Published : 23 Feb 2026, 11:07 AM
মেক্সিকোর ভয়ঙ্কর হালিস্কো নিউ জেনারেশন (সিজেএনজি) মাদক চক্রের নেতা নেমেসিও ওসেগেরা সের্বান্তেস সেনাবাহিনীর এক অভিযানের মধ্যে নিহত হয়েছেন।
বিবিসি লিখেছে, ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত মোস্ট ওয়ান্টেড সের্বান্তেসকে গ্রেপ্তার করতে রোববার হালিস্কো অঙ্গরাজ্যের তাপালপা শহরে অভিযানে গিয়েছিল সেনাবাহিনী।
তাকে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার সময় তার সমর্থক ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সে সময় গুরুতর আহত স্যাভাতেস পরে মারা যান বলে মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় খবর দেয়।
তাপালপা শহরে ওই অভিযানে সিজেএনজি’র চার সদস্য নিহত হয়েছেন। তিন সেনাসদস্যও আহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দেওযা তথ্যে মেক্সিকো এ অভিযান পরিচালনা করে।
বদলা হিসেবে সিজেএনজি আটটি অঙ্গরাজ্যে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়, সড়ক অবরোধ করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হালিস্কো, তামাউলিপাস, মিচোয়াকান, গুয়েরেরো ও নুয়েভো লেওনের কিছু এলাকায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করে তাদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম পার্দো তার দেশের জনগণকে ‘শান্ত’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এক এক্স পোস্টে তিনি বলেছেন, “দেশের বেশিরভাগ এলাকায় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে।”
বিবিসি লিখেছে, ৫৯ বছর বয়সি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এল মেনচো একটি বিশাল অপরাধী সংগঠন পরিচালনা করতেন, যা যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ কোকেন, মেথামফেটামিন ও ফেন্টানিল পাচার করে আসছিল।
এল মেনচোকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তথ্য দিলে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে এই অভিযানের ‘পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন’ করা হয়। মেক্সিকান বিমানবাহিনী ও ন্যাশনাল গার্ডের বিমানও অভিযানে অংশ নেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযানের সময় একাধিক সাঁজোয়া যান এবং রকেট লঞ্চারসহ বিভিন্ন অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা গুয়াদালাহারাসহ কয়েকটি শহরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওঠার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন। গুয়াদালাহারা আসন্ন ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের একটি আয়োজক শহর।
এদিকে অস্থিরতার মধ্যে হালিস্কো উপকূলের পর্যটনকেন্দ্র পুয়ের্তো ভাল্লার্তায় হাজারো পর্যটক রিসোর্টে আটকা পড়েছেন।
রোববার হালিস্কো এবং অন্যান্য এলাকায় সড়কে বন্দুকধারীদের উপস্থিতির খবর আসে।
হালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমুস নাভারো সোশাল মিডিয়ায় রাজ্যের বাসিন্দাদের ‘সর্বোচ্চ সতর্ক সংকেত’ মেনে ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। রাজ্যে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ও আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সঙ্গে এয়ার কানাডাও পুয়ের্তো ভাল্লার্তা ও গুয়াদালাহারাগামী ফ্লাইট বাতিল করেছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং সাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ার অনুযায়ী, আটলান্টা থেকে গুয়াদালাহারাগামী ডেল্টা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট অস্টিনে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মেক্সিকোর সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ সোশাল মিডিয়ায় এল মেনচোকে ‘সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও নিষ্ঠুর মাদক সম্রাটদের একজন’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের জন্য ‘বড় অগ্রগতি’।
যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের সাবেক প্রধান মাইক ভিজল এই অভিযানকে ‘মাদক পাচারের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিবিসি লিখেছে, এল মেনচোর নিহত হওয়া মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের মাদক চক্রবিরোধী লড়াইয়ে একটি বড় সাফল্য। এই ঘটনা তার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্কও জোরদার করতে পারে, যিনি মেক্সিকোর মাটিতে মাদক চক্রকে নিশানা করার হুমকি দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, মাদক পাচারকারী নৌযানকে নিশানা করার পর ‘এখন আমরা স্থলভাগেও আঘাত হানতে শুরু করব’।
তিনি বলেন, মাদক চক্রগুলো মেক্সিকো চালাচ্ছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম পরে বলেন, দক্ষিণ সীমান্তে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয় ‘আলোচনায় নেই’।

বিবিসি লিখেছে, নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে চক্রগুলোর সহিংস প্রতিক্রিয়ায় সরকারের সাফল্য ম্লান হতে পারে।
হালিস্কো মাদকচক্র নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ধারাবাহিক হামলার জন্য কুখ্যাত।
তারা রকেটচালিত গ্রেনেড দিয়ে একটি সেনা হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে, ডজনখানেক কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখাতে সেতুতে মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখার ঘটনাও ঘটিয়েছে।
সিজেএনজি: মেক্সিকোর শীর্ষ মাদক পাচারকারী
হালিস্কোতে ২০১০ সালে গড়ে ওঠা সিজেএনজি চক্রের পদচারণা এখন মেক্সিকোজুড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এ চক্রকে সিনালোয়া চক্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে, যাদের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ অঙ্গরাজ্যেই রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মাদক সরবরাহকারীদের প্রধান সিজেএনজি ফেন্টানিল উৎপাদন করে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে বেশিরভাগ ফেন্টানিলের প্রবেশ মেক্সিকো হয়ে
যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার পেট্রোলের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত ৯২০০ পাউন্ড (৪,১৮২ কেজি) ফেন্টানিল জব্দ করা হয়েছে।

মেক্সিকোর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমে যে সীমান্ত রয়েছে, সেখান থেকেই ৯৬ শতাংশ চালান ধরা হয়েছে।
১ শতাংশেরও কম জব্দ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের কানাডা সীমান্ত থেকে। বাকিগুলো জব্দ করা হয়েছে সমুদ্রপথ বা অন্যান্য চেকপয়েন্টে।