মাস্ক-ডরসি-আগরাওয়াল: খুললো ত্রিভূজ সম্পর্কের প্যান্ডোরার বাকসো

টুইটার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান জ্যাক ডরসি আর বর্তমান প্রধান নির্বাহী পারাগ আগরাওয়ালের সঙ্গে মাস্কের যে মেসেজ চালাচালি হয়েছিল, সেগুলো উঠেছে আদালতে।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 30 Sept 2022, 11:55 AM
Updated : 30 Sept 2022, 11:55 AM

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক টানা কয়েক মাস ধরে টুইটার নিয়ে একের পর নাটকীয়তার জন্ম দিয়ে আলোচনায় থাকলেও পর্দার পেছনের ঘটনাগুলো অজানাই ছিল সবার। কিন্তু হঠাৎই খুলে গেছে প্যান্ডোরার বাকসো!

টুইটার ক্রয়ের সমঝোতা চুক্তি ইলন মাস্ক বাতিল করার পর তার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল টুইটার। মামলায় প্রমাণ হিসেবে ঘটনা প্রবাহের শুরুর দিনগুলোতে টুইটার প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান জ্যাক ডরসি আর বর্তমান প্রধান নির্বাহী পারাগ আগরাওয়ালের সঙ্গে মাস্কের যে টেক্সট মেসেজ চালাচালি হয়েছিল, সেগুলো আদালতে তুলেছেন টুইটারের আইনজীবীরা।

আর সেই মেসেজগুলো বলছে, প্রাথমিক অবস্থায় টুইটার মাস্কের কাছে বেচার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন খোদ জ্যাক ডরসি, মাস্ক আগ্রহ দেখালেও প্ল্যাটফর্মটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ডরসির সঙ্গে মিল ছিলো না শীর্ষ ধনীর চিন্তাধারায়; আর প্রধান নির্বাহীর গুরুদায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে সামলাতে গিয়ে মাস্ক-ডরসির বাড়া-ভাতে-ছাই দিয়ে বসেছেন সে সময় নতুন দায়িত্ব নেওয়া পারাগ।

আদালতে ইলন মাস্কের যে মেসেজগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলো দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে বলে মন্তব্য প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট ভার্জের। প্রথম অংশে ইলন মাস্ক টুইটার ক্রয়ের আগ্রহ দেখানোর খবরে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন সুযোগ সন্ধানীরা। আর দ্বিতীয় অংশে উঠে এসেছে সে চুক্তি ভেস্তে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার খেদ।

ঘটনা প্রবাহের শুরু মাস্ক চার হাজার চারশ কোটি ডলারে টুইটার কেনার প্রস্তাব দেওয়ার এক মাস আগে। মার্চ মাসে মাস্ক টুইটারে বাকস্বাধীনতার অভাব নিয়ে টুইট করার পর জ্যাক ডরসি টেসলা প্রধানকে মেসেজ পাঠিয়ে বলেন, “নতুন একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার। কিন্তু সেটা কোনো কোম্পানি হওয়া চলবে না। এ কারণেই আমি চলে এসেছি।”

তারপর মাস্কের কাছে একটি বিকেন্দ্রীক যোগাযোগ প্রোটোকলের ভাবনা বেচার চেষ্টাও করেন ডরসি। আর টুইটারের ‘কখনোই একটা কোম্পানি হওয়া উচিত ছিল না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ডরসির বক্তব্যের সঙ্গে মোটামুটি একমত পোষণ করলেও নিজের মতামত দেওয়ার সুযোগও ছাড়েননি মাস্ক। বলেন, “আমার মনে হয় টুইটারকে ভিন্ন দিকে নেওয়া এবং পাশাপাশি নতুন কিছু করার চেষ্টা– দুটোই ঠিক হবে।”

প্রথমে মাস্কের চিন্তাধারার নিয়ে সন্দিহান ছিলেন ডরসি। কিন্তু সেই স্বর রাতারাতি পাল্টে গিয়েছিল টেসলা প্রধান বিপুল সংখ্যক টুইটার শেয়ার কেনার খবর প্রকাশ করার পর। ডরসি মাস্ককে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, “আমি এটা অনেকদিন ধরে চাইছিলাম। অবশেষে এটা সম্ভব হচ্ছে জেনে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছি।”

মাস্কের সঙ্গে বর্তমান প্রধান নির্বাহী পারাগ আগরাওয়ালের সাক্ষাৎ নিয়েও উত্তেজিত ছিলেন ডরসি। মাস্ককে মেসেজ পাঠিয়ে বলেছিলেন, “পারাগ একজন অবিশ্বাস্য প্রকৌশলী।”

মেসেজগুলো বিশ্লেষণ করে ভার্জের মত– একটা বিষয় স্পষ্ট যে, টুইটার আর মাস্ককে এক করতে সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছেন সাবেক প্রধান ডরসি নিজেই।

অন্যদিকে, বর্তমান প্রধান নির্বাহী হলেও দায়িত্বশীল প্রকৌশলীর স্বভাবসুলভ সাবধানী আচরণ রয়ে গিয়েছিল পারাগ আগরাওয়ালের মধ্যে।

আগরাওয়ালের সঙ্গে মাস্কের প্রথমদিককার যোগাযোগও ছিল বেশ স্বতস্ফুর্ত; নয় শতাংশের বেশি শেয়ার কেনার পর সফটওয়্যার নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার ঢোল পিটিয়ে মাস্ক আগরাওয়ালকে বলেছিলেন, “আমি কেবল চাই যে টুইটার সবচেয়ে চমকপ্রদ কিছু হয়ে উঠবে।”

এক্ষেত্রে মাস্ককে ছাড় দেননি শুরু থেকেই সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে পেশাজীবন গড়ে তোলা আগরাওয়াল। রসিকতার ছলেই মাস্ককে মেসেজে বলেছিলেন, “আমিও একসময় সিটিও (প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা) ছিলাম এবং আমাদের কোডবেইজে আছি দীর্ঘ দিন ধরে… সিইওর বদলে আমাকে প্রকৌশলী হিসেবেই ভাবতে পারো তুমি, তারপর দেখা যাক কতোদূর যেতে পারি আমরা।”

কিন্তু ওই মেসেজ পাঠানোর ঠিক দুদিন পরেই আগরাওয়াল কার্যত খেপিয়ে দেন মাস্ককে। টুইটারে খেপাটে এবং আক্রমণাত্মক টুইট করার পুরনো অভ্যাস আছে মাস্কের। টেসলা প্রধান স্বভাবসুলভভাবে তেমনই এক টুইট করার পর ৯ এপ্রিল আগরাওয়াল তাকে মেসেজ পাঠান, “ ‘টুইটার মরে যাচ্ছে কী না?’ অথবা টুইটারের বিষয়ে এমন যে কোনো মন্তব্য করার পূর্ণ স্বাধীনতা তোমার আছে। কিন্তু আমার দায়িত্ব হচ্ছে তোমাকে এটা বলা যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে টুইটারকে ইতিবাচক কোনো দিকে নিতে এটা (মাস্কের টুইট) আমাকে একেবারেই সাহায্য করছে না।”

আগরাওয়াল ওই মেসেজ পাঠানোর আগ পর্যন্ত টুইটারের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেওয়ার কথা ছিল মাস্কের। কিন্তু মেসেজ পাওয়ার দুই মিনিটের মাথায় মাস্ক ঘোষণা করে বসেন, টুইটারের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেওয়া ‘সময়ের অপচয়।” তার পরপরই টুইটারকে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিকে পরিণত করার ঘোষণা দিয়ে বসেন তিনি।

পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ব্রেট টেইলকে মাস্ক মেসেজ পাঠিয়ে বলেন, “পারাগের সঙ্গে কথা বলে টুইটার ঠিক করা সম্ভব নয়। কঠিন কোনো পদক্ষেপ নিতেই হবে।”

আগরাওয়াল মাস্ক-ডরসির ‘কাবাবে হাড্ডি’ হওয়ার আগ পর্যন্ত সুযোগ সন্ধানীরাও ভিড় করেছিলেন মাস্কের ইনবক্সে। মাস্ক টুইটার কিনতে যাচ্ছেন জানার পর প্রযুক্তি উদ্যোক্তা জেসন ক্যালাকানিস মাস্ককে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, “আমার তলোয়ার তোমার জন্য” এবং “টুইটারের প্রধান নির্বাহী হওয়া আমার স্বপ্নের চাকরি।”

অন্যদিকে, হাল ছাড়তে নারাজ ছিলেন জ্যাক ডরসি; মেসেজে লিখেছিলেন, “আমি এটা ভেস্তে যেতে দেবো না এবং যা লাগবে তার সব করবো আমি। মানবতার জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

মাস্ক আর আগরাওয়ালের মধ্যে আপোস করানোর চেষ্টাও করেছেন ডরসি। বলে রাখা ভালো, উত্তরসূরী হিসেবে পারাগ আগরাওয়ালকে বেছে নিয়েছিলেন ডরসি নিজেই।

মাস্ককে ডরসি মেসেজ পাঠিয়ে বলেছিলেন, “ওকে (আগরাওয়াল) নির্দিষ্ট কোনো কাজ ধরিয়ে দিলে সেটা ঠিকঠাক করার বেলায় ও সেরা।”

কিন্তু ততোদিনে আগরাওয়ালকে যেন আর মানতেই পারছিলেন না মাস্ক। ফিরতি মেসেজে মাস্ক লিখেছেন, “পারাগ আসলে খুব ধীর গতিতে এগোচ্ছে আর এমন সব মানুষকে খুশি করার চেষ্টা করছে, যারা তুমি যতোই করো না কেন, কখনোই খুশি হবে না।”

মাস্ককে ডরসির পাঠানো শেষ মেসেজটি ছিল, “অন্তত এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তোমরা দুজন একসঙ্গে কাজ করতে পারবে না।”

আদালতে উত্থাপিত মেসেজগুলোতে উঠে আসা ঘটনা প্রবাহের দ্বিতীয় পর্বের শুরু মে মাসে। ব্যাংকার মাইকেল গ্রাইমসকে পাঠানো মেসেজে ‘টুইটার কোনো ভালো প্রশ্ন তোলেনি এবং ভালো কিছু বলারও ছিল না তাদের” বলে উল্লেখ করেন মাস্ক। তারপর গ্রাইমসকে চুক্তি সম্পন্ন করার আইনি প্রক্রিয়ার গতি কমাতে বলেন টেসলা প্রধান।

গ্রাইমসকে পাঠানো মেসেজেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার কথা তোলেন মাস্ক; টুইটার সক্রিয় ব্যবহারকারীর যে সংখ্যা উপস্থাপন করে আসছে তার অর্ধেকেরও বেশি ভুয়া বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি।

মাস্ক আর আগরাওয়ালের মধ্যে রেষারেষির বিষয়টি জনসমক্ষে এসেছে আগেই। অন্যদিকে, ডরসি যে মাস্কের কাছে টুইটার বেচতে অতিআগ্রহী, সে বিষয়টিও গোপন কিছু ছিল না। কিন্তু আগরাওয়ালের সঙ্গে মাস্কের যোগাযোগে হঠাৎ অবনতির বিষয়টি চমকপ্রদ বলে মন্তব্য করেছে ভার্জ।

আর প্রথম পর্যায়ে মাস্ক জ্যাক ডরসির সব কথার সঙ্গে একমত পোষণ করলেও, টুইটার ক্রয়ের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করার সঙ্গে সঙ্গেই যে মাস্ক ডরসির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা শুরু করেন, সে বিষয়টিও উঠে এসেছে টেসলা প্রধানের মেসেজগুলো থেকে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক