Published : 25 Jun 2026, 09:08 PM
মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে জান্তা সরকারের চরম নির্যাতন ও মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে আছে দেশটির ৪০ লাখ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর মূলত রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম সংকটের দিকে থাকলেও, জান্তা সরকার খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কেও নিশানা করছে। মারাত্মক ধর্মীয় নিপীড়ন ও প্রাণহানির শিকার হচ্ছে এই খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুরা।
পশ্চিম মিয়ানমারের চিন রাজ্যের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর থান্টলাং-এর একটি ঘটনা খ্রিষ্টানদের বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। সামরিক জান্তা মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলের পর থেকে শহরটিতে ২২টি চার্চের মধ্যে ২১টিই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
সেনাদের অব্যাহত শেল ও অগ্নিসংযোগের মুখে গোটা শহরের বাসিন্দারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। আগুন নেভানোর চেষ্টা করার সময় চুং বিয়াক হুম নামের এক ধর্মযাজককে গুলি করে হত্যা করে জান্তা সেনারা এবং তার হাতের বিয়ের আংটিটি পর্যন্ত সেনারা নিয়ে নেয় এবং আঙুল কেটে নেওয়া হয়।
মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধে খ্রিষ্টানরা ক্ষতির শিকার হচ্ছে বলে প্রায়ই ভাবা হয়। এটি সত্য যে, খ্রিষ্টানরা জাতির বিপর্যস্ত অবস্থার কারণে ভূগছে। কিন্তু তারা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুও হচ্ছে।
খ্রিষ্টানরা কেবল গৃহযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতিরই শিকার হচ্ছে না; বরং তাদেরকে জাতিগত পরিচয়, ধর্ম এবং জান্তাবিরোধী রাজনৈতিক প্রতিরোধ অবস্থানের কারণে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তারা একদিকে জান্তা সরকারের সেনাবাহিনী, অন্যদিকে আরাকান আর্মির (এএ) মতো বৌদ্ধ শসস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইসলামপন্থি গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (এআরএসএ) কাছ থেকেও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
মানবিক বিপর্যয় ও হামলা
মিয়ানমারে বর্তমানে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং ৩৭ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীনভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
২০২৫ সালে জান্তা সরকারের লক্ষ্যভেদী বিমান হামলায় অন্তত ৯৮২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়, যাদের মধ্যে ২৩২ জন শিশু ছিল এবং তাদের একটি বড় অংশ ছিল খ্রিষ্টান।
এমনকি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে ৪ হাজার মানুষের মৃত্যুর পরও সামরিক জান্তা তাদের ঘোষিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে উপদ্রুত অঞ্চলগুলোতে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে।
খ্রিষ্টানরা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ হলেও তারা মূলত দেশটির সীমান্তবর্তী ও বিরোধপূর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলে বাস করেন। চিন রাজ্যে খ্রিস্টানদের হার ৮৫ শতাংশ, কাচিন রাজ্যে ৩৪ শতাংশ এবং কায়াহ রাজ্যে ৪৬ শতাংশ।
এসব অঞ্চলে দশকের পর দশক ধরে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লড়াই চলছে।
রাষ্ট্রীয় নিধনযজ্ঞ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তর
খ্রিষ্টানদের ওপর নির্যাতন কেবল ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর শুরু হয়নি। পূর্ববর্তী সামরিক জান্তা সরকারের আমলেও চিন রাজ্যের খ্রিস্টানদের জোরপূর্বক শ্রম, নির্যাতন, নির্বিচারে আটক এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে।
পাশাপাশি খ্রিষ্টানদের ওপর বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিগত রাষ্ট্রীয় চেষ্টা চলেছে। অনেক ক্ষেত্রে জান্তা সেনাদের উৎসাহিত করা হতো চিন খ্রিষ্টান নারীদের বিয়ে করে জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করতে, যাতে ওই অঞ্চলের জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ ও ধর্মীয় ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
এই নির্যাতনের কারণে যুগের পর যুগ ধরে লাখ লাখ খ্রিষ্টান নাগরিক ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সেখানে তাদের নিরাপদ শরণার্থীর মর্যাদা নেই। আটক হওয়া কিংবা বিতাড়িত হওয়া থেকেও তারা সুরক্ষিত নয়।
অনেকটা রোহিঙ্গাদের মতোই মিয়ানমারকে খ্রিষ্টান মুক্ত করতে জাতিগত নিধনের দীর্ঘদিনের চেষ্টার কেবল সর্বসাম্প্রতিক অধ্যায় বলা যায় জনগোষ্ঠীটির ওপর ২০২১-পরবর্তী এই নৃশংসতাকে।
জাতীয় পরিচয় হিসেবে কঠোর ‘বামার-বৌদ্ধ’ নীতি অনুসরণ করায় ২০০৮ সালের সংবিধানে বৌদ্ধ ধর্মকে ‘বিশেষ মর্যাদা’ দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ ১৫০ বছরের ইতিহাস থাকার পরও খ্রিষ্টানদের গির্জা নির্মাণ, পাহাড়ের চূড়ায় ক্রস স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নিজেদের ধর্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্যমূলক আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
চার্চ ধ্বংসের নেপথ্য কারণ
সামরিক জান্তা সাধারণত প্রত্যন্ত অঞ্চলের খ্রিষ্টানদের গির্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করে। কারণ এসব বিচ্ছিন্ন জনপদে চার্চগুলোই একমাত্র শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, যা স্থানীয়দের জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে টিকে থাকা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার নৈতিক শক্তি জোগায়।
মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকারের (এনইউজি) সাবেক মন্ত্রী ও চিকিৎসক ড. সাসা বলেন, খ্রিষ্টান অঞ্চলগুলোতে জান্তা সেনারা নারীদের ধর্ষণ করছে, প্রবীণদের নির্যাতন করছে এবং চার্চের পবিত্র ক্রসগুলো ধ্বংস করছে।
ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জান্তা বাহিনী ২০২৫ সালে ৩৭৯টি ধর্মীয় উপাসনালয় ধ্বংস করেছে এবং এর ভেতরে আশ্রয় নেওয়া ২৫৯ জন যাজক ও বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেছে।
চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ‘জুপ-রা কাচিন ব্যাপটিস্ট চার্চ’-এ হামলায় ৬ জন নিহত হন। গত মার্চে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বানমও-র সেন্ট প্যাট্রিক ক্যাথেড্রাল। এরপর গত এপ্রিলে চিন রাজ্যে বিমান হামলায় আরও তিনটি গির্জা ধ্বংস ও একজন যাজক নিহত হন।
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতেও সেনাবাহিনীর জঙ্গিবিমান কানান গ্রামে সেন্ট পিটার্স ব্যাপটিস্ট চার্চে জড়ো হওয়া মানুষদের ওপর হামলা চালায়। এতে নিহত হয় ১৭ জন, যার মধ্যে ৯ জনই ছিল শিশু।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তদন্তে দেখা গেছে, খ্রিষ্টানদের ওপর হামলায় সামরিক জান্তা সরাসরি যুদ্ধবিমান (এ-৫ ফাইটার জেট) ব্যবহার করে বড় ধরনের বোমাবর্ষণ করছ এবং এতে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বার্মা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১ জন যাজককে হত্যা এবং ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বড়দিনেও খ্রিস্টানদের বাড়িঘরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলা চলেছে। কাচিন রাজ্যে খ্রিষ্টানদের গির্জা এবং বাড়িঘর জান্তা বাহিনী ধ্বংস করেছে। কারণ জান্তার নিয়ন্ত্রণে নেই এমন সম্প্রদায়কে তারা টিকিয়ে রেখেছে।