Published : 15 Dec 2025, 02:34 PM
হংকংয়ের উচ্চ আদালত সংবাদপত্রের মালিক, ধনকুবের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনকারী জিমি লাইকে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা গোপনে দুর্বল করা বিষয়ক তিনটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।
ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ করা এই বিচারে লাইয়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
সোমবার স্থানীয় সময় সকালে, তিন বিচারকের একটি প্যানেল লাইকে (৭৮) চীনের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলতে বিদেশি বাহিনীর সঙ্গে ষড়যন্ত্রের দুটি অভিযোগ ও রাষ্ট্রদ্রোহী উপাদান প্রকাশ করার একটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন।
২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে কারাগারে থাকা লাই সবগুলো অভিযোগে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। তাকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন হংকংজুড়ে প্রবল সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল।
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (পিআরসি) ও এর ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অবিরাম আমন্ত্রণ’ জানানোর জন্য লাইকে অভিযুক্ত করেন বিচারক এস্থার টো।
তিনি ও তার সহকর্মী বিচারক অ্যালেক্স লি ও সুসানা ডি'আলমা রেমেডিওস লি-র মামলার ৮৫৫ পৃষ্ঠার একটি রায় দেন। এই রায়ে লিকে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার জনাকীর্ণ আদালত কক্ষে রায় ঘোষণার সময় টো বলেন, “এতে কোনো সন্দেহ নেই যে প্রথম আসামী তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের অনেক বছর ধরে চীনের প্রতি তার বিরক্তি ও ঘৃণা পোষণ করে আসছিলেন।”

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ও মিডিয়া অ্যাডভোকেসি সংগঠনগুলো দ্রুততার সঙ্গে এই রায়ের নিন্দা জানিয়ে একে ‘ন্যায়বিচারের গর্ভপাত’ বলে অভিহিত করে।
সাজা-পূর্ব শুনানির জন্য লাইকে ১২ জানুয়ারি আবার আদালতে উপস্থিত হওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করবেন কি না, তা পরিষ্কার হওয়া যায়নি।
লাইয়ের বিরুদ্ধে এই বিচার ১৫৬ দিন ধরে চলেছে। এরমধ্যে লাই ৫২ দিন জেরার জবাব দিয়েছেন।
সরকার পক্ষের আইনজীবীদের অভিযোগ, তার প্ররোচনায়ই যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ অন্য অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগুলো নিয়েছে। লাই সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেন, এসব পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাননি।
২০২০ সালে প্রণীত হংকংয়ের জাতীয় নিরাপত্তা আইনে লাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে। এই আইনে ‘অবরোধ’ বা ‘বিচ্ছিন্নতা’ বলে বিবেচিত কর্মকাণ্ডের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়। এই আইনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সমালোচনাও নিষিদ্ধ করা হয়।
হংকংজুড়ে গণতন্ত্রপন্থি ব্যাপক বিক্ষোভ চলাকালে বেইজিং সরকারের কট্টর সমালোচক লাইয়ের বিরুদ্ধে দ্রুততার সঙ্গে এই আইনে অভিযোগগুলো আনা হয়।
১৯৯৫ সালে বাজারে আসা তার প্রকাশনা অ্যাপল ডেইলি হংকংয়ের বৃহত্তম গণতন্ত্রপন্থি সংবাদপত্র হয়ে উঠেছিল। লাইয়ের বিচার চলাকালে সরকারি কৌঁসুলিরা এই সংবাদপত্রের ১৬১টি নিবন্ধ প্রমাণ হিসেবে আদালতে দাখিল করেন।

জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ২০২০ সালের অগাস্টে লাই প্রথমবার গ্রেপ্তার হন। তারপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডিসেম্বরে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়, ফের মুক্তি পাওয়ার পর তৃতীয়বার তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে কারাগারেই আছেন তিনি।
২০২১ সালের মে-তে কর্তৃপক্ষ অ্যাপল ডেইলির সম্পদ জব্দ করে। ওই বছরের জুনে সংবাদপত্রটির সদরদপ্তরে অভিযান চালায় পুলিশ আর তখন প্রধান সম্পাদকসহ পাঁচ নির্বাহীকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেয়। এরপর ওই মাসেই সংবাদপত্রটি এর চূড়ান্ত সংস্করণটি প্রকাশ করে।
লাইয়ের আইনজীবীরা ও পরিবার তার বয়স ও ডায়াবেটিস, প্রেশারসহ শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে হংকংয়ের উচ্চ আদালত বরাবর বারবার ক্ষমা বা নমনীয়তা দেখানোর আবেদন করেছে। এমনকী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতারাও তাকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
নিরাপত্তা আইনে হংকংয়ের মিডিয়া মোগল জিমি লাই গ্রেপ্তার
আল জাজিরা লিখেছে, এই মামলাকে হংকংয়ের ‘এক দেশ, দুই পদ্ধতি’ নীতির একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকংকে ১৯৯৭ সালে চীনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পর এই নীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এই নীতি নিশ্চিত করেছিল যে হংকং চীনের অংশ। কিন্তু এই নীতি তাত্ত্বিকভাবে হংকংকে বেইজিং থেকে পৃথভাবে নিজেদের শাসন ও প্রশাসনকি কাঠামো বজার রাখার অনুমোদনও দিয়েছিল।
কিন্তু গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, চীন হংকংয়ের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ায় কয়েক বছর ধরে এই স্বায়ত্তশাসন হুমকির মুখে পড়ছে।
এক সময় হংকংকে পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বাকস্বাধীনতার বাতিঘর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে অঞ্চলটিতে বিক্ষোভকারী, সাংবাদিক ও প্রকাশকদের গ্রেপ্তার ও বিচারের লক্ষ্যস্থল করতে দেখা যাচ্ছে।