Published : 18 Jul 2025, 03:37 PM
তিন বছর আগে এক তথ্য ফাঁসের ঘটনায় তালেবানের প্রতিশোধের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়া হাজার হাজার আফগানের সঙ্গে শতাধিক ব্রিটিশ কর্মকর্তার পরিচয়ও প্রকাশ্যে চলে এসেছিল বলে জানা গেছে।
ফাঁস হওয়া ওই তালিকায় এমআইসিক্স ও বিশেষ বাহিনী এসএএসের অনেক কর্মকর্তাও ছিলেন বলে বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত থাকা এক নিষেধাজ্ঞার বদৌলতে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের নাম ফাঁস হওয়ার বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। সেদিন হাই কোর্টের এক বিচারক ওই নিষেধাজ্ঞার অংশবিশেষ তুলে নেন। এরপরই এ ঘটনা গণমাধ্যমে আসে।
আফগানিস্তানে ২০ বছরের যুদ্ধে ব্রিটিশদের সঙ্গে কাজ করা ও পরে যুক্তরাজ্যে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্য আবেদন করা প্রায় ১৯ হাজার আফগানের তথ্য যে অসাবধানতাবশত ফাঁস হয়ে গিয়েছিল, মঙ্গলবার ব্রিটিশ সরকার তা স্বীকার করে নিয়েছে।
প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এ আফগানদের মধ্যে অনেককেই তালেবানরা খুঁজছে। তথ্য ফাঁসের বিষয়টি গোপন রাখার এটিও একটি কারণ। এ পুরো খবর একটি ‘সুপার ইনজাঙ্কশন’ বা বড় আকারের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। এর অর্থ হচ্ছে, এই ঘটনা প্রকাশ নিষিদ্ধ করে যে আদেশ হয়েছে, তার খবরও প্রকাশ করা যাবে না।
তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি ঘটে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৩ সালের অগাস্ট পর্যন্ত তা জানতো না। ওই মাসে আফগানিস্তানের একজন ওই তথ্যের খানিকটা ফেইসবুকে প্রকাশ করে দেন এবং বাকিটুকুও প্রকাশ করে দেওয়ার ইঙ্গিত দেন। তখনই বিপদ টের পায় লন্ডন।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তখন ওই ব্যক্তির যুক্তরাজ্যে আসার আবেদন দ্রুত পর্যালোচনার আশ্বাস দেয় এবং তাকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসে বলে বুধবার জানতে পেরেছে বিবিসি। ব্রিটিশ সরকারের অনেক সূত্র এ পুরো ঘটনাপ্রবাহকে ‘কার্যত ব্ল্যাকমেইল’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ওই ব্যক্তির কার্যকলাপ নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছে, আফগান স্থানান্তর প্রকল্পের আওতায় যারা যুক্তরাজ্যে এসেছে, তাদের প্রত্যেকেই কঠোর নিরাপত্তা যাচাই বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
২০২৩ সালে ওই তথ্য ফাঁসের ঘটনা জানতে পারার পর বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ সরকারকে গোপনে আফগানিস্তান রেসপন্স রুট (এআরআর) নামে আফগানদের গোপনে যুক্তরাজ্যে স্থানান্তরের প্রকল্প শুরু করতে হয়। তবে যাদেরকে সরিয়ে আনা হয়েছে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে হুমকি থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে ওই তথ্য ফাঁসের কথা জানানো হয়নি।
ওই প্রকল্পের আওতায় আফগান ও তাদের পরিবারের সদস্য মিলিয়ে মোট সাড়ে চার হাজার জনকে যুক্তরাজ্যে সরিয়ে আনা হয়েছে, আরও প্রায় আড়াই হাজার জনকে সরানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সবমিলিয়ে প্রায় ৮৫ কোটি পাউন্ড খরচ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
তথ্য ফাঁসের জন্য দায়ী ছিলেন লন্ডনের ইউকে স্পেশাল ফোর্সেস সদর দফতরের এক কর্মী। মাত্র ১৫০ জনের তথ্য পাঠানোর কথা থাকলেও তিনি অসাবধানতাবশত ৩০ হাজারেরও বেশি আবেদনপত্র সরকারের বাইরের একজনকে পাঠিয়ে দেন।
মঙ্গলবার এ ঘটনার ওপর থাকা ‘সুপার ইনজাঙ্কশন’ তুলে নেওয়া হলেও বিশেষ বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাদের নাম ফাঁস হওয়ার বিষয়টি গোপন রাখতে আরেকটি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। ওই নিষেধাজ্ঞার অংশবিশেষ বৃহস্পতিবার তুলে নেওয়া হয়, যার সুবাধে গণমাধ্যমগুলো এ নিয়ে খবর প্রকাশের সুযোগ পায়।
ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এ ঘটনাকে ‘গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ছায়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস কার্টলিজও এ ঘটনায় আগের রক্ষণশীল সরকারের হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তথ্য ফাঁস হওয়ার সময় যুক্তরাজ্যে কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীলরা ক্ষমতায় ছিল।
এই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় কতজন আফগান ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, তা নিয়ে কিছু বলতে রাজি হয়নি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
তালেবান সরকার জানিয়েছে, তারা এই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার বা নজরদারিতে নেয়নি। তবে কিছু আফগান পরিবার বিবিসিকে জানিয়েছে, তালেবান তাদের আত্মীয়স্বজনদের খুঁজতে অভিযান জোরদার করেছে, যাদের নাম ফাঁস হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, “বিশেষ বাহিনী নিয়ে মন্তব্য না করা একের পর এক আসা সব সরকারের দীর্ঘদিনের নীতি।”
“আমাদের সদস্য, বিশেষ করে সংবেদনশীল দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখি এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবসময় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়,” বলেছেন তিনি।