Published : 18 Aug 2026, 10:35 PM
হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ আঞ্চলিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় বারবার ঝুঁকির মুখে পড়ার এই সময়ে যখন বিকল্প বাণিজ্যপথের সন্ধান চলছে, ঠিক তখনই আর্কটিকের উত্তর সাগরপথ বা ‘নর্দার্ন সি রুট’ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
চীন এরই মধ্যে এ পথ ব্যবহারের বড় উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্যিক কনটেইনার পরিবহন শুরু করেছে তারা। নর্দার্ন সি রুট (এনএসআর) আর্কটিক মহাসাগরের এমন এক সামুদ্রিক পথ, যা আর্কটিকের মধ্য দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরকে সংযুক্ত করে।
সেকারণে এই জলপথটি বিশেষ করে ভারত, রাশিয়া এবং চীনের আগ্রহের কারণ হয়ে উঠেছে। এই পথ সুয়েজ খালের তুলনায় এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে দূরত্ব ১০ থেকে ১৪ দিন কমিয়ে দিতে পারে।
একসময় পুরোপুরি বরফে ঢাকা থাকলেও বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে ধীরে ধীরে গলছে সুমেরু সাগরের বরফ। এর ফলে বছরজুড়ে জাহাজ চলাচলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে ‘নর্দার্ন সি রুট’-এ।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’- এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের 'সি লেজেন্ড' নামের একটি কন্টেইনার শিপিং কোম্পানি রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে যাওয়া ৫,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেরু পথে সম্প্রতি নিয়মিত বাণিজ্যিক কনটেইনার পরিবহন শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে ‘সি লেজেন্ড’ কোম্পানিটি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন জলপথের নাম ‘আইস সিল্ক রোড’ বলে ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপের সঙ্গে চীনের ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথ সিল্ক রোডের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকালে সুমেরু মহাসাগরের বরফ গলে জলপথটি আগের চেয়ে বেশি সময় সচল থাকছে। ফলে চীনের নিংবো-ঝুশান বন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দরে পৌঁছাতে সুয়েজ খাল দিয়ে যেখানে ৪০ দিনের বেশি সময় লাগত, সেখানে এই নতুন রুটে সময় লাগছে মাত্র ১৮ দিন।
ইলেকট্রিক যানবাহন (ইভি), লিথিয়াম ব্যাটারি ও সৌর পণ্যের মতো তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনে পথটি অত্যন্ত আদর্শ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চীন ছাড়াও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত এই পথ ব্যবহারে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে।
২০১৭ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম রাশিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ‘মেরু রেশম পথ’ (পোলার সিল্ক রোড) গড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইউক্রেইন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মস্কো এখন আর্কটিক অঞ্চলে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
ফলে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা 'রোসাটম' বেইজিংকে এই রুটে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিচালিত বরফভাঙা জাহাজ সরবরাহ করে পথ সুগম করে দিচ্ছে।
সি লেজেন্ড-এর চিফ অপারেটিং অফিসার লি শাওবিন এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মনে করেন, সুয়েজ খাল ও হরমুজ প্রণালির নাজুক পরিস্থিতি বিকল্প নতুন পথটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে এ পথে যাত্রার সময় কমলেও পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে আর্কটিকের ‘বরফ রেশম পথ’ বা ‘আইস সিল্ক রোড’ আদৌ সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
২০২৪ সাল থেকে আর্কটিক অঞ্চলে ভারি জ্বালানি তেল (এইচএফও) পরিবহন নিষিদ্ধ হলেও অনেক শিপিং কোম্পানি তা মানছে না। পরিবেশবাদী সংস্থা ‘বেলোনা’-র তথ্য অনুযায়ী, বরফাবৃত শীতল পানিতে ভারি তেল ছড়ালে তা পরিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব।
এশিয়া অঞ্চলে অ্যালিয়াঞ্জ কমার্শিয়ালের সামুদ্রিক ঝুঁকি বিষয়ক প্রধান পরামর্শদাতা ক্যাপ্টেন নিতিন চোপড়া জানান, অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।
তাছাড়া, জাহাজের কালো ধোঁয়া (ব্ল্যাক কার্বন) সূর্যের তাপ শোষণ করে বরফ গলার গতি বাড়াবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে এই সুমেরু রুটে চলাচলকারী বেশিরভাগ জাহাজই রাশিয়ার ‘ছায়া বহর’ (শ্যাডো ফ্লিট)-এর অন্তর্ভুক্ত।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বীমা বা তদারকি ছাড়াই এসব ট্যাংকার তেল পরিবহন করছে। ২০২৫ সালে এই পথে চলাচলকারী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (১০০টি) জাহাজই ছিল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত।
আরএমআইটি ইউনিভার্সিটির লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এর অধ্যাপক ভিন থাই মনে করেন, মারাত্মক পরিবেশগত ঝুঁকি, উচ্চ পরিচালনা ব্যয়, স্বল্পস্থায়ী মৌসুম এবং নিষেধাজ্ঞার জটিলতার কারণে এই পথটি এখনই সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে না।