Published : 19 Dec 2025, 07:08 PM
ভারতে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকরা বিপর্যস্ত। মাস কয়েক পরপরই বেঁচে থাকার জন্য এই শিশুদের রক্ত দিতে হয়। আর সেই রক্ত নিতে গিয়েই তাদের শরীরে এইচআইভি/এইডস ধরা পড়েছে, যা অসুস্থতার পাশাপাশি সামাজিক কলঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে এই শিশুদের।
থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। গুরুতর অ্যানিমিয়া সামাল দিতে এসব রোগীকে নিয়মিত রক্ত নিতে হয়।
বুধবার ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্য সরকার জানায়, সেখানকার পাঁচজন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
শিশুদের বয়স তিন থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। ঘটনাটি রক্তদান ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারি হাসপাতাল থেকে রক্ত নেওয়ার পর এই শিশুরা এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছে বলে অভিযোগে উঠেছে মধ্যপ্রদেশে। বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুরা সাতনা জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। সাতনা জেলার কালেক্টর সতীশ কুমার এস জানান, পাঁচ শিশুই বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত নিয়েছে এবং একাধিক দাতার রক্ত নিয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিক, উভয় স্থান থেকেই শিশুরা রক্ত নিয়েছে। বর্তমানে সব শিশুই চিকিৎসাধীন।
মাস চারেক আগে শেষ বার রক্ত নিয়েছিল তারা। সম্প্রতি রুটিন শারীরিক পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, তারা সবাই এইচআইভি পজিটিভ।
শিশুদের পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালের গাফিলতিতেই এই বিপদ ঘটেছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত দেওয়ার সময় পুরনো সূচ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখান থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে তাদের সন্তানদের শরীরে।
এবছর জানুয়ারি থেকে মে ২০২৫-মাসের মধ্যে নিয়মিত শারিরীক পরীক্ষার সময় এইডস সংক্রমণ শনাক্ত হলেও, স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
এর কয়েক সপ্তাহ আগেই পূর্বাঞ্চলীয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে একটি সরকারি হাসপাতালে রক্ত নেওয়ার পর আট বছরের কম বয়সী পাঁচজন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর শরীরে এইচআইভি ধরা পড়ে।
এইচআইভি বা এইডস ভাইরাস সাধারণত অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি, সংক্রমিত রক্ত সঞ্চালন অথবা মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণের মাধ্যমে ছড়ায়। এইচআইভি’র জন্য আজীবন চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ২৫ লাখের বেশি মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছে। প্রতিবছর নতুন সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় ৬৬ হাজার ৪০০। এর মধ্যে ১৬ লাখের বেশি মানুষ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) নিচ্ছেন।
তবে, একজনের ক্ষেত্রে তিন বছর বয়সী শিশুটির বাবা-মা দুজনই এইচআইভি পজিটিভ ছিলেন। তবে বাকি শিশুদের বাবা-মা নেগেটিভ হওয়ায় মা থেকে শিশুর সংক্রমণের সম্ভাবনা নাকচ করা হয়েছে।
সাতনার প্রধান চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মনোজ শুক্লা বলেন, একাধিকবার রক্ত নেওয়া শিশুরা উচ্চঝুঁকিতে থাকে এবং নিয়মিত এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়।
“শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে। বর্তমানে শিশুরা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে,” তিনি বলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি নিয়ম মেনে জেলা হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে সরবরাহ করা প্রতিটি রক্তের ইউনিট পরীক্ষার পরই দেওয়া হয়।
তবে বিরল ক্ষেত্রে এমন হতে পারে, যখন দাতা এইচআইভি সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় স্ক্রিনিংয়ে ধরা পড়ে না, পরে পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন, বলেন তিনি।
গত অক্টোবরে ঝাড়খণ্ডে একই ধরনের ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের এক ল্যাব সহকারী, এইচআইভি ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও প্রধান সার্জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে জানিয়েছে বিবিসি।
ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দুই লাখ রুপি করে সহায়তার ঘোষণাও দেন।
এর আগেও ২০১১ সালে গুজরাটে একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত রক্ত নেওয়ার পর ২৩ জন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর শরীরে এইচআইভি ধরা পড়ে। সে ঘটনায়ও তদন্ত শুরু হয়েছিল।
গত সপ্তাহে থ্যালাসেমিয়া রোগীরা ভারতের সংসদে জাতীয় রক্ত সংক্রমণ বিল ২০২৫ পাসের দাবি জানান। তাদের মতে, এই আইন রক্ত সংগ্রহ, পরীক্ষা ও সঞ্চালন ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করবে।
নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের অভাবে যারা এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন, এমন রোগীরাও বিলটিকে বহু প্রতীক্ষিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
ভারতের গ্রামাঞ্চল ও ছোট শহরগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে মধ্যপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো গভীর উদ্বেগে রয়েছে।
“আমার মেয়ে আগে থেকেই থ্যালাসেমিয়ায় ভুগছিল। এখন এইচআইভি হয়েছে, সবই মধ্যপ্রদেশের ভঙ্গুর চিকিৎসা ব্যবস্থার ফল,” বলেন একজন বাবা।
আরেকজন অভিভাবক জানান, তার সন্তান এইচআইভির ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বমি ও তীব্র ক্লান্তিতে ভুগছে।
ভারতে এইচআইভি এখনও সামাজিক কলঙ্কের সঙ্গে জড়িত। ঝাড়খণ্ডে সাত বছরের এক শিশুর পরিবারকে ভাড়াবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে বলে শিশুটির বাবা জানান।
“আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত গ্রামে ফিরে যেতে হয়েছে,” বলেন কৃষক বাবা।
তিনি বলেন, “গ্রামে আমার ছেলের ভালো চিকিৎসা পাওয়াই কঠিন, ভালো শিক্ষার সুযোগ তো দূরের কথা।”