যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন দমকল কর্মীরা। ছবি: রয়টার্স
Published : 16 Sep 2026, 04:38 PM
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত একটি সাত তলা আবাসিক ভবন ধসে অন্তত ১২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫টি শিশু রয়েছে।
বুধবার এ ঘটনার পর দুর্ঘটনাস্থল থেকে হতাহতদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন গাজার সিভিল ডিফেন্স ও উদ্ধারকর্মীরা। রাতের আঁধারে ধসে পড়া ভবনটির ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও প্রায় ১০০ জন আটকে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ঘটনা পুরো গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বিমান হামলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাসকারী হাজার হাজার ফিলিস্তিনির অরক্ষিত অবস্থার চিত্র নতুন করে সামনে এনেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দুর্ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ১২ জনের লাশ এবং ১৪ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেছেন।
রয়টার্সের হাতে আসা একটি ভিডিওতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেয়ালের নিচ থেকে দুজনকে টেনে বের করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অন্য একটি ভিডিওতে গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসালকে রক্তভেজা স্কার্ফে জড়ানো এক শিশুকে কোলে নিয়ে ছুটতে দেখা গেছে।
গাজা সিটির সিভিল ডিফেন্স সার্ভিসের পরিচালক রায়েদ আল-দাহশান জানান, ধসে পড়া ভবনটিতে অন্তত ১০টি পরিবার বসবাস করছিল।
দাহশান বলেন, “আমরা এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত মানুষের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি, তাই আরও মানুষকে উদ্ধার করার আশা রয়েছে।”
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) গাজা প্রধান আলেসান্দ্রো ম্রাকিচ জানান, উপযুক্ত ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েকটি জাতিসংঘ সংস্থা ও মিসরের ত্রাণ সংস্থার সদস্যরা স্থানীয়দের সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
পরিস্থিতিকে হৃদয়বিদারক বর্ণনা করে ম্রাকিচ বলেন, “আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় ভারী সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি নেই। উদ্ধারকর্মীদের মূলত খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হচ্ছে। ফলে আরও প্রাণহানির খবরের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “গাজায় প্রায় ৪০০টি ভবন যেকোনো সময় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন শীত মৌসুমে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কা আরও বেশি।”
ভারী যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি বিধিনিষেধকে দায়ী করেছেন ফিলিস্তিন ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা। তবে ইসরায়েলের দাবি, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক ব্যবহারের সুযোগ রোধ করতেই তারা সরঞ্জাম আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া ইসরায়েলের বর্বর আক্রমণে গাজায় প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ জমেছে, যা পরিষ্কার করতেই অন্তত সাত বছর সময় লাগবে।
সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তা দাহশান বাসিন্দাদের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, পরিবারগুলো প্রাণ হাতে নিয়ে গাজায় অন্তত ২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছে।
তিনি বলেন, “পরিবারগুলো বিকল্প কোনো আশ্রয় না পেয়ে বাধ্য হয়ে নিরাপদ মনে করে এই ভবনে উঠেছিল। কিন্তু গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমাচ্ছিল, তখন পুরো ভবনটি এক মূহুর্তে ধসে পড়ে।”
গৃহহীনদের জন্য নতুন তাঁবুর চরম সংকট থাকায় এবং ঝড়বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়ার কথা বিগত মাসগুলোতে রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন অনেক ফিলিস্তিনি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি গাজায় বড় ধরনের যুদ্ধ থামালেও ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণসহ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া যুদ্ধ অবসানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করে ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছে হামাস। অন্যদিকে ইসরায়েলের দাবি, হামাস চুক্তির শর্ত ভাঙছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ বেসামরিক। অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, এই সময়ে তাদের ৪ জন সেনা নিহত হয়েছে।