প্রাণের খোঁজে প্রথম মঙ্গলের চাঁদে যাচ্ছে জাপানি মহাকাশযান
এ মিশনে মহাকাশযানটিতে মোট ১৩টি বিশেষ বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম থাকছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ উদ্যোগে তৈরি বিশেষ রোভার।
মঙ্গলের রহস্যময় উপগ্রহ থেকে প্রথমবারের মতো মাটির নমুনা সংগ্রহ করতে ঐতিহাসিক এক আন্তর্জাতিক মিশন পরিচালনা করছে জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, এরই মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহের আলু আকৃতির দুই ক্ষুদে উপগ্রহের অন্যতম ‘ফোবোস’ থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহের লক্ষ্যে বিশ্বের প্রথম মহাশূন্য অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে জাপান।
মঙ্গলবার ‘মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন’ বা এমএমএক্স নামের মিশনটি সংস্থাটির নতুন ফ্ল্যাগশিপ রকেট ‘এইচ৩’-এর মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে ‘জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি’ বা জাক্সার।
প্রায় পাঁচ বছর মেয়াদী এ বৈজ্ঞানিক অভিযান ফোবোস ও তার ছোট ভাই ‘ডিমোস’-এর তৈরি রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি সৌরজগতে প্রাণের উৎপত্তি সম্পর্কেও নতুন আলো ফেলবে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
মিশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইয়াসুহিরো কাওয়াকাতসু বলেছেন, ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযানের ঘাঁটি বা বেইস ক্যাম্প হিসেবে ফোবোসকে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে এই নমুনায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলবে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ শীর্ষ দেশগুলো মঙ্গলে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
কাওয়াকাতসু বলেছেন, “গুরুত্ব থাকার পরও মঙ্গলের উপগ্রহগুলো কখনোই পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। সৌরজগতের এখনও অনাবিষ্কৃত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিখরগুলোর একটি এসব উপগ্রহ।”
জাপানের নেতৃত্বাধীন এই আন্তর্জাতিক মিশনে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি জাতীয় মহাকাশ সংস্থা সরঞ্জাম ও যোগাযোগ সহায়তায় অংশ নিচ্ছে।
১৯৬০-এর দশক থেকে মঙ্গলে ডজন ডজন মিশন পাঠানো হলেও এর দুই উপগ্রহ নিয়ে রহস্য কাটে নি। ২০১১ সালসহ ফোবোসে অবতরণে রাশিয়ার নেওয়া একাধিক প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
গ্রীক পৌরাণিক ভীতি ও সন্ত্রাসের দুই দেবতা ফোবোস ও ডিমোসের নামে দুই উপগ্রহের নামকরণ করেন বিজ্ঞানীরা।
ক্রেটারে ভরা আলু আকৃতির উপগ্রহ দুটি কীভাবে তৈরি হয়েছে তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্কও রয়েছে।
কারো ধারণা, মঙ্গলের সঙ্গে বড় কোনো বস্তুর সংঘর্ষের ফলে তৈরি ধ্বংসাবশেষ থেকে এগুলো তৈরি। আবার অন্যদের মতে, এগুলো বাইরে থেকে আসা কোনো গ্রহাণু, যা মঙ্গলের মহাকর্ষে আটকে গেছে।
জাক্সার শীর্ষ গবেষক কিওশি কুরামোতো বলেছেন, “মাটির নমুনা বিশ্লেষণ করে আমরা এবার নিশ্চিত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।”
ফোবোসকে বেছে নেওয়ার মূল কারণ এটি ডিমোসের তুলনায় মঙ্গলের অনেক কাছে অবস্থান করছে। ফলে এর মাটিতে মঙ্গল গ্রহের উপাদান থাকার সম্ভাবনা বেশি।
জাক্সা বলছে, সংগৃহীত নমুনার প্রায় ০ দশমিক ১ শতাংশ মঙ্গল গ্রহের মূল পদার্থের অংশ হতে পারে। ফোবোস চওড়ায় প্রায় ২৭ কিলোমিটার ও এটা মঙ্গল গ্রহ থেকে কেবল ৬ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে দিনে তিনবার গ্রহটিকে প্রদক্ষিণ করে।
বিজ্ঞানী কুরামোতো বলেছেন, ফোবোস থেকে আনা মাটির নমুনা একইসঙ্গে এর ছোট ভাই ‘ডিমোস’-এর উৎপত্তি সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা দেবে। কারণ ধারণা করা হয়, দুটি উপগ্রহের গোড়াপত্তন হয়েছিল একইভাবে।
নমুনা সংগ্রহের মূল অভিযানের পাশাপাশি যানটি ডিমোসের কাছাকাছি উড়ে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করবে।
পৃথিবী থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলের সবচেয়ে নিকটতম দূরত্ব প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ কিলোমিটার হলেও যানটিকে দীর্ঘ বাঁকা পথ পাড়ি দিতে হবে। ফলে এর প্রকৃত ভ্রমণ দূরত্ব দাঁড়াবে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি কিলোমিটার।
এইচ৩ রকেটে করে মহাকাশে উড়াল দেওয়ার পর যানটি ২০২৭ সালের অগাস্ট নাগাদ মঙ্গলের কক্ষে পৌঁছাবে।
এরপর তা পরবর্তী তিন বছর ধরে ফোবোসের চারপাশ ঘুরে ডেটা ও নমুনা সংগ্রহ করবে ও ২০৩১ সালে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে রওনা দেবে।
সম্পূর্ণ ‘এমএমএক্স’ মহাকাশযানটি তিনটি প্রধান মডিউলে বিভক্ত, প্রপালশন (চালনা), এক্সপ্লোরেশন (অভিযান) ও রিটার্ন (প্রত্যাবর্তন)। এর মধ্যে কেবল তৃতীয় মডিউলটি সংগৃহীত নমুনা সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীতে ফিরবে।
যানটিতে মোট ১৩টি বিশেষ বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম থাকছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ উদ্যোগে তৈরি বিশেষ রোভার, যা ফোবোসের মাটিতে নামবে।
এ ছাড়া, নাসার তৈরি একটি নমুনা সংগ্রাহক ডিভাইস ও গামা-রশ্মি পরিমাপক যন্ত্র এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ডিপ-স্পেস যোগাযোগ প্রযুক্তি যোগ করা হয়েছে।
পাশাপাশি, জাপানের নিজস্ব রেডিয়েশন মনিটর এতে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানব অভিযানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য জোগাবে।
ফরাসি-জার্মান রোভার ‘আইডিফিক্স’ ২০২৯ সালের দিকে প্রথম ফোবোসের মাটিতে অবতরণ করবে। ১০০ দিনের এ বিশেষ মিশনে এটা উপগ্রহটির পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করবে, যেন পরবর্তীতে জাপানি যানের মাটি সংগ্রহের কাজটি সহজ হয়।
রোভারের পাঠানো ভৌগোলিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জাক্সার যানটি অবতরণের জন্য অপেক্ষাকৃত সমতল জায়গা বেছে নেবে।
অবতরণের পর মার্কিন ও জাপানি দুই ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্তত ১০ গ্রাম মাটি সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন জাক্সার বিজ্ঞানীরা।
নাসা’র যন্ত্রটি উচ্চচাপের গ্যাস ব্যবহার করে পৃষ্ঠের ধুলাবালি পাত্রে তুলবে, অন্যদিকে জাক্সার ড্রিলিং প্রযুক্তি মাটির প্রায় ২ সেন্টিমিটার গভীর থেকে নমুনা কাটবে।
প্রথম দফায় পৃষ্ঠ ও গভীর উভয় অংশের মাটি নেওয়া ও দ্বিতীয়বার অবতরণ করে আরও গভীরের নমুনা তোলা হবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, একাধিক স্থান থেকে সংগৃহীত মাটি মঙ্গলে অতীতের কোনো অণুজীবের অস্তিত্ব ছিল কি না, তার ঐতিহাসিক সূত্রও দিতে পারে।
তবে পৃথিবীর কেবল ২০০০ ভাগের এক ভাগ মাধ্যাকর্ষণ বল থাকা এ বন্ধুর উপগ্রহে নামা ঝুঁকিপূর্ণ।
অবতরণের সময় মহাকাশযানটি যেন ধাক্কা খেয়ে ছিটকে না যায় সে জন্য এর এক্সপ্লোরেশন মডিউলটিতে বিশেষ ধাক্কা নিরোধক চার পায়ের ল্যান্ডিং গিয়ার যোগ করেছে জাক্সা।
