Published : 04 Jan 2026, 02:03 PM
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে, তা কতটা বৈধ, সেই প্রশ্ন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
কয়েক মাস ধরেই ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্রের ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার ভোরে সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্র।
তাকে ইতোমধ্যে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে তাকে ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য।
তবে কয়েকজন বিশ্বনেতা যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ জরুরি বৈঠক ডেকেছে।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ কতটা বৈধ, এক প্রতিবেদনে তা বিশ্লেষণ করেছে রয়টার্স।
কী ঘটেছে?
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরোকে আটক করে। সঙ্গে তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও আটক করা হয়।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়তে আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। তিনি মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। ওইসব মাদক চক্রকে ওয়াশিংটন ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অবৈধ মাদক ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যে হাজারো মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তার পেছনে এসব গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে।
মার্কিন বাহিনী গত সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের নৌযানে অন্তত ৩০টি হামলা চালিয়েছে, হত্যা করেছে শতাধিক মানুষকে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে থাকতে পারে।
এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র কী যুক্তি দিচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ বলছে, মাদুরোকে আটক করতে তাদের বিচার বিভাগ সামরিক সহায়তা চেয়েছিল।
নিউ ইয়র্কের একটি গ্র্যান্ড জুরি মাদুরো, তার স্ত্রী, তার ছেলে, দুই রাজনৈতিক নেতা এবং একটি আন্তর্জাতিক গ্যাংয়ের কথিত এক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের অভিযোগ আনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছিলেন, অভিযুক্তরা “শিগগিরই আমেরিকার আদালতে, আমেরিকার মাটিতে, আমেরিকান বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি হবে।”
তবে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের লাভ ‘চুরি’ করার অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, ওয়াশিংটন সেই লাভ ফেরত নেবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভেনেজুয়েলা শাসন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেটা কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি ট্রাম্প।
আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় অভিযানের আইনি ভিত্তি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। কারণ একদিকে এটাকে লক্ষ্যভিত্তিক আইন প্রয়োগকারী অভিযান বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেরেমি পল বলেন, “আপনি একে আইন প্রয়োগকারী অভিযান বলে দাবি করে আবার বলতে পারেন না যে এখন আমাদের দেশটি চালাতে হবে। বিষয়টি একেবারেই অর্থহীন।”
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তবে প্রেসিডেন্ট হলেন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। যুক্তরাষ্ট্র শাসন করা শীর্ষ দুই দলের প্রেসিডেন্টরাই অতীতে সীমিত পরিসরে ও ‘জাতীয় স্বার্থে’ সামরিক পদক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছেন।
ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস গত বছর ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযানের আদেশ দিতে হলে প্রেসিডেন্টের কংগ্রেসের অনুমতি লাগবে।
তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, শনিবারের অভিযানের আগে কংগ্রেসকে অবহিত করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন বা আত্মরক্ষার মত সীমিত ব্যতিক্রম ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক পাচার ও গ্যাং সহিংসতা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত। তবে সেজন্য আরেক দেশে সশস্ত্র অভিযান আন্তর্জাতিক আইনে বৈধতা পেতে পারে না।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির জাতীয় নিরাপত্তা আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম্যাথিউ ওয়াক্সম্যান বলেন, “শুধু ফৌজদারি অভিযোগই কোনো বিদেশি সরকারকে উৎখাত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বৈধতা দেয় না। মার্কিন প্রশাসন সম্ভবত একে আত্মরক্ষার তত্ত্বে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করবে।”
২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ওই নির্বাচনে কারচুপি হয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।
আগে কখনো এমন হয়েছে?
অতীতে যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার মত দেশে সন্দেহভাজনদের আটক করেছে, তবে সেক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন যদিও মাদুরোকে ‘অবৈধ’ নেতা বলছে, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলায় বিকল্প কোনো নেতৃত্বকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি, যারা মাদুরোকে আটক করার অনুমোদন দিতে পারত।
১৯৮৯ সালে একই ধরনের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র পানামার তৎকালীন নেতা জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করেছিল।
নরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, পানামার বাহিনীর হাতে এক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর ‘মার্কিন নাগরিকদের রক্ষায়’ তারা হস্তক্ষেপ করে।
তখনও যুক্তরাষ্ট্র নরিয়েগাকে ‘অবৈধ নেতা’ আখ্যা দিয়েছিল এবং নির্বাচনে নরিয়েগার বিপরীতে পরাজিত প্রার্থীকে দেশের ‘বৈধ নেতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
২০২২ সালে হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। পরে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বেআইনি প্রমাণিত হলেও ওয়াশিংটনকে হয়ত কার্যকর কোনো জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে না, কারণ আন্তর্জাতিক আইনে সে রকম শক্তিশালী কোনো ব্যবস্থা নেই।
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেরেমি পল বলেন, মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে, তেমন কোনো আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা তিনি দেখেন না।