Published : 09 Sep 2026, 12:45 AM
কবির মহার্জনের বার বার চেতনা লোপ পাচ্ছিল, আবার ফিরে আসছিল। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শরীর ডুবে ছিল কাদাপানিতে।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে নয় দিন এভাবেই কেটেছে তার।
উদ্ধার হওয়ার পর হাসপাতালে যখন চেতনা ফিরল, প্রথমে স্ত্রীকেও চিনতে পারছিলেন না কবির। বিভ্রান্ত অবস্থায় স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এতদিন তাকে কেন বিছানা দেওয়া হয়নি!
গত ২৬ অগাস্ট নেপালের ত্রিশূলি উপত্যকার ওপরে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। তার জেরে কাদা ও পানির বিশাল এক প্রলয়ংকারী স্রোত নেমে আসে।
ভয়াবহ সেই বন্যায় নেপাল ও প্রতিবেশী তিব্বতে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে; নিখোঁজ হন হাজার হাজার মানুষ।
ওই ধসের সময় ত্রিশূলি উপত্যকার ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কাদা ও পানিতে ডুবে যায়। এসব প্রকল্পে তখন প্রায় ৯০০ শ্রমিক কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকশ কর্মী আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
নেপালের ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের নকশা ও অবস্থান দেখানো হয়েছে গুগল আর্থের স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে মিলিয়ে। গ্রাফিক: ভিডজান মোহাম্মদ কাওসা ও সারিতা চাগান্তি সিং, রয়টার্স
কবির মহার্জনের সঙ্গে আপার ত্রিশূলি ৩এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গের একটি কক্ষে আটকা পড়েছিলেন মেকানিক্যাল বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ। আটকা পড়ার নয় দিন পর, ৪ সেপ্টেম্বর তাদের দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া প্রবীণ টানেল প্রকৌশলী ও আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানে জানান, কবির ও সঞ্জয় আটকা পড়েছিলেন বায়ুভর্তি একটি কক্ষে।
সব প্রতিকূলতা জয় করে তাদের এই বেঁচে ফেরা উদ্ধারকারী দলগুলোর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা এখনো ভাবছেন, ওই উপত্যকার ধ্বংসস্তূপের নিচে সুড়ঙ্গগুলোতে আটকে পড়া ১২১ জন কর্মীর মধ্যে হয়তো কেউ কেউ এখনও বেঁচে আছেন।
রয়টার্স অন্তত এক ডজন মানুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে দুই কর্মীর বেঁচে ফেরা এবং তাদের বাঁচানোর জন্য চলা মরিয়া উদ্ধার অভিযানের পুরো চিত্রটি তুলে এনেছে।
নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ভোতে কোশি নদীর তীরে বন্যার পানির চিহ্ন। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হেলিকপ্টার থেকে তোলা ছবি
ভয়াবহ সেই সকাল
বিপর্যয়ের দিন সকাল সাড়ে ৭টা। আপার ত্রিশূলি ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিজের শিফট শুরু করার আগে স্ত্রী হীরা শোভাকে ফোন করেন কবির মহার্জন। স্ত্রীকে বলেন, “আমাকে সুড়ঙ্গের ভেতরে যেতে হবে। সেখানে ফোনের নেটওয়ার্ক থাকবে না।”
এর প্রায় ৬০ মিনিট পর, প্রায় ২৫ মাইল উজানে লাংটাং লিরুং পর্বতে একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। তার ফলে দেখা দেয় ভূমিধস।
সেই ধস এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, পানির একটি বিশাল দেয়াল তৈরি করে সেটি আছড়ে পড়ে। নিমেষেই ভেসে যায় কয়েকটি গ্রাম। প্রায় ৯০০ কর্মীসহ ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি নেটওয়ার্ক তলিয়ে যায়।
রাজধানী কাঠমান্ডুতে তখন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা কম্পিউটার স্ক্রিনে প্রকল্পগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
হঠাৎ একের পর এক স্ক্রিন ফাঁকা হতে শুরু করে। একটি একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ প্যানেল থেকে অদৃশ্য হচ্ছিল, যেন তাসের ঘরের মত সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) প্রকৌশলী সুরাজ দাহাল উদ্ধার অভিযানের একাংশের নেতৃত্ব দেন। তিনি জানান, শুরুতে তিনি ততটা উদ্বিগ্ন হননি; কারণ, তার ভাষায়, নেপালে বন্যা একটি ‘স্বাভাবিক ঘটনা’।
কিন্তু খুব দ্রুতই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হতে থাকে।
৩এ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক তখন দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে প্রকল্পের ভেতরে থাকা আনুমানিক ৪০ শ্রমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কর্মকর্তাদের বাড়তি দুই মিনিট সময় লেগে যায়। ততক্ষণে উজানে অন্তত দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্যায় তলিয়ে গেছে।
নয় দিন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে থাকার পর জীবিত উদ্ধার কবির মহার্জনের স্ত্রী হীরা শোভা মহার্জন
সকাল ৯টা ১৩ মিনিটে কবিরকে ফোন করে পেলেন না তার স্ত্রী হীরা। তার ঠিক দুই মিনিট পর কর্মকর্তারা ৩এ প্রকল্পের কর্মীদের জন্য চূড়ান্ত নির্দেশ দেন: “দ্রুত সরে যাও!”
সে সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণকক্ষে কাজ করছিলেন সঞ্জয় শাহ। তিনি এক তলা থেকে আরেক তলায় ছুটে গিয়ে সহকর্মীদের আলাদাভাবে সতর্ক করতে থাকেন।
সুড়ঙ্গের বাইরে থাকা কর্মীরা তখন বন্যার স্রোত থেকে বাঁচতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু স্রোতের গতি এত বেশি ছিল যে তারা পালাতে পারেননি।
কর্মকর্তারা একটি ভিডিওর কথা বলেছেন, যেখানে দেখা যায়, প্রায় ৩০ জন কর্মীর একটি দল তাদের চেয়েও বহুগুণ উঁচু একটি ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাচ্ছেন।
প্রকৌশলী দাহাল জানান, উদ্ধারকারীরা পরে একটি জরুরি নির্গমন সিঁড়ির (এস্কেপ ল্যাডার) সন্ধান পান। যদি কর্মীরা এর কথা জানতেন, তবে ভেতরে থাকা অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হত। কিন্তু তারা জানতেন না কোথায় যেতে হবে।
নেপালের রাসুয়া জেলায় আপার ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের প্রবেশপথের কাছে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন নেপাল সেনাবাহিনীর এক সদস্য। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রয়টার্সের দেখা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং অনুযায়ী, ওই সুড়ঙ্গে ঢোকার চারটি পথ ছিল। এর মধ্যে একটি পথ ১৮০ মিটারের বেশি দীর্ঘ, সেটি ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত গেছে।
উদ্ধারকারীদের ধারণা ছিল, সেটি পুরোপুরি পানিতে ডুবে গেছে। ফলে সেখানে কেউ বেঁচে থাকার আশা প্রায় ছিল না।
এর বদলে উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা প্রকৌশলী নেউপানে একটি ছোট কেবল-ডাক্ট সুড়ঙ্গের দিকে মনোযোগ দেন। উপরের দিকে ঢালু ওই সুড়ঙ্গ বন্যার পানিতে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সেখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন কবির ও সঞ্জয়। সুড়ঙ্গ থেকে বের হওয়ার মুখ থেকে মাত্র ১৬০ মিটার দূরে।
পরে কবির তার স্ত্রীকে জায়গাটির বর্ণনা দিয়ে বলেন, “সুড়ঙ্গের একেবারে শেষ প্রান্তের একটি কোণায় ছিলাম আমরা।”
নয় দিনের অন্ধকার
বাতাসভর্তি যে কক্ষটি তাদের জীবন বাঁচিয়েছিল, পরের নয় দিন সেটিই তাদের জন্য কারাগারে পরিণত হয়েছিল।
সঞ্জয় বলেন, সাহস ধরে রাখতে তিনি মন্ত্র জপতেন। অন্যদিকে কবির বেঁচে থাকার জন্য সেই কাদাপানিই একটু একটু করে পান করতেন, যার মধ্যে তাকে ঘুমাতে হচ্ছিল।
হীরা শোভা প্রথম যখন বন্যার খবর শোনেন, তিনি ভেবেছিলেন বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়তো নিরাপদ থাকবে।
তিনি স্বামীকে ফোন করেন। ফোন করেন তার সহকর্মীদেরও। এমন কাউকে খুঁজতে থাকেন, যিনি তার স্বামীর খবর জানেন। কিন্তু কেউ ফোন ধরছিলেন না।
পরে কর্মকর্তারা তাকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রবেশপথের আগের এবং বর্তমান ছবি দেখান। আগে যেখানে ফটক ছিল, এখন সেখানে শুধু ফাঁকা নদীর তীর।
হীরা শোভা ভাবলেন, তার স্বামীর বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনাই আর নেই।
তার মনে তখন ভর করে গভীর এক হতাশা। তবু ১৫ ও ১০ বছর বয়সি দুই ছেলের সামনে নিজেকে শক্ত রেখেছিলেন।
নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর আপার ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের প্রবেশপথের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন নেপাল সেনাবাহিনীর এক সদস্য। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়ের সাথে পাল্লা
উদ্ধারকারীরা আশা করেছিলেন, ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন জায়গায় আটকে থাকা বায়ুর পকেট হয়ত কিছু শ্রমিককে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির প্রধান ধরম রাজ উপ্রেতি জানান, উপত্যকাজুড়ে সাড়ে সাত হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের সিদ্ধান্ত নিতে বেগ পেতে হচ্ছিল, তারা প্রথমে কোথায় খনন শুরু করবেন।
তবে ৩এ প্রকল্পটিকে তালিকার উপরের দিকেই রাখা হয়েছিল। কারণ, কর্মকর্তাদের আশা ছিল, এর টারবাইন ও ভেন্টিলেশন ফ্লোরের বহুতল কাঠামোর মধ্যে হয়ত বাতাস আটকে থাকতে পারে।
বিপর্যয়ের পরদিন সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ঘটনাস্থলে পৌঁছান প্রকৌশলী সাগর ঢাকাল ও নেউপানে। তারা দেখতে পান, ভারী যন্ত্রপাতি তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে নামানো সম্ভব নয়; কারণ ধ্বংসস্তূপ তখনো কাদামাটিতে পূর্ণ ছিল।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল বলেন, “পরিস্থিতি এমন ছিল যে, ওই কাদার ওপর আপনি যা কিছুই ফেলবেন, তা মাটির নিচে তলিয়ে যাবে।”
তাই খনন শুরু করার আগে উদ্ধারকর্মীদের একটি স্থিতিশীল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হয়। পুরোদমে খননকাজ শুরু হয় বিপর্যয়ের তিন দিন পর।
সুড়ঙ্গের চারটি প্রবেশপথই কাদা, পাথর, কাঠ আর ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে ছিল, যার কিছু অংশ ১৫ থেকে ৩০ মিটার ভূমিধসের নিচে চাপা পড়েছিল।
উদ্ধারকারীরা তখন ড্রিলিং, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে পথ তৈরি করতে থাকেন।
অবশেষে ওপর থেকে ৫ ইঞ্চি ছিদ্র করার পর সুড়ঙ্গের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়, যা উদ্ধারকারী দলকে খননের জন্য একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে দেয়।
কিন্তু বৃষ্টি পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে। কয়েক রাতের প্রবল বৃষ্টিতে খনন করা গর্ত আবার পানি ও নতুন ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়। উদ্ধারকারীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টার পরিশ্রম পণ্ড হয়ে যায় মাত্র কয়েক মিনিটে ।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্য আমশু কিরণ শাহি জানান, টানেলের চাপা পড়া প্রবেশপথ পর্যন্ত পৌঁছাতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন লেগে যায়।
সেখানে পৌঁছে তারা জীবিতদের সন্ধানে ডাকাডাকি করেন। কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি।
নেপালের রাসুয়া জেলায় আপার ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে ঢুকে জীবিতদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শেষ মুহূর্তের চেষ্টা
জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আগের রাতে উদ্ধারকারীরা কাদায় আটকে থাকা এমন এক ধ্বংসস্তূপের দেয়ালের সামনে পৌঁছান, যা সরানো সম্ভব হচ্ছিল না।
সাগর ঢাকালের দল তখন তাৎক্ষণিকভাবে একটি বুদ্ধি খাটান। তারা সুড়ঙ্গের প্রায় ১৫ মিটার ওপরের একটি প্রাকৃতিক চ্যানেল ব্যবহার করে উচ্চ-চাপের জেট দিয়ে ভেতরে পানি প্রবেশ করান। তাতে কয়েক মিনিটের মধ্যে ৪ থেকে ৫ মিটার রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যায়।
কিন্তু এরপর আবার বৃষ্টি শুরু হয়। তাতে আংশিক ধস দেখা দেয় এবং কয়েকজন উদ্ধারকারী নিজেরাই কিছুক্ষণের জন্য আটকা পড়েন।
অভিযান কয়েক ঘণ্টার জন্য থমকে যায়। পরে সহকর্মীরা তাদের বের করে আনেন এবং মেটাল শিট ও গ্যাবিয়ন ওয়্যার দিয়ে রাস্তাটি শক্তিশালী করেন।
দশম দিন ভোর ৪টার দিকে প্রকৌশলী সুরাজ দাহালের কাছে একটি ফোন আসে। ভারী যন্ত্রপাতির এক অপারেটর ফোন করে জানান, উদ্ধারকারীরা কিছু একটা শুনেছেন।
কীসের শব্দ? হয়তো কোনো জীবিত মানুষের শব্দ।
নেপালের রাসুয়া জেলায় আপার ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে জীবিতদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অথবা হতে পারে অন্ধকারে উদ্ধারকারীদের নিজেদের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে।
উদ্ধারকারী দলের নেতা গঙ্গা বড়াল জানান, তারা সুড়ঙ্গের ভেতরে ড্রিল করার সময় শব্দ শুনতে শোনেন। আরো ভালো করে শোনার জন্য বারবার তারা ইঞ্জিন বন্ধ করে কান পাতছিলেন।
বড়াল বলেন, “আমরা ডাক দিতাম, ‘কোথায় আপনারা? আপনারা কি আছেন?’ মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যে ভেতরে কেউ বেঁচে আছে এবং আমাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।”
তারা ঠিকঠাক বুঝতে পারছিলেন না। তবে ধারণা করছিলেন, শব্দের উৎস মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিটার দূরে। এরপর, টর্চের আলোতে তারা একটি হাত দেখতে পান।
উদ্ধারকর্মী আর সেই হাতের মাঝখানে তখনও ৫ থেকে ১০ মিটার কাদায় আটকে থাকা পথ।
সকাল ৭টার দিকে সেনা সদস্যরা ছোট একটি গর্ত তৈরি করতে সক্ষম হন। ভেতর থেকে একটি মাত্র শব্দ ভেসে আসে– “হুনুহুঞ্চা।”
এর মোটামুটি অর্থ হল “আমরা এখানে আছি।”
নেপালের রাসুয়ায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে জীবিত উদ্ধার দুই শ্রমিকের একজন সঞ্জয় শাহকে বাইরে নিয়ে আসছেন উদ্ধারকর্মীরা। ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অন্ধকার থেকে আলোয়
উদ্ধারকারীরা যখন আটকে থাকা দুই কর্মীকে টানেল থেকে বের করে আনছেন, তারা দাঁড়াতে পারছিলেন না।
কাদায় মাখামাখি সঞ্জয়কে একজন উদ্ধারকারীর পিঠে তুলে বের করে আনা হয়। ক্যামেরার দিকে তিনি কোনোভাবে একটি হাত তুলতে পেরেছিলেন।
তবে কবির মহার্জন গুরুতর আহত ছিলেন। তাকে বের করে আনা হয় স্ট্রেচারে করে।
খবর পেয়ে কবিরের ছেলেরা চিৎকার করে বলে ওঠে, "মা, বাবা ফিরে এসেছে!"
বাইরে থেকে পুরো উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছিলেন সাগর ঢাকাল। তিনি নিজে সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢোকেননি। দুই শ্রমিককে যখন বের করে আনা হল, তিনি আবেগে কেঁদে ফেরেন।
ঢাকাল বলেন, “আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।”
পরদিন আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্য একটি সুড়ঙ্গ থেকে লু হাইতাও নামে এক চীনা নাগরিককে উদ্ধার করা হয়।
হাসপাতালে ডাক্তাররা কবিরের পায়ে তৈরি হওয়া একটি গভীর ক্ষতের অস্ত্রোপচার করেছেন বলে জানান তার স্ত্রী।
হীরা শোভা যখন হাসপাতালে প্রবেশ করেন, কবির তাকে চিনতে পারেননি। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি কোথায়?”
কিন্তু স্বামীকে জীবিত ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা ছিলেন হীরা শোভা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, “ও নতুন এক জীবন পেয়েছে।”