ইরান, ইসরায়েল ও ইউক্রেইনের ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কী প্রভাব পড়তে পারে
এই পরাজয় কি ট্রাম্পকে সমঝোতার দিকে নিয়ে যাবে, নাকি নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলবে?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত গড়াতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দশকের পর দশক ধরে চলে আসা পররাষ্ট্রনীতি উল্টে দিচ্ছেন, যা শত্রু-মিত্র উভয় পক্ষকেই অস্থির করে তুলেছে। এখন, উভয় পক্ষই গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এটি দেখার জন্য যে নিজ দেশে নির্বাচনী বিপর্যয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পদক্ষেপগুলোর ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলে।
সিএনএন লিখেছে, ইরান, ইসরায়েল এবং ইউক্রেনের জন্য এই নির্বাচনের গুরুত্ব শুধুমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে তার চেয়েও অনেক বেশি। এই ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে ট্রাম্প তেহরানের সাথে কোনো চুক্তির দিকে হাটবেন নাকি আরও যুদ্ধের দিকে যাবেন, ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সমর্থন কতটা হ্রাস পাবে এবং রাশিয়ার যুদ্ধ অবসানের শর্তগুলো মেনে নিতে তিনি কিইভকে কতটা চাপ দেবেন।
ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ডেমোক্র্যাটদের হাতে এখন নতুন হাতিয়ার থাকবে। তবে পররাষ্ট্রনীতিতে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এখনও যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করবেন। ফলে বিশ্ব নেতাদের মনে এখন যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হল, এই পরাজয় কি তাকে সমঝোতার দিকে নিয়ে যাবে, নাকি নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আরও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলবে?
শান্তির নিশ্চয়তা ছাড়াই ইরানের উল্লাস
ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ধাক্কায় উল্লাস প্রকাশ করছে ইরান, কিন্তু পরবর্তীতে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা- সেটি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সম্ভাব্য নতুন হামলা অথবা একটি নতুন চুক্তির প্রচেষ্টা।
ট্রাম্প ফক্স নিউজের সাথে একটি ফোনালাপে স্বীকার করেছেন, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে আংশিকভাবে ইরানের যুদ্ধ দায়ী। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরও স্পষ্ট করে বুধবার এক্স-এ একটি দীর্ঘ পোস্টে লিখেছেন, "আমাদের পরাজয়ের কারণ হল এই যুদ্ধ।"
মার্কিন ভোটারদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে দীর্ঘ আট মাস ধরে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক, যোগাযোগ ও বাণিজ্য পথগুলোতে আঘাত করার পর, তেহরান রিপাবলিকানদের এই পরাজয়কে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনগণের রায় হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধজনিত মূল্যবৃদ্ধি এই পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবফ এক্স-এ লিখেছেন, "যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি আন্তর্জাতিক অর্থদাতা ও ব্ল্যাকমেইলারদের সেবা করার জন্য তাদের জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তারা বুঝতে পারবে যে আমাদের ‘না’ এর সঙ্গে দুঃস্বপ্নও জড়িয়ে আছে।”
তেহরান অবশ্য ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে না। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই বলেছেন, যারা বিশ্বাস করে এই ফলাফল মার্কিন নীতি পরিবর্তন করবে তারা ‘গুরুতর ভুলের মধ্যে আছেন’।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে না। তাই তারা কূটনীতি জোরদার করার পাশাপাশি আরও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
উত্তেজনা বৃদ্ধির এ আশঙ্কা পুরোপুরি বাস্তব। ট্রাম্প নতুন করে আরও তীব্র হামলার নির্দেশ দিতে পারেন, এমন খবর পুরো অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তেহরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ আগের পর্বগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক হবে।
চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন যে তিনি ইরানে জোরালো আঘাত হানার কথা ভাবছেন, আবার অন্যদের বলেছেন যে অবিলম্বে উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি বায়েজ সিএনএন-কে বলেছেন, "ইরান যুদ্ধ তার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি স্পষ্ট পথ খোলা: সম্মান বাঁচিয়ে একটি চুক্তি করা এবং নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করা অথবা ফের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সামরিক শক্তি দ্বিগুণ করা।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আশঙ্কা হল, ব্যালট বাক্সে দুর্বল হয়ে পড়া একজন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের মুক্তি খুঁজতে পারেন।"
কূটনীতি অবশ্য আরেকটি বিকল্প দেখায়। গ্রীষ্মকালে স্থবির হয়ে পড়া আলোচনা গত সপ্তাহে আবার গতি পেয়েছে। তেহরান কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের কাছে কর্মকর্তা পাঠিয়েছে, যারা ওয়াশিংটনের সাথে প্রস্তাবগুলো আদান-প্রদান করছে। নির্বাচনের আগে ইরান প্রস্তাব দিয়েছিল যে, ট্রাম্প যদি তাদের সাতটি শর্ত মেনে নেন, তবে তারা দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে।
চ্যাথাম হাউসের সানাম ওয়াকিল বলেছেন, ইরানের নেতৃত্ব হয়তো ‘নিজেদের সঠিক প্রমাণ করতে পেরেছে বলে মনে করতে পারে’, কিন্তু এটি ‘অবশ্যই তাদের সমস্যার সমাধান করছে না’।
তিনি বলেন, ট্রাম্পের একটি কূটনৈতিক জয় প্রয়োজন হলেও তিনি নিজেকে দুর্বল হিসেবে জাহির করতে নারাজ হতে পারেন, অন্যদিকে তেহরান তার এই ধাক্কাকে আরও বড় ছাড় দাবি করার সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। ট্রাম্প সামরিক হুমকির পাশাপাশি জোরদার কূটনীতির প্রত্যাশা করছেন, যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির চেয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি ‘বেশি বাস্তবসম্মত’।
আরও আসছে…
