Published : 24 Aug 2025, 01:18 AM
গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে- অথচ ভূখণ্ডটির সীমান্তের বাইরে ত্রাণ নিয়ে অলসভাবে দাঁড়িয়ে আছে শত শত ট্রাক। প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হল?
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্ষুধা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা জাতিসংঘ সমর্থিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ (আইপিসি)- এর মূল্যায়নে গাজার পাঁচ লাখ মানুষ, অর্থাৎ, সেখানকার এক-চতুর্থাংশ ফিলিস্তিনি দুর্ভিক্ষে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
এই মূল্যায়ন অনেক কারণেই হতবাক করার মতো। এর মধ্যে প্রধান হল: প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে যে, দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ‘পুরোপুরি মানবসৃষ্ট’, যেখানে সাহায্য সংস্থাগুলো আজ ইসরায়েলকে গাজায় খাবার প্রবেশে ধারাবাহিকভাবে বাধা’ দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছে।
আইপিসি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা দেখতে পেয়েছে যে, গাজা সিটির বাসিন্দারা ‘ক্ষুধা, চরম দারিদ্র্য এবং মৃত্যুর’ মুখে পড়ছে। আরও দেখা গেছে, অনাহারে থাকা মানুষের সংখ্যা দ্রুতই বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে,তাতে সেপ্টেম্বরে গাজার বাদবাকি অংশের বেশিরভাগই দুর্ভিক্ষ কবলিত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
তিনটি মূল সূচকের ভিত্তিতে আইপিসি তাদের প্রতিবেদনে উপসংহার টেনেছে:
অনাহার: প্রতি পাঁচ পরিবারের অন্তত একটি চরম খাদ্য ঘাটতিতে।
অপুষ্টি: মোটামুটিভাবে প্রতি তিনজন বা তার বেশি শিশুর মধ্যে একজন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।
মৃত্যুহার: প্রতিদিন প্রতি ১০ হাজারে অন্তত দুজন মারা যাচ্ছে স্পষ্টতই অনাহার বা অপুষ্টি এবং রোগের কারণে।
এই তিনটির মধ্যে দুটি সূচক মিলে গেলে তখনই আইপিসি দুর্ভিক্ষ চলছে বলে স্বীকৃতি দেয়। আইপিসি বলছে, গাজায় তাদের মূল্যায়নে তিনটি সূচকই পূরণ হয়েছে।
যদিও আইপিসি এও বলেছে যে, গাজায় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিদ্যমান তথ্য-উপাত্তে নেই। অপ্রত্যাশিত বেশিরভাগ মৃত্যু রেকর্ড হচ্ছে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তারপরও বিদ্যমান প্রমাণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে আইপিসি তাদের প্রতিবেদনে উপসংহার টেনেছে যে, মৃত্যুর সূচকও দুর্ভিক্ষের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গাজার হামাস-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অপুষ্টিতে নতুন দুইজনের মৃত্যু রেকর্ড করার পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে- এ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২৭৩ জনে দাঁড়িয়েছে। যার মধ্যে ১১২ জনই শিশু।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার দুর্ভিক্ষের কথা অস্বীকার করে বলেছেন, “গাজায় কেউ অনাহারে নেই।”
তার মতে, কোথাও যদি খাদ্যের ঘাটতি থাকে, তার দায় ত্রাণ সংস্থা ও হামাসের। ইসরায়েল আরও বলছে, সীমান্তে শত শত ট্রাক অপেক্ষা করলেও জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থা সেগুলো সংগ্রহ করছে না।
‘পুরোপুরি মানবসৃষ্ট’
কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্বজুড়ে পেট ফুলে থাকা কিংবা হাড় বেরিয়ে থাকা ক্ষুধার্ত শিশুদের ছবি দেখার পর অনেকেই হয়ত মনে করে থাকবেন যে, গাজায় দুর্ভিক্ষ আসন্ন বলা হলেও এর লক্ষণগুলো এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
প্রায় দুই বছরের যুদ্ধের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের খাদ্যপ্রাপ্তির পথ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল অনেক আগে থেকেই গাজায় পণ্যপ্রবেশে কড়াকড়ি চালু রেখেছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলাকে কেন্দ্র করে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই কড়াকড়ি আরও বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের মার্চে প্রায় তিন মাসের জন্য সম্পূর্ণ অবরোধ জারি হলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে।
পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েল মে মাসের শেষ দিকে সীমিত আকারে কিছু পণ্য ঢুকতে দিতে শুরু করে।
একই সঙ্গে জাতিসংঘ নেতৃত্বাধীন খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ (জিএইচএফ) নামের একটি বিতর্কিত মার্কিন গোষ্ঠীর নতুন খাদ্য বিরণ ব্যবস্থা চালু করে ইসরায়েল।
এই নতুন পদ্ধতিতে জাতিসংঘ খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার আওতায় থাকা ৪০০ টি বিতরণকেন্দ্রের পরিবর্তে মাত্র চারটি কেন্দ্র চালু হয়, যার অবস্থান ছিল সামরিক এলাকাগুলোতে। ফলে খাদ্য সংগ্রহ করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টা তখন মৃত্যুশঙ্কুল হয়ে দাঁড়ায়। তারা সাংবাদিকদের নিয়মিত বলে এসেছে যে, তাদের অনাহার এবং মৃত্যুর মধ্যে যে কোনও একটি বেছে নিতে হয়। কারণ, জিএইচএফ খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে ত্রাণ নিতে যাওয়া ফিলিস্তিনের ওপর প্রায় প্রতিদিনই গুলি চলেছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত মে মাস থেকে জিএইচএফ ত্রানকেন্দ্র ও এর আশেপাশে খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ৯৯৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে; তখন থেকে এখন অব্দি মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৭৬০।
জাতিসংঘ বলছে,অধিকাংশকেই গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনারা। প্রত্যক্ষদর্শী ও গাজার চিকিৎসকেরাও একথা সমর্থন করেছেন। ইসরায়েল বারবার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ইসরায়েলের তত্ত্বাবধানে এই খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় গাজায় দুর্ভিক্ষ বেড়েছে।
ইসরায়েলের ওপর আরও বেশি ত্রাণ ঢুকতে দেওয়ার জন্য চাপ বাড়তে থাকায় জুলাইয়ের শেষ দিকে তারা প্রতিদিন আরও বেশি ট্রাক ত্রাণ গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়। বেশি পরিমাণে ত্রাণ বহর চলাচলের অনুমতি দেওয়ার জন্য যুদ্ধে ‘কৌশলগত বিরতি’ ও দেয় ইসরায়েল।
এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় আরও সাহায্য গেছে এবং বাজারে কিছু পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম কিছুটা কমেছে- যদিও অনেক ফিলিস্তিনিদের জন্য তা অনেক ব্যয়বহুল রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ১ কেজি আটার দাম ৮৫ ডলারের বেশি হয়ে যায়, যদিও তা কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
জাতিসংঘ এবং সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েল গাজায় খাদ্য পৌঁছতে দেওয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেও, তারা এখনও খাবার বিতরণে যথেষ্ট বাধা সৃষ্টি করছে।
জাতিসংঘ বলছে, গাজায় মানুষের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশ করা দরকার। বাস্তবে এখন এর অর্ধেকের বেশি ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ইসরায়েল আকাশপথে ত্রাণ ফেলতে অনুমতি দিলেও মানবিক ত্রাণ সংস্থাগুলো একে “অকার্যকর, বিপজ্জনক ও বিভ্রান্তিকর” বলে সমালোচনা করেছে।
ক্ষুধা সংকটের জন্য হামাসকে দায়ী করার ইসরায়েলের অভিযোগেরও সমালোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি অভ্যন্তরীন প্রতিবেদনসহ একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হামাসের ধারাবাহিকভাবে ত্রাণ চুরির কোনও প্রমাণ নেই।
গাজায় প্রবেশ করা ট্রাকগুলোতে ব্যাপক লুটপাট হচ্ছে। তবে সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে, বেশিরভাগ লুটপাটই করছে মরিয়া ফিলিস্তিনিরা এবং মুনাফা লাভের চেষ্টায় থাকা কিছু সংগঠিত গোষ্ঠী।
সাহায্য সংস্থাগুলো কয়েক মাস ধরে বলে আসছে যে, অনাহার এবং দুর্ভিক্ষ এড়াতে গাজায় সড়কপথে ত্রাণ সরবরাহের বন্যা বইয়ে দিতে হবে। কিন্তু ইসরায়েল এখনও বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া:
ইসরায়েল সরকারের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আইপিসি-র প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইপিসি’র বিরুদ্ধে ‘হামাসের ভুয়া প্রচারণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অতিরঞ্জিত প্রতিবেদন’ প্রকাশ করার অভিযোগ করেছে।
আইপিসি তাদের দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত নিজস্ব বৈশ্বিক মানদণ্ড পরিবর্তন করেছে বলেও ইসরায়েল সমালোচনা করেছে।
তবে আইপিসি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে, তারা দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহার হয়ে আসা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এই মানদণ্ড আগেও একই ধরণের পরিস্থিতিতে কাজে লাগানো হয়েছে।
আইপিসি-র প্রতিবেদনকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা “বানোয়াট” বললেও জাতিসংঘ সংস্থা ও আন্তর্জাতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া এসেছে কঠোর ভাষায়।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইনে কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে- এর মধ্যে আছে: জনগণের জন্য খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ নিশ্চিত করা।
“আমরা এই পরিস্থিতিকে দায়মুক্তি দিয়ে চলতে দিতে পারি না”, মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রম প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, দুর্ভিক্ষ সরাসরি ইসরায়েলের পরিকল্পিত বাধারই ফল। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, “ইসরায়েল পর্যাপ্ত ত্রাণ প্রবেশে অস্বীকৃতি জানিয়ে মানবসৃষ্ট এই বিপর্যয় ঘটিয়েছে।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক আরও একধাপ এগিয়ে বলেন—“ক্ষুধাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার যুদ্ধাপরাধ। আর এতে মৃত্যু হলে তা ইচ্ছাকৃত হত্যার সামিল।”
গাজা সিটি অভিযান:
ইসরায়েল এ সপ্তাহে গাজা সিটিতে বিতর্কিত আগ্রাসন এবং দখল অভিযান পরিচালনার জন্য কয়েক হাজার রিজার্ভ সেনা ডেকে পাঠিয়েছে, যেখানে আইপিসি এরই মধ্যে দুর্ভিক্ষ চলছে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাসকে পরাজিত করা, যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং জিম্মিদের ফেরাতে গাজা দখলই সর্বোত্তম পথ।
এই আগ্রাসনে গাজা সিটি ও এর আশেপাশের এলাকায় বাস করা প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন। ইসরায়েল এরই মধ্যে চিকিৎসা ও সাহায্য সংস্থাগুলোকে এলাকাটি খালি করার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছে।
কিন্তু ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি সংস্থার এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের এই পরিকল্পিত অভিযান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বলা হয়েছে, “যেখানে এরই মধ্যে দুর্ভিক্ষ চলছে, সেখানে এই অভিযান বেসামরিক নাগরিকদের জন্য আরও বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনবে।”
অনেক মানুষ, বিশেষ করে অসুস্থ, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং প্রতিবন্ধীরা হয়ত এলাকা ছেড়ে সরে যেতে পারবে না।”