্লেষক জানিয়েছেন।
এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আছে- কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন, কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স অর্গানাইজেশন, চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট এবং কারেন্নি ন্যাশনাল প্রগ্রেসিভ পার্টি। দলগুলো এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে করা অনুরোধে কোনও সাড়া দেয়নি।
মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গড়িমসির কারণে আসিয়ান জোট নিপিদোর (মিয়ানমারের রাজধানী) নেতৃত্বকে বর্জন করেছিল। তবে আঞ্চলিক এই জোটটির সঙ্গে মিয়ানমারকে পুনরায় সম্পৃক্ত করার জোর প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ড সরকার প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।
থাইল্যান্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংককের অগ্রাধিকার হল সহিংসতা কমানো, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ানো এবং থাইল্যান্ডে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া রোধ করা।
‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’- এর এশিয়া বিষয়ক ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, মিয়ানমারের রাজধানী নিপিদো এখনও এসসিইএফ-কে আলোচনার প্রতিনিধি হিসেবে মেনে না নিলেও তারা এর পরিবর্তে প্রতিটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, "সব পক্ষই নীতিগতভাবে অন্য পক্ষের বক্তব্য শুনতে প্রস্তুত, তবে শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য এক ধরনের যৌথভাবে সম্মত ফলাফলে পৌঁছতে ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। বেশিরভাগ গোষ্ঠীর জন্য সেটি অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হচ্ছে।"