Published : 07 Jan 2026, 12:44 PM
রাশিয়া পরে কখনো আক্রমণ চালালে ইউক্রেইনের নিরাপত্তায় এগিয়ে আসার যে অঙ্গীকার কিইভের ইউরোপীয় মিত্ররা করে আসছে তাতে প্রথমবারের মতো সমর্থন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় ইউক্রেইনের পাশে দাঁড়াতে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে মঙ্গলবার কিইভ মিত্রদের বিস্তৃত জোটের নেতারা আশ্বস্ত করেছেন।
প্যারিসে ‘কোয়ালিশন অব উইলিংয়ের’ সম্মেলনে এ আশ্বাস এসেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
২০১৪ ও ২০২২ সালে দুইবার আক্রমণ চালানো রাশিয়ার সঙ্গে যে কোনো যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে ইউক্রেইনের জন্য সুদৃঢ় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিশ্চিতে মূলত ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতৃত্বে এ জোটই ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
জোটের আগের বৈঠকগুলোতে দেখা না যাওয়া মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পজামাতা জ্যারেড কুশনার এবার প্যারিস সম্মেলনে উপস্থিত হন। তাদের সঙ্গে ছিলেন ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ, যিনি আগের দিন ইউরোপের সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার খুঁটিনাটি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন।
রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দেওয়া উইটকফ সম্মেলন শেষে বলেছেন, ‘নিরাপত্তা প্রটোকলগুলোর’ ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে।
“এই নিরাপত্তা প্রটোকলগুলো করা হয়েছে ইউক্রেইনে যে কোনো হামলা রোধ করতে, আর হামলা হলে সুরক্ষা দিতে। এগুলো উভয় কাজই করবে এবং এগুলো এত শক্তিশালী যে আগে কেউ এর সমতুল্য কিছু দেখেনি,” ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটিশ ও ইউক্রেইনের নেতাদের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই বলেছেন মার্কিন এ দূত।
কুশনার বলেছেন, “যদি ইউক্রেইন শেষমেষ কোনো চুক্তি করে, তাহলে তাদের জানা থাকতে হবে যে চুক্তির পর তারা নিরাপদ থাকবে, তাদের সুদৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকছে, এবং তাদের এমন বাস্তবপন্থি ব্যাকআপ থাকবে যা নিশ্চিত করবে যে এই (যুদ্ধ) পরিস্থিতি আর কখনও ঘটবে না।”
জোটের নেতাদের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যে প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে কিইভ মিত্ররাও অংশগ্রহণ করবে। এই পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ড্রোন, সেন্সর ও স্যাটেলাইট থাকলেও কোনো মার্কিন সেনার উপস্থিতি থাকবে না।
বৈঠকের পর ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি টেলিগ্রামে লিখেছেন, “সত্যিকারের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতে ইউরোপ ও পুরো কোয়ালিশন অব উইলিং যে কতটা প্রস্তুত, এ সমঝোতাতেই সে সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে।”
তবে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের কাজ কীভাবে চলবে এবং কী করে ইউক্রেইনের সেনাবাহিনীকে সমর্থন ও অর্থায়ন করা হবে তার খুঁটিনাটি ঠিক করা এখনো বাকি, জানিয়েছেন তিনি।
রয়টার্স লিখেছে, এবারের প্যারিস সম্মেলনের বিবৃতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সুস্পষ্ট অনুমোদন দেখা যায়নি, যুদ্ধবিরতি পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা আরও তীব্র হয়েছে। আগের খসড়ায় ইউক্রেইনে বহুজাতিক বাহিনীকে সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর কথা বলা হলেও, এবার সেসব কথা বাদ পড়েছে।
তবে বৈঠকে মার্কিন বিশেষ দূতদের উপস্থিতি এবং তাদের শক্তিশালী বার্তাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ইউরোপের কর্মকর্তারা। ইউক্রেইনের জন্য নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে যে পাশে পাওয়া যাবে, উইটকফ ও কুশনারের উপস্থিতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
প্রায় চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা গত বছরের নভেম্বর থেকে গতি পেয়েছে। যুদ্ধের ইতি টানতে যুক্তরাষ্ট্র সেসময় যেসব প্রস্তাব হাজির করেছিল, তাতে রাশিয়ার মূল দাবিগুলো পূরণ হওয়ায় মস্কো ব্যাপক সমর্থন দিলেও কিইভ ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা এর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
এরপর কিইভের চাপে খসড়া প্রস্তাবের অনেক জায়গায় টুকটাক পরিবর্তন এসেছে বলে জানা গেলেও মস্কো যে এসব ব্যাপারে ছাড় দেবে এখন পর্যন্ত তার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
ইউক্রেইন ও ইউরোপের চাওয়া অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসহ যুদ্ধবিরতিতে রাশিয়া স্বাক্ষর করবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। রাশিয়া এর আগে ইউক্রেইনের অভ্যন্তরে নেটো সদস্যভুক্ত যে কোনো দেশের সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়েছিল।
এতদিন পর্যন্ত ইউক্রেইনের বেশিরভাগ মিত্ররই আশ্বাস ছিল কিইভ বাহিনীকে সামরিক সহায়তা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী হলে তাতে যতখানি সম্ভব অংশ নেওয়া।
কিন্তু এখন সবার মনোযোগ সরে এসেছে মস্কোর পরবর্তী যে কোনো হামলায় কিইভের সমর্থনে আইনগত বাধ্যবাধকতামূলক নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রসঙ্গে। তবে তেমন ক্ষেত্রে পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে রাজি নয় অনেক ইউরোপীয় দেশ, বলছেন কূটনীতিকরা।
“এসব অঙ্গীকারের মধ্যে থাকতে পারে সামরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানো, গোয়েন্দা তথ্য ও লজিস্টিকাল সহায়তা, কূটনৈতিক উদ্যোগ, আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা,” বলা হয়েছে নেতাদের বিবৃতিতে।
তারা এখন আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অঙ্গীকারগুলো চূড়ান্ত করতে কাজ করছেন, বলেছেন নেতারা।
বিবৃতিতে ইউরোপের দেশগুলোর নেতৃত্বে ইউক্রেইনের জন্য একটি ‘বহুজাতিক বাহিনীর’ও অঙ্গীকার করা হয়েছে, যে বাহিনী ইউক্রেইনের সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠন ও আক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সহায়ক হবে, এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত সহায়তাও থাকবে।
যুদ্ধবিরতি হলে ইউক্রেইনে একটি বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনে আগ্রহ প্রকাশ করে ফ্রান্স ও ব্রিটেন এরই মধ্যে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরও করেছে।
এমন কিছু হলে ফ্রান্স ইউক্রেইনে কয়েক হাজার সেনা পাঠাতে পারে বলেও জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ।
“এটি (ঘোষণাপত্র) সেই আইনি কাঠামোর পথ সুগম করল যার আওতায় ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ ও বিভিন্ন অংশীদার বাহিনী ইউক্রেইনের মাটিতে কাজ চালাতে পারবে, ইউক্রেইনের আকাশ ও সমুদ্রের সুরক্ষা দিতে পারবে এবং ভবিষ্যতের জন্য ইউক্রেইনের সশস্ত্র বাহিনীকে পুনর্গঠন করতে পারবে,” বলেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।