Published : 25 Mar 2026, 07:41 PM
মধ্যপ্রাচ্যের দুই চিরশত্রু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এরই মধ্যে পৌঁছেও গেছে। এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, সোমবার তারা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরসহ কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে মঙ্গলবার রাতে ইরানও ইসরায়েলের উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
উত্তর তেল আবিবের একটি আবাসিক এলাকায় একটি ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হানলে ছয়জন আহত হন এবং বেশ কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ট্রাম্পের কৌশল ও ইসরায়েলের শঙ্কা:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কেন তেহরানের সঙ্গে আলোচনার পথ খুঁজছেন, তা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে।
অনেকে মনে করছেন এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির একটি কৌশল মাত্র, কারণ বর্তমানে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে।
তবে ইসরায়েলে কারও কারও ধারণা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই যুদ্ধ থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছেন, যা ইসরায়েলের লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসরায়েলের এক সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাইকেল মিলস্টাইন বিবিসি-কে বলেন, “নেতানিয়াহু চুক্তি চান না। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর অবস্থানের মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।”
“নেতানিয়াহু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের অস্তিত্বের হুমকি চিরতরে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এমনকি এর মধ্য দিয় ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পটও প্রস্তুত হতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি এবং নেতানিয়াহুর প্রতিশ্রুতির মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে।”
নেতানিয়াহুর উভয়সংকট:
ট্রাম্প যদি গুরুত্ব সহকারে যুদ্ধ থেকে সরে যওয়ার পথ খুঁজে থাকেন, তাহলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী একটি অসম্ভব পরিস্থিতিতে পড়বেন। বিশ্লেষকদের মতে, সেটি হবে নেতানিয়াহুর জন্য ‘ক্যাচ-২২’ বা উভয়সংকট।
কারণ, যদি আলোচনা শুরু হয়, তবে নেতানিয়াহু যুদ্ধ এগিয়ে নিতে পারবেন না। আবার যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাহ্য করে একা যুদ্ধ চালানোও তার পক্ষে সম্ভব হবে না। ফলে তাকে আলোচনা মেনে নিতে হবে।
নেতানিয়াহুকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলে চলতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের আসন্ন হুমকি দূর করা এবং ওই অঞ্চলে ইরানের ছায়াগোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক নির্মূলের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন তার প্রেক্ষাপটে।
ইসরায়েলের জনগণ যুদ্ধের অবসান দাবি করছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা ইরান যুদ্ধে পুরোপুরি জয় দাবি করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে আলোচনায় কোনওরকম চুক্তির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের জনগণ এবং রাজনীতিবিদ দুপক্ষকেই সন্তষ্ট রাখা নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন।
ইসরায়েলের পার্লামেন্টের লিকুদ সদস্য ড্যান ইলুজ মনে করেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করার সঠিক পথ হল শাসকগোষ্ঠীকে পরাজিত করা, যাতে ইরানের হুমকি ইসরায়েলকে আবার তাড়া না করে।
তিনি বলেন, “আমরা অতীতে হামাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি চেষ্টা করেছি, যা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামলার মধ্য দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আমরা ইরানের ক্ষেত্রে একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি চাই না।”
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার পর নেতানিয়াহু জানান, তিনি ইরান এবং লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থগুলো তিনি যে কোনও পরিস্থিতিতেই রক্ষা করবেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ মঙ্গলবার জানিয়েছেন, লেবাননের লিটানি নদীর দক্ষিণে একটি বিশাল এলাকায় ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ে তুলবে ইসরায়েলি বাহিনী।
হিজবুল্লাহর হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত বাসিন্দাদের সেখানে ফিরতে দেওয়া হবে না। ইরানের সঙ্গে কোনও চুক্তি হলেও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েল অভিযান অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞের অভিমত:
তেল আবিবে ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ইন্সটিটিউটের ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিত্রিনোভিজ মনে করেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, অবস্থান ও প্রত্যাশার পার্থক্য এতটাই বেশি যে কোনও চুক্তি হওয়া কঠিন।
ইরানের দিক থেকে তারা মনে করছে তারা জিতছে। হারছে না। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল সরবরাহপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তেহরান আলোচনায় নমনীয় হওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না।
ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা ৫ দিন পেছানোর ঘোষণা দেওয়ায় ইরানের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। সুতরাং তারা আলোচনায় ক্ষতিপূরণ এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দাবি করবে।
বিশেষজ্ঞ ড্যানি বলেন, এমন অবস্থায় ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে গেলে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুকে হয় দেশটির শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে, নয়ত তারা ইরানের কাছে যেসব দাবি জানিয়োছিল সেগুলো বাদ দিতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার দ্বার খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন কিছু হারানোর নেই- তা এর উদ্দেশ্য তেলের বাজার স্থিতিশীল করা, ইরানি নেতৃবৃন্দের মধ্যে ভিবক্তির বীজ বপন করা কিংবা নতুন করে সামরিক হামলার চালানোর জন্য সময়ক্ষেপণ- যাই হোক না কেন।
এক পর্যবেক্ষক বলেছেন, ট্রাম্প যদি শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা শুরু করেন সেটাও বিস্ময়কর কিছু হবে না।
বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যেখানে কোনও পক্ষই এখনও তাদের শত্রুর দাবি মেনে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েনি, তাই এই যুদ্ধ এখন আত্মসমর্পণ এবং তীব্রতা আরও বৃদ্ধির মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে।