ধাতু রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধে নতুন মাত্রা চীনের
“গ্যালিয়াম এবং জার্মেনিয়াম হচ্ছে এমন দুষ্প্রাপ্য ধাতু যেগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য খুবই জরুরী, আর চীন সেগুলোর শীর্ষ উৎপাদক।”
সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি শিল্পে অপরিহার্য বলে বিবেচিত কয়েকটি ধাতু রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান রেষারেষিতে একে দেখা হচ্ছে নতুন মাত্রা হিসাবে।
‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে’ আগামী ১ অগাস্ট থেকে আটটি গ্যালিয়াম ও ছয়টি জার্মেনিয়াম পণ্য রাপ্তানি নিয়ন্ত্রিত থাকবে – সোমবার এমন ঘোষণা দেয় চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
একে চীনের প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে রুখতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা; যা বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই-চেইনকে ব্যাহত করতে পারে বলেছে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন।
এমন সিদ্ধান্তে কোম্পানিগুলো তাদের সরবরাহ লাইন বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে তারা রপ্তানি অনুমোদনের জন্য আবেদন করছে বলে জানিয়েছে একটি মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর ওয়েফার উৎপাদক কোম্পানি।
চীনভিত্তিক একটি জার্মেনিয়াম উৎপাদক কোম্পানি বলেছে রাতারাতি দাম বেড়ে যাওয়ায় খোঁজ নিতে শুরু করেছে তাদের গ্রাহকরা।
“আমেরিকার অবরোধের এমন একটি বিন্দুকে চীন লক্ষ্য করেছে যেখানে আঘাত লেগেছে সবচেয়ে বেশি।” – বলেছেন চীনের গ্লোবাল মাইনিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান পিটার আর্কেল। আমেরিকার বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেফ্রিসের বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেছেন আসন্ন সপ্তাহে মার্কিন ট্রেজরি সেক্রেটারি জ্যানেট ইয়েলেনের চীন সফরের দিকে। এখন দেখার বিষয় যুক্তরাষ্ট্র এই সফরকে বাতিল করে কিনা।
১২ বছর আগে চীন জাপানের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে দেশটিতে দুষ্প্রাপ্য ধাতু রপ্তানি আটকে দিয়েছিলো, সে ঘটনা উল্লেখ করে ইন্ডাস্ট্রির কয়েকটি সূত্র বলেছে, তারা আশংকা করছিলেন এই নিষেধাজ্ঞাটি আবার আসবে। দুষ্প্রাপ্য ধাতু মূলত বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সমরাস্ত্রে ব্যবহৃত হয় এবং এখন পর্যন্ত সেগুলোর শীর্ষ উৎপাদক দেশ চীন।
“গ্যালিয়াম এবং জার্মেনিয়াম হচ্ছে এমন দুষ্প্রাপ্য ধাতু যেগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য খুবই জরুরী, আর চীন সেগুলোর শীর্ষ উৎপাদক। রাতারাতি কিংবা অদূর ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশ সে চাহিদা পূরণ করে ফেলতে পারবে, সে আকাঙ্খা করা হবে একটি অলীক কল্পনা মাত্র।” –বলেছেন আর্কেল।
গ্যালিয়াম এবং জার্মেনিয়ামে চীন বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদক এবং দেশটির কাস্টমসের নথি বলছে ২০২২ তাদের শীর্ষ গ্যালিয়াম আমদানিকারক ছিলো জাপান, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস। অন্যদিকে জার্মেনিয়ামে আছে জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
রপ্তানি অনুমোদন, বিপত্তির আশংকা
চীনে কারখানা আছে এমন মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর ওয়েফার প্রস্তুতকারক কোম্পানি এক্সটি সোমবার বলেছে গ্যালিয়াম এবং জার্মেনিয়ামজাত পণ্যের রপ্তানি চালিয়ে যেতে তাদের অধীনস্ত চীনা কোম্পানি টংমেই এর মাধ্যমে তারা আনুমোদন চাইবে।
“আমাদের গ্রাহকদের সম্ভব্য বিভ্রাট এড়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি” – বলেছেন এক্সটির প্রধান নির্বাহী মরিস ইয়ং।
চীনভিত্তিক একটি জার্মেনিয়াম উৎপাদক কোম্পানির একজন ব্যবস্থাপক রয়টার্সকে বলেছেন, তার কোম্পানির ইউরোপ, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাহকরা একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন এবং এই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা চালু হওয়ার আগেই তারা পণ্যগুলোর মজুত করতে চান। পণ্যগুলোর ক্রেতারা মনে করছেন রপ্তনি অনুমোদন পেতে তাদের দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে।
“এর মধ্যেই দেশি বাজারে কেজিতে ১ এক হাজার তিনশো ৮০ ডলার এবং এক হাজার পাঁচশো ডলার করে দাম বেড়ে গেছে ধাতু দুইটির”- বলেছেন তিনি।
যদিও পুরো সেক্টরই ধাতুগুলোর রপ্তানিতে এমন একটি নিষেধাজ্ঞার আশংকা করছিলো, কিন্তু যে সময়ে এটি এল সেটি সবাইকে চমকে দিয়েছে, বলেছেন তিনি।
এই নিষেধাজ্ঞাকে বড় কোনো ঝুঁকি বলছেন না তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার। তাইওয়ানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রয় লি বলেছেন প্রভাব পড়লেও তা হবে ক্ষণস্থায়ী। এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পমন্ত্রী একটি বিবৃতিতে বলেছেন তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ গ্যালিয়াম মজুদ আছে এবং আছে জার্মেনিয়ামের অন্য উৎসও।
চীনের নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বড়াতে পারে এমন আশংকায় দুষ্প্রাপ্য ধাতুগুলোর দাম বেড়ে গেছে অস্ট্রেলিয়ার বাজারেও। চীনের বাইরে এই শিল্পে পৃথিবীর বৃহত্তম উৎপাদক লাইনাসের শেয়ারের দাম বেড়েছে শতকরা চার ভাগ।
নতুন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি
গত কয়েক বছরে চীনে অত্যাধুনিক চিপ রপ্তানিতে কয়েকদফা নিষেধাজ্ঞার পর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র আরোপ করে নতুন বিধি নিষেধ যার প্রতিক্রিয়ায় চীনের এই উদ্যোগ বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
ওই একই প্রতিবেদন বলছে, চীনের সামরিক খাত যেন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নাগাল না পায় সেজন্য সামনের গ্রীষ্মে দেশটিকে আরও নতুন অবরোধ দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র এবং নেদারল্যান্ডস।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জবাবে বেইজিং গত মে মাসে তাদের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মেমোরি চিপ নির্মাতা মাইক্রনের পণ্য ক্রয়ে অবরোধ আরোপ করে।
মাইক্রন নিষেধজ্ঞার পর এই নতুন নিয়ন্ত্রণকে দেশটি দ্বিতীয় বৃহত্তম পাল্টা জবাব বলছেন জেফ্রিসের বিশ্লেষকরা।
“চীন-মার্কিন সম্পর্কে অবনতির ঝুঁকি কম নয়” বলেছেন তারা। “যদি চীন-মার্কিন সম্পর্কের এই অবস্থার পরিবর্তন না হয়, তাহলে সামনে দুষ্প্রাপ্য ধাতুতে আরও অবরোধ আসতে পারে।”
