Published : 25 Aug 2026, 03:14 PM
পুরোপুরি বা প্রধানত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা কোনো গান অস্ট্রেলিয়ার অফিশিয়াল মিউজিক চার্টে আর স্থান পাবে না।
বিবিসি লিখেছে, দেশটির সংগীত অঙ্গনে স্বচ্ছতা ও মানুষের মৌলিক সৃজনশীলতা ধরে রাখতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে তা অবিলম্বে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।
এ সপ্তাহ থেকে নতুন এই নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এখন থেকে অস্ট্রেলিয়ার চার্টে জায়গা করে নিতে হলে যে কোনো গান বা অ্যালবামকে ‘ব্যাপকভাবে মানুষের তৈরি’ হতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ান রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন বা আরিয়া বলেছে, কৃত্রিম মেধার ভিড়ে এ নতুন নিয়ম ‘শিল্প ও সংগীতের মূল মানব সত্তাকে উৎসাহিত করতে’ সহায়তা করবে।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ডিজে জশ ফাওয়াজের তৈরি পপ তারকা ম্যাডোনার বিখ্যাত গান ‘লাইক এ প্রেয়ার’-এর একটি কভার সংস্করণ নিয়ে সংগীতাঙ্গনে চরম বিতর্ক তৈরি হয়। সেই ঘটনার জেরেই নীতিমালায় এ পরিবর্তন।
গানটি মুক্তি পাওয়ার পর পরই আরিয়া ডান্স সিঙ্গেলস চার্টের শীর্ষে উঠে আসে এবং দেশটির সার্বিক মূল চার্টেও দ্বিতীয় স্থান দখল করে নেয়।
কেবল চার্টেই নয়, গানটি বাণিজ্যিক রেডিও স্টেশনগুলোর প্লে-লিস্টের নিয়মিত তালিকায় জায়গা পায় ও জনপ্রিয় মিউজিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম স্পটিফাই’তে ৪ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি বার শোনা হয়।
পরবর্তীতে ব্যাপক আলোচনা ও সংগীতপ্রেমীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন ফাওয়াজ। বাধ্য হয়ে তিনি বলেছেন, এতে জেনারেটিভ এআই ব্যবহৃত হয়েছে ও গানে এআইয়ের ক্রেডিটও যোগ করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে আরিয়া বলেছে, অস্ট্রেলিয়ান শিল্পীরা এই মুহূর্তে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে ভিড় ঠাসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাজারে’ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন।
“এআই দিয়ে তৈরি যেসব গানে মানুষের শৈল্পিক ছোঁয়া নেই সেগুলোর সাফল্য উদযাপন বা প্রচার করতে আরিয়া বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়।”
তবে নতুন এ কঠোর নিয়মের ফলে গান তৈরিতে প্রযুক্তি বা এআইয়ের সামান্য সহায়তামূলক ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
নিয়ম অনুসারে, গান তৈরিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে। তবে মূল গানটি অবশ্যই কোনো মানুষের লেখা হতে হবে। পাশাপাশি গানের লিড ভোকালিস্ট ও মূল বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র অবশ্যই মানুষের সরাসরি পরিবেশনায় হতে হবে।
প্রযোজনা ও প্রযুক্তিগত কাজের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় থাকছে। গানের চূড়ান্ত সাউন্ড মাস্টারিং, ড্রামসের সঠিক ব্যবহার বা অটো-টিউনের মতো বিষয়গুলোতে এখনও এআই ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত থাকছে।
অস্ট্রেলিয়ার এ উদ্যোগ বিশ্ব সংগীতাঙ্গনে প্রথম নয়। এ বছরের শুরুতে সুইডেনের মূল মিউজিক চার্ট থেকেও এআই দিয়ে বানানো একটি গান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মহলেও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক এই পরিবর্তনের ঢেউ বইছে।
জুলাইয়ে বিশ্বের প্রধান প্রধান রেকর্ড লেবেলের প্রতিনিধিত্বকারী ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ দ্য ফোনোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রি’ বা আইএফপিআই বলেছে, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অফিশিয়াল চার্টগুলোতেও খুব শিগগিরই এআই সম্পর্কিত নির্দিষ্ট নির্দেশিকা ও কড়া নীতিমালা চালু হবে।
আইএফপিআই-এর আন্তর্জাতিক নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে প্রণীত এ আপডেটেড নীতিমালায় কেবল এআই নয়, যেসব গান ‘স্ট্রিমিং বা চার্ট কারচুপির সংশয়’ তৈরি করে, সেগুলোকে ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
আরিয়া’র প্রধান নির্বাহী অ্যানাবেল হার্ড বলেছেন, “সবচেয়ে কম করে বললেও দ্রুত পরিবর্তনশীল এই ডিজিটাল প্রেক্ষাপটে সংগীতের মূল সত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে ও গতিশীল থাকতে আমাদের যে সদিচ্ছা এসব পরিবর্তন তারই প্রতিফলন।
“শিল্পীরা তাদের কাজে এরইমধ্যে এআই টুল ব্যবহার করছেন। এসব চার্টেরও সেই অনুসারে বিবর্তন ঘটা উচিত এবং সেই চর্চার সুযোগ থাকা দরকার। কিন্তু অন্য শিল্পীদের রেকর্ড করা গানের ওপর ভিত্তি করে প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে পুরোপুরি এআই দিয়ে তৈরি গান একেবারেই ভিন্ন একটি বিষয়।”
নতুন নিয়ম অনুসারে, চার্টে অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার সময়ই শিল্পীদের এআই ব্যবহারের তথ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে।
আরিয়া বলেছে, চার্টে নাম ওঠার পর যদি প্রমাণ মেলে, কোনো গান প্রধানত এআই দিয়ে তৈরি তবে রেট্রোস্পেক্টিভ বা পেছনের তারিখ থেকে চার্টের অবস্থান সামঞ্জস্য করা হতে পারে। সেই গানটি চার্টের ১ নম্বরে থাকলে এক নম্বর স্থান পাওয়ার জন্য দেওয়া সম্মাননা বা পুরস্কার ফেরত চাওয়ার এখতিয়ারও থাকবে তাদের।
তবে যেসব শিল্পী বা প্রতিনিধি এ সিদ্ধান্তের মুখে পড়বেন তাদের এই বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপিল বা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ইলেকট্রনিক মিউজিক ব্যান্ড ‘পিকিং ডাক’সহ দেশটির শীর্ষসারির অনেক সংগীতশিল্পী ও দল এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। গেল মাসে নিজেদের হিট গান ‘হাই’-এর একটি এআই-সহায়তায় তৈরি সংস্করণ ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছিল দলটি।
এদিকে, এ বছরের জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ দেশের শিল্পীদের স্বার্থে এআইয়ের ঝুঁকি থেকে ‘সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অ্যালবানিজ বলেছেন, এআই মডেল প্রশিক্ষণে তাদের কাজ কীভাবে বা কতটুকু ব্যবহৃত হবে তা নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার থাকবে লেখক ও সুরকারদের। শিল্পীরা যদি সেই নিয়ন্ত্রণ হারান ও কাজের যথাযথ সম্মানী না পান তবে সেটি সরাসরি ‘চুরি’ হিসেবে বিবেচিত হবে।