Published : 15 Aug 2026, 04:53 PM
কাবুলের বাসিন্দা ইলার কাছে জীবনের সংজ্ঞাটাই এখন বদলে গেছে। আগে যেখানে পড়াশোনা, চাকরি আর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার শত রকম স্বপ্ন ডানা মেলত, সেখানে এখন সূর্য ওঠার পর কেবল একটা চিন্তা, আজকের দিনটা পার হবে তো?
“দারিদ্র্য আর দৈনন্দিন সংকটে মানুষ এতটাই বিধ্বস্ত যে পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা তাদের একপাশে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। এখন শুধু বেঁচে থাকাটাই সবার অগ্রাধিকার,” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন ইলা।
বিবিসি লিখেছে, আফগানিস্তানে তালেবান দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পূণ হলো ২০২৬ এ। ২০২১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পর থেকে তালেবানের কট্টরপন্থি শাসন দেশটির প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ নারীর অধিকার ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করে এনেছে। চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণে কড়াকড়ি এবং বাল্যবিয়ে উৎসাহিত করার মতো একের পর এক নিয়ম।
বর্তমানে আফগানিস্তান বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ।
ডানা ভাঙা স্বপ্ন ও খবরের নীরব স্টুডিও
কাবুলের ১৮ বছর বয়সী সাকিবা গয়না তৈরির কাজ করেন। ২০২১ সালের ১৫ অগাস্ট যখন তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে, সেই দিনটির কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠেন তিনি। অনলাইন মাধ্যমে বহু কষ্টে মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করলেও বিমান চালক হওয়ার স্বপ্ন এখন শুধুই অতীত।
সাকিবা বলেন, “আকাশের দিকে তাকালেই মনে হতো একটা উড়োজাহাজ চালাচ্ছি, উপর থেকে দেখছি পৃথিবীকে। বাধা ছাড়া স্বাধীনভাবে উড়ার স্বপ্ন ছিল আমার। ১৫ অগাস্ট এলে মনে হয় পুরোনো কোনো ক্ষত আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে।”
অন্যদের মতো স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন সাবেক সংবাদ পাঠিকা জুহালও। বামিয়ান প্রদেশের এই ৩২ বছর বয়সী নারী সরকারের আদেশের পর চাকরি হারান। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “স্টুডিওতে বসে খবর পড়ার দিনগুলো আমার সত্তা আর গর্বের জায়গা ছিল। এখন সকালে ঘুম থেকে উঠি এই চরম বাস্তবতা নিয়ে যে, সারা দিন আমাকে ঘরের চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থেকে কাটাতে হবে।”
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানে মাত্র ৭ শতাংশ নারী কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারছেন।
তবে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমীর খান মুত্তাকী এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বিবিসিকে বলেন, “নারীদের জন্য সবকিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এমন কথা ঠিক নয়। বর্তমানে ৩০ লাখের বেশি মেয়ে স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। কড়াকড়ি কেবল সাময়িক।”
প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও আজীবন ট্রমা
তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রকাশ্যে কায়িক নির্যাতনের শাস্তির বিধান জোরদার করা হয়েছে। ২০২১ সালের পর থেকে শত শত মানুষকে প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করার তথ্য রয়েছে।
শাইমা নামের এক আফগান নারী শোনান সেই নির্মম অভিজ্ঞতা। পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলা ও তথাকথিত 'ধর্মত্যাগের' ভুয়া অভিযোগে প্রায় ২০০ জন পুরুষের সামনে তাকে ৫০টি চাবুকের আঘাত দেওয়া হয়।
শাইমা বলেন, “তারা একটা কাগজ সামনে এনে আমাকে জোর করে স্বীকার করাল: ‘হ্যাঁ, আমি এক ধর্মত্যাগী নারী। কাফেরদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি আর কথা বলেছি পরপুরুষের সঙ্গে।’ এরপর তারা আমাকে চাবুক দিয়ে এতটাই জোরে আঘাত করছিল যে আমার মাথা মাটিতে গিয়ে ঠেকছিল। সেখানে পুরুষ, কিশোর ও শিশু মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন স্থানীয় মানুষ জড়ো হয়েছিল, যাদের সবাই ছিল পুরুষ। আর তাদের সামনে উচ্চশব্দে আমাকে বলতে বাধ্য করা হয়েছিল যে আমি তওবা করেছি।”
শাইমা জানান, সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য তার পরিবারকে ছারখার করে দিয়েছে। তার বড় মেয়ে এখনো মাঝরাতে ভয়ে চিৎকার করে জেগে ওঠে আর জিজ্ঞেস করে, “মা, ওরা কি তোমাকে এখনো মারছে?”
আরেক নারী মানিজাকে কেবল একজন পুরুষবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের অপরাধে ৩৯ বার চাবুক মারা হয় এবং জেলে পাঠানো হয়।
মানিজা বলেন, “আমরা বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তালেবানের গোয়েন্দারা কীভাবে এ খবর পেল, নাকি অন্য কেউ আমাদের ধরিয়ে দিয়েছিল, তা আজও আমি জানি না।”
তিনি বলেন, কারাগারে এমন সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা নিজের মায়ের কাছেও কখনো বলতে পারিনি। বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছেই আমার আর ছিল না। ভাবতাম, জেল থেকে বের হতে পারলেই প্রথম কাজ হবে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া। পরিবার আর বন্ধুদের সামনে আমি অপমানের এক পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, বিয়ে করার চিন্তা তো তখন মাথা থেকেই বাদ হয়ে গিয়েছিল।”
স্বাস্থ্যসংকট ও টিকে থাকার আশা
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বন্ধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে দেশটির স্বাস্থ্যসেবা খাতে। আফগানিস্তানে প্রতি ৪ হাজার ৫০ জন নারীর বিপরীতে মাতৃত্বকালীন সেবা দেওয়ার জন্য মাত্র একজন ধাত্রী রয়েছেন।
পুরুষ চিকিৎসকের কাছে নারী রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ থাকায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অনেকে।
ধাত্রী মারজিয়া এক করুণ ঘটনার কথা স্মরণ করেন, যেখানে গ্রাম থেকে আসা ৪৫ বছর বয়সী ৬ সন্তানের এক জননী তাদের চোখের সামনে মারা যান। নবজাতককে বাঁচানো গেলেও মাতৃহীন শিশুগুলোর ভবিষ্যৎ ভেবে রাতে ঘুমাতে পারেন না মারজিয়া।
অন্যদিকে সন্তানসম্ভবা মরিয়মের মনে তাড়া করে অন্য এক ভয়, “আজকে যারা স্কুলে যেতে পারছে না, তারা তো ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে পারবে না। আমার গর্ভের মেয়েটা যখন বড় হয়ে সন্তান জন্ম দেবে, তখন যদি কোনো নারী চিকিৎসকই না থাকে?”
‘কথা বলুন আমাদের হয়ে’
চরম অন্ধকার আর বন্দিদশার মধ্যেও আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছেন কিছু অদম্য নারী। বিবিসি যাদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের কেউ কেউ এখনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন চোখে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
২৪ বছর বয়সী নূরী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পড়ালেখা শেষ করতে না পারলেও দমে যাননি। এক জ্যাম তৈরির কারখানায় কাজ শুরু করে এখন নিজের উদ্যোগে একটি প্রতিষ্ঠান দিয়েছেন, যেখানে তার অধীনে ১০ জন নারী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন
নূরী বলেন, “আমি আশা হারাইনি। কাজ শুরু করার এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। এখন নিজের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি, যেন অন্য নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারি। আমি চাই তারা স্বাবলম্বী, দৃঢ় ও সফল হয়ে উঠুক।”
১৩ বছর বয়সী আসমার স্বপ্ন বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়া। বিবিসিকে আসমা বলে, “একদিন নিশ্চিত সবকিছু বদলে যাবে, তবে আমাদের ধৈর্য ধরে পথ চলতে হবে, আমরা আশা হারাব না।”
ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করা ইলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আকুল আবেদন জানান, যেন তারা আফগান নারী ও কন্যাশিশুদের ভুলে না যায়।
তিনি বলেন, “আফগান নারীদের কথা বলুন, তাদের শিক্ষা ও কাজের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ান। তাদের এই বাস্তবতার ওপর বিশ্ববাসীর নজর ধরে রাখুন। আমাদের এখন প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সংহতি, নীরবতা নয়।”