যেভাবে জাওয়াহিরিকে খুঁজে বের করে হত্যা করল সিআইএ

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার আগ পর্যন্ত জাওয়াহিরি পাকিস্তানের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকা অথবা আফগানিস্তানে লুকিয়ে আছেন বলে বিভিন্নভাবে গুজব ছড়িয়েছিল।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 August 2022, 05:49 AM
Updated : 2 August 2022, 05:49 AM

আল কায়েদা নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি আফগানিস্তানে মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর এটি আন্তর্জাতিক এ সন্ত্রাসী সংগঠনটির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা।

মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, জাওয়াহিরি অনেক বছর ধরে লুকিয়ে ছিল এবং তাকে খুঁজে বের করে হত্যা করার ঘটনাটি কাউন্টার-টেররিজম ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ‘সতর্ক, ধৈর্য্যশীল এবং অবিচল’ কাজের ফল।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার আগ পর্যন্ত জাওয়াহিরি পাকিস্তানের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকা অথবা আফগানিস্তানে লুকিয়ে আছেন বলে বিভিন্নভাবে গুজব ছড়িয়েছিল।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই মার্কিন কর্মকর্তা কাবুলের ওই অভিযানের বিষয়ে যেসব বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তা তুলে ধরা হল:

* কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি নেটওয়ার্কের বিষয়ে সজাগ ছিল আর তাদের মূল্যায়ন ছিল, সেটি জাওয়াহিরিকে আশ্রয় দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সরে আসার পর গত এক বছর ধরে আফগানিস্তানে আল কায়েদার উপস্থিতির ইঙ্গিতগুলোর ওপর নজর রাখছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

চলতি বছর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জাওয়াহিরির পরিবারকে শনাক্ত করে। এদের মধ্যে ছিলেন তার স্ত্রী, তার কন্যা ও ওই নারীর সন্তানরা। তাদের কাবুলের একটি নিরাপদ বাড়িতে রাখা হয়েছিল। পরে ওই একই বাড়িতে জাওয়াহিরির উপস্থিতিও শনাক্ত হয়।

* কয়েক মাসের মধ্যে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও নিশ্চিত হয়ে ওঠেন যে তারা কাবুলের ওই নিরাপদ বাড়িতে জাওয়াহিরিকে সঠিকভাবেই শনাক্ত করেছেন। এপ্রিলের প্রথমদিকে তারা মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানাতে শুরু করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সালেভান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিষয়টি জানান।

“একাধিক স্বাধীন উৎসের তথ্যের মাধ্যমে আমরা (তার) জীবনের একটি ছক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলাম, অভিযান সেটিই কাজে লেগেছে,” বলেছেন ওই কর্মকর্তা।

একবার জাওয়াহিরি কাবুলের নিরাপদ আস্তানায় আসার পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাকে ওই বাড়ির বারান্দায় দেখতে পায় আর সেখানেই তার ওপর একাধিকবার আঘাত হানা হয়, জানান ওই কর্মকর্তা।

* ওই ভবনের কাঠামোর জন্য কোনো হুমকি তৈরি না করে এবং বেসামরিক ও জাওয়াহিরির পরিবারের সদস্যদের ঝুঁকি সর্বনিম্ন রেখে কীভাবে জাওয়াহিরিকে হত্যা করতে অভিযান চালানো যায় তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ওই নিরাপদ আস্তানার গঠন ও ধরন অনুসন্ধান করার পাশাপাশি এর বাসিন্দাদের যাচাই করে দেখেন বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

* পরের সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্ট বাইডেন গোয়েন্দা তথ্যগুলো যাচাই ও পদক্ষেপ নেওয়ার সেরা উপায় নিয়ে আলাপ করতে প্রধান উপদেষ্টাদের ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১ জুলাই হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে সিআইএ-র পরিচালক উইলিয়াম বার্নসসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা প্রস্তাবিত একটি অভিযানের বিষয়ে বাইডেনকে অবহিত করেন।

ওই বৈঠকে বাইডেন বহু প্রশ্ন করেন এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৈরি করা ওই নিরাপদ আস্তানার একটি মডেল নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখেন। তিনি আলো, আবহাওয়া, নির্মাণ উপকরণসহ যে যে বিষয়গুলো অভিযানের সাফল্যের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন করেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

কাবুলে হামলা চালালে সম্ভাব্য যে প্রভাব সৃষ্টি হবে বাইডেন তাও বিশ্লেষণ করে দেখার অনুরোধ করেছিলেন।

* আন্তঃসংস্থা জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের ছোট একটি চক্র গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখেন তারপর আল কায়েদার নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়ার ভিত্তিতে জাওয়াহিরি একটি আইনসম্মত লক্ষ্যস্থল বলে নিশ্চিত করেন।

ওই কর্মকর্তা জানান, ২৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট বাইডেন চূড়ান্ত ব্রিফিংয়ের জন্য মন্ত্রিসভার প্রধান সদস্যদের ও উপদেষ্টাদের ডাকেন এবং জাওয়াহিরিকে হত্যা করা হলে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা নিয়ে আলোচনা করেন।

ওই রুমে থাকা অন্যান্যদের মতামত নেওয়ার পর বাইডেন বেসামরিকদের নিহত হওয়ার ঝুঁকি সর্বনিম্নে রাখার শর্তে ‘এটি সুনির্দিষ্ট উপযোগী বিমান হামলার’ অনুমোদন দেন।

* কাবুলের স্থানীয় সময় রোববার (৩১ জুলাই) ভোর ৬টা ১৮ মিনিটে একটি ড্রোন থেকে দুটি ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জাওয়াহিরিকে হত্যা করা হয়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক