Published : 28 Sep 2025, 02:07 PM
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এখন পর্যন্ত যত সঙ্কট পাড়ি দিয়েছে ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী তার মধ্যে অন্যতমটি এখন পার করতে হচ্ছে তাদের।
দেশের ভেতর বাড়তে থাকা অসন্তোষ আর থমকে থাকা পরমাণু চুক্তির কারণে তারা এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন, বেশি বিভক্ত, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কয়েক দশক ধরে চলা দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে তেহরানের শেষ মুহূর্তের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় শনিবার (বাংলাদেশ সময় রোববার) থেকে ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হয়।
এখন পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় কোনো ‘ব্রেক থ্রু’ না এলে ইরানের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা আরও তীব্র হবে, যা জনগণের অসন্তোষ তুঙ্গে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা চার ইরানি কর্মকর্তা ও অভ্যন্তরীণ দুটি সূত্রের।
আবার পশ্চিমাদের দাবি মেনে নিলে তা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর মধ্যে ভাঙন সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করবে; ‘পশ্চিমা চাপে মাথা নত না করার’ বিপ্লবী যে চেতনা এতদিন তেহরান ধরে রেখেছিল, তা টুটে যাবে, বলছেন তারা।
ফের ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা
“মোল্লাতন্ত্র কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আটকা পড়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব সঙ্কটে। আমাদের জনগণ আরও অর্থনৈতিক চাপ বা আরেকটি যুদ্ধ সামলাতে পারবে না,” বলেছেন এক কর্মকর্তা।
পশ্চিমাদের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক কূটনীতি ব্যর্থ হলে ইসরায়েল ফের ইরানি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাতে পারে এমন আশঙ্কা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, বলেছেন আরেক কর্মকর্তা।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের ষষ্ঠ পর্বের আলোচনা শুরুর একদিন আগে ইরানকে স্তম্ভিত করে ইসরায়েল বিমান হামলা চালালে জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রও তাতে যোগ দিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি ফের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে তাহলে দেশটিতে আবার হামলা চালানোর ব্যাপারে তারা মোটেও দ্বিধায় ভুগবেন না।
এই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার মাধ্যমেই ইরান চাইলে পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে পারে।
“ইসরায়েলের যে আগ্রাসী ভঙ্গি এবং তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে যে শক্তিশালী সমর্থন পাচ্ছে তাতে ফের (ইরানের সঙ্গে) যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল,” বৃহস্পতিবার ইরানি গণমাধ্যমকে এমনটাই বলেছেন সাবেক আইনপ্রণেতা গোলামআলি জাফরজাদে ইমেনাবাদি।
তেহরান ২০১৫ সালে ছয় বিশ্ব শক্তির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে অভিযোগ করে গত মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালে ‘স্ন্যাপব্যাক’ প্রক্রিয়া চালু করে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি। তার ধারাবাহিকতায় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ৮টা থেকে ইরানের ওপর জাতিসংঘের সব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে।
এ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল ছয় মাস পিছিয়ে দিতে রাশিয়া-চীন নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব আনলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আপত্তি জানানোয় তা খারিজ হয়ে যায়।
তেহরান তাদের পরমাণ কর্মসূচির মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের। অন্যদিকে ইরান বলছে, বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি একেবারেই শান্তিপূর্ণ।
নতুন নিষেধাজ্ঞা কট্টর হতে বাধ্য করতে পারে
ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ তাদেরকে পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ে কঠিন অবস্থান নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অবশ্য ফের ইসরায়েলি হামলার হুমকি তাদেরকে সহসা সে পথের দিকে যেতে দেবে না বলেই মনে হচ্ছে।
মধ্যপন্থি সাবেক এক ইরানি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বলছেন, ইরানি নেতৃত্ব যদি আঞ্চলিকভাবে তাদের দুর্বল অবস্থান, ক্রমশ বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ চাপ এবং উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির ফলে কী কী মূল্য দেওয়া লাগবে সে সংক্রান্ত ঝুঁকি বুঝতে পারে তাহলে নাটকীয় কোনো পদক্ষেপ তারা নেবে কিনা সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান।
বর্তমান সঙ্কট কীভাবে সামাল দেওয়া হবে তা নিয়ে ইরানের ক্ষমতাসীনদের মধ্যে ফাটল ক্রমশ বড় হচ্ছে। কেউ চাইছেন, কঠোর অবস্থান নিতে। অন্যরা চাইছেন রয়ে সয়ে চলতে, কেননা কঠোর অবস্থান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ডেকে আনতে পারে তাদের অনেকেরই আশঙ্কা।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পরপরই ট্রাম্প ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং আরও সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে তেহরানের ওপর যেভাবে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছেন, তাতে ‘স্ট্যাটাস ক্যু’ বজায় রাখাই সবচেয়ে সেরা কৌশল হতে পারে বলেও তেহরানের অনেক নীতিনির্ধারকরা ভাবছেন।
“যুদ্ধ নয়, চুক্তি নয়, আরও ছাড় না দিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই এখনকার সেরা বিকল্প হিসেবে দেখছেন তারা,” বলেছেন এক কর্মকর্তা।
জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হওয়ায় ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ যে বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহই নেই। কেননা, এখন আরও অনেক দেশ নিষেধাজ্ঞা মেনে ইরানের সঙ্গে লেনদেন থেকে বিরত থাকবে। এতদিন অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ‘একতরফা’ আখ্যা দিয়ে এড়িয়ে যেতে পেরেছিল, এখন তাদের জন্য একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হবে।
ইরানের ওপর আবারও অস্ত্র কেনাবেচায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত, পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা বহাল হবে। বিশ্বব্যাপী থাকা দেশটির সম্পদ জব্দ হবে, অনেকের ওপর জারি হবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। ইরানের জ্বালানি খাতেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
অর্থনৈতিক খাদ গভীর হলে বাড়বে জনঅসন্তোষ
অর্থনৈতিক সমস্যা যত তীব্র হচ্ছে, ততই ইরানজুড়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে, যা তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিমার মতো অনেক ইরানিই জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হলে তা বছরের পর বছর ধরে থাকা নিষেধাজ্ঞা ও অব্যবস্থাপনায় এমনিতেই চাপে থাকা ইরানের অর্থনীতিকে গভীর খাদে ফেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
“আমরা এখনই দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছি। আরও নিষেধাজ্ঞা মানে আরও অর্থনৈতিক চাপ। আমরা টিকে থাকবো কীভাবে?” তেহরান থেকে টেলিফোনে রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন দুই সন্তানের মা, ৩৬ বছর বয়সী শিমা।
অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে যে তীব্র জনঅসন্তোষ তৈরি হবে তা গণবিক্ষোভে রূপ নিতে পারে বলে ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীর উদ্বেগ রয়েছে। এমন কিছু হলে তা ‘আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর অবস্থানকে আরও দুর্বল করবে’ বলেও তাদের আশঙ্কা, বলছেন এক কর্মকর্তা।
ইরানে সরকারি হিসেবেই মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। কারও কারও হিসাবে এটি ৫০ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুদ্রার ব্যাপক অবনমন ও কাঁচামালের খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাবারের দামের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া ও পরিষেবার বাড়তি খরচের কথা ইরানি গণমাধ্যমেও এসেছে।
মূলত চীনের কারণেই ইরান এত এত চাপের মুখেও এতদিন ধরে অর্থনৈতিক ধস ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিল। বেইজিং তেহরানের তেলের প্রধান ক্রেতা। ২০১৮ সালে ট্রাম্প ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির ওপর আগের সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলেও চীন ওয়াশিংটনের আপত্তি, হুমকি এড়িয়েই ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করে গেছে।
ইরানের এমন বন্ধুর সংখ্যা হাতেগোণা। কিন্তু জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হওয়ায় এ দেশগুলোতে তেহরান আগের মতো রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।