Published : 21 Aug 2026, 04:00 PM
প্রশান্ত মহাসাগরে দানা বাঁধতে থাকা এল নিনো জলবায়ু পরিস্থিতি স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ নিতে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস (মেট অফিস)।
প্রাকৃতিক জলবায়ুর এই শক্তিশালী প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই পরিস্থিতির কারণে ২০২৭ সাল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার ‘প্রবল সম্ভাবনা’ রয়েছে বলে সতর্ক করেছে মেট অফিস।
ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত এবং আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেন সৃষ্টির তীব্রতা হ্রাস পাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এছাড়া যুক্তরাজ্যের শরৎকাল তুলনামূলক বেশি বৃষ্টিবহুল ও ঝড়ো হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিসের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেইফ বলেন, “আমাদের স্পষ্ট বোঝা উচিত এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। আমাদের পূর্বাভাসগুলোতে এল নিনোর সংকেত এত তীব্র হতে আমি কখনও দেখিনি।”
এল নিনো কী?
এল নিনো হল একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া, যা প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয় এবং সাধারণত প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়।
এই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হওয়া বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা গতিপথ বদলে ফেলে, যার ফলে গরম পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়।
সমুদ্র থেকে এই তাপ বায়ুমণ্ডলে স্থানান্তরিত হয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন আনে।
প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অংশে সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে গেলে বিজ্ঞানীরা এল নিনো ঘোষণা করেন।
তবে বর্তমানে প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা যাচ্ছে যে, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ওপরে রয়েছে।
মেট অফিসের সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিকে এল নিনো যখন সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাবে, তখন সমুদ্রের তাপমাত্রার এই অস্বাভাবিকতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।
১৯৫০ সালের পর এটি হবে সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব এবং সম্ভবত ১৯ শতকের পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনা।
সমুদ্রের গভীর অংশে অত্যধিক তাপমাত্রা, কিছু স্থানে ১০০ মিটার (৩৩০ ফুট) গভীরে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি, এই এল নিনোকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
আমেরিকার গবেষণা সংস্থা বার্কলে আর্থ-এর জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. জিক হাউসফাদার বলেন, “এই প্রক্রিয়াটি আরও কয়েক মাস ধরে বিকশিত হতে থাকবে, আর সে কারণেই এটি একটি রেকর্ড সৃষ্টিকারী ঘটনা হতে যাচ্ছে বলে আমাদের বিশ্বাস বাড়ছে।”
অন্যান্য কয়েকটি জলবায়ু সংস্থাও ইঙ্গিত দিয়েছে যে পরিস্থিতি মেট অফিসের পূর্বাভাসের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে, যেখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
হাউসফাদার মন্তব্য করেন, যদি তেমনটি ঘটে তবে এটি ৫০০ বা ১,০০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।
বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় প্রভাব
সমুদ্রে তাপের এই অসম বণ্টন এবং বায়ুমণ্ডলে বাতাসের প্রবাহের পরিবর্তন পুরো বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব এল নিনো একই রকম হয় না এবং এর প্রভাবও ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আলাদা হয়। তবে ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে এর লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বৃষ্টিপাত ২০২৬ সালে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম রেকর্ড করা হয়েছে।
এছাড়া ক্যারিবীয় ও ক্রান্তীয় আটলান্টিক অঞ্চলে বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের কারণে হারিকেনের সক্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে, এই মৌসুমে এখন পর্যন্ত তিনটি ঝড় তৈরি হয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্রান্তীয় অঞ্চলের কাছাকাছি এলাকাগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে তীব্র হতে পারে। অস্ট্রেলিয়া খরা ও দাবানলের ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি পেরু, ইকুয়েডর ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ায় প্রভাব
চলতি গ্রীষ্মে বিশ্বজুড়ে যে রেকর্ড ভাঙা তাপদাহ দেখা গেছে, তার জন্য এল নিনোকে সরাসরি দায়ী করা না হলেও শরৎকাল ও শীতের শুরুতে এর বড় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর ফলে যুক্তরাজ্যসহ উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো আবহাওয়া তৈরি হতে পারে। এমনকি শীতের শেষের দিকে অস্বাভাবিক ঠান্ডা আবহাওয়া তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
২০২৭ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার আশঙ্কা
এল নিনো চলাকালীন সমুদ্র থেকে প্রচুর পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়। মেট অফিসের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. নিক ডানস্টোন জানান, এর ফলে বিশ্বজুড়ে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে এল নিনোর শীতকালীন চূড়ার পরবর্তী ক্যালেন্ডার বছরে।
ফলে ২০২৭ সাল ২০২৪ সালের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছিল যে, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে খাদ্য সংকটে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষ মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে পারে।