আপনাদের হাতে রক্ত: সামাজিক মাধ্যম প্রধানদের মার্কিন সিনেট

বেশ কয়েকজন অভিভাবককে সন্তানদের ছবি উচিয়ে ধরে রাখতেও দেখা গেছে। তাদের বক্তব্য ছিল, সামাজিক মাধ্যমের কারণে তাদের সন্তানেরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Feb 2024, 09:01 AM
Updated : 1 Feb 2024, 09:01 AM

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সামজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রধানদের ‘একেবারে ধুয়ে দিয়েছেন’ মার্কিন সিনেটররা। এমনকি নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির ঝুঁকি থেকে রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে এক আইন প্রণেতা দাবি করেছেন, কোম্পানিগুলো ‘হাতে রক্ত নিয়ে ঘুরছে’।

সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলো যে নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে আর্থিক লাভের দিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে, তা নিয়ে অভিভাবক ও মানসিক বিশেষজ্ঞদের ক্রমবর্ধমান শঙ্কার বিপরীতে মার্কিন আইন প্রণেতাদের সর্বশেষ প্রচেষ্টা ছিল বুধবার ডাকা এ শুনানি।

“মিস্টার জাকারবার্গ, আপনি ও যেসব কোম্পানি এখানে আছেন, আমি জানি এটা আপনাদের ইচ্ছায় না হলেও সত্য হল, আপনাদের হাতে রক্ত।” --মেটা সিইও মার্ক জাকারবার্গের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে শুনানিতে বলেন রিপাবলিকান দলের সিনেটর লিন্ডজি গ্রাহাম।

“আপনারা এমন পণ্য বানিয়েছেন, যেগুলো মানুষ মারছে।”

জাকারবার্গের পাশাপাশি এই শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়েছেন এক্স-এর সিইও লিন্ডা ইয়াকারিনো, স্ন্যাপের সিইও ইভান স্পিগেল, টিকটক সিইও শউ জি চিউ ও ডিসকর্ড সিইও জেসন সাইট্রন।

জুডিশিয়ারি কমিটির ডেমোক্র্যাটিং অংশের প্রধান সেনেটর ডিক ডার্বিন অলাভজনক সংস্থা ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন’-এর একটি পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতিও দিয়েছেন এ শুনানিতে। 

এতে দেখা যায়, অনলাইন জগতে এ ধরনের আর্থিক ‘সেক্সটর্শন’-এর প্রবণতা আকাশচুম্বী, যেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীকে নগ্ন ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে হুমকিদাতা।

“শিশুর ওপর যৌন হয়রানির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তা হল, প্রযুক্তি খাতে বিভিন্ন নতুন পরিবর্তন,” শুনানিতে বলেন ডার্বিন।

শুনানি শুরুর পরপরই একটি ভিডিও দেখিয়েছে জুডিশিয়ারি কমিটি, যেখানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অপ্রীতিকর ঘটনার ভুক্তভোগী হওয়ার বিষয়ে কথা বলতে দেখা যায় শিশুদেরকে।

“আমি ফেইসবুকে যৌন হয়রানির সম্মুখীন হয়েছিলাম,” ওই ভিডিও’তে বলেন এক শিশু। তবে, তার চেহারা ছায়ায় আবৃত ছিল।

এ ছাড়া, শুনানি কক্ষে বেশ কয়েকজন অভিভাবককে নিজ নিজ সন্তানদের ছবি উচিয়ে ধরে রাখতেও দেখা গেছে। তাদের দাবি ছিল, সামাজিক মাধ্যমের কারণে তাদের সন্তানেরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি শুনানির উদ্বোধনী বিবৃতি ও অন্যান্য সময় ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক কোম্পানি মেটার প্রধান জাকারবার্গকে উপহাস করার পাশাপাশি অন্যদের নিয়েও মন্তব্য করেন কেউ কেউ।

এদিকে, শুনানির এক সময় জাকারবার্গকে অভিভাবকদের কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়ার চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেন সেনেটর জশ হলি। আর জাকারবার্গ যখন সাক্ষ্য দিতে অভিভাবকদের দিকে মুখ করে ঘুরে দাঁড়ান, সে সময় বেশ কয়েকজনকে তাদের সন্তানদের ছবি ফের উচিয়ে ধরতে দেখা যায়।

ভুক্তভোগী শিশুদের বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি অন্য কেউ যেন এমন পরিস্থিতিতে না পড়ে, জাকারবার্গ তা নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন এ শুনানিতে। তবে, এর দায়ভার নিতে রাজি হননি তিনি, যেখানে হলি পরামর্শ দিয়েছেন, তার এমনটি করা উচিৎ ছিল।

শুনানির এক উত্তেজনাকর মূহুর্তে বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীণ ইমেইল বার্তাও দেখিয়েছে জুডিশিয়ারি কমিটি, যেখানে মেটার শীর্ষ নির্বাহীরা জাকারবার্গকে প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে ৪৫ থেকে ৮৪ জন প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ জানালেও তা তিনি নাকচ করে দেন।

অন্যদিকে, এক্স-এর সিইও লিন্ডা ইয়াকারিনো বলেছেন, গত সপ্তাহে ডার্বিনের উত্থাপিত ‘স্টপ সিএসএএম অ্যাক্ট’কে তার কোম্পানি সমর্থন করে, যেখানে শিশুদের যৌন হয়রানির বিষয়ে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম কোম্পানির দায়ভার নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদেরকেও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও অ্যাপ স্টোরের বিরুদ্ধে মামলা করার অধিকার দেওয়া হয়েছে।

শিশুর অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন বেশ কিছু বিল উত্থাপিত হলেও এখনও কোনোটিই আইনে পরিণত হয়নি।

২০২২ সালের অক্টোবরে ইলন মাস্কের টুইটার (বর্তমানে এক্স) অধিগ্রহণের পর থেকে প্ল্যাটফর্মটির সেবা ও মডারেশন ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। 

এ সপ্তাহে এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি মার্কিন পপ গায়িকা টেইলর সুইফটের ভুয়া ছবি প্ল্যাটফর্মটিতে ছড়িয়ে পড়ার পর সুইফটের নাম সার্চ করার সুবিধাটি বন্ধ করে দেয় এক্স।

বুধবারের শুনানিতে দেখা গেছে টিকটক সিইও চিউকেও, যিনি সর্বশেষ মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সামনে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন গত বছরের মার্চে। তখনও বিভিন্ন ঝাঁঝালো প্রশ্নের মুখে পড়েছেন চীনা মালিকানাধীন ভিডিও অ্যাপ কোম্পানিটির প্রধান। সে শুনানিতে কেউ কেউ এমনও দাবি করেন, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যে ব্যাপক ক্ষতি করছে অ্যাপটি।

এবারের শুনানিতে চিউ বলেছেন, প্রতি মাসে ১৭ কোটি আমেরিকান নাগরিক টিকটক ব্যবহার করে থাকেন, যা গত বছরের শুনানিতে কোম্পানির দাবি করা সংখ্যার চেয়ে দুই কোটি বেশি।