Published : 29 Jul 2026, 04:01 PM
কফি, ঘুম ও কাজের চিন্তা নিয়ে কাটে আধুনিক মানুষের দৈনন্দিন জীবন। প্রতিনিয়ত মাথায় ঘুরপাক খাওয়া এ ভাবনার ওপর ভিত্তি করে মানুষদের চার ভাগে ভাগ করেছেন গবেষকেরা।
সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মানুষের মন কীভাবে কাজ করে তার ওপরই নির্ভর করে জীবন নিয়ে তার সন্তুষ্টি ও সুখের মাত্রা। কাজ, এক কাপ কফির চাহিদা ও বিছানায় ফিরে ঘুমাতে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছাই মানুষের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, গবেষণায় মানুষের চিন্তা ভাবনার ধরন অনুসারে চারটি ভিন্ন দলের সন্ধান পাওয়া গেছে। একদল মানুষ বিশ্বের নানা সমস্যা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন, দ্বিতীয় দল গৃহস্থালির কাজ ও সংসারের হিসাব-নিকাশ নিয়ে মশগুল থাকেন, তৃতীয় দল নিজেদের মন ও দেহের যত্ন নিয়ে ভাবেন। চতুর্থ দলটি ক্যারিয়ার ও বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে জীবন উপভোগ করায় বিশ্বাসী।
গবেষকরা বলছেন, এ শ্রেণিবিন্যাস চূড়ান্ত নয় এবং মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এক চিন্তাধারা থেকে অন্য চিন্তাধারায় পরিবর্তনও হতে পারে। তবে দৈবচয়ন বা র্যান্ডম পদ্ধতিতে চিন্তার তথ্য সংগ্রহ করে মানুষের মনের জটিল সব ভাবনার ধরন উন্মোচিত করা সম্ভব তা এ গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চালান ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ক্লেয়ারমন্ট গ্রাজুয়েট ইউনিভার্সিটি’ ও চীনের হুবেই প্রদেশের ‘উহান ইউনিভার্সিটি’র একদল অর্থনীতিবিদ। মানুষের সচেতন মন কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব দেখেই তারা এ কাজে উদ্যোগী হয়েছেন।
গবেষণার অন্যতম জ্যেষ্ঠ লেখক ড. জোশুয়া তাসফ বলেছেন, “মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্বের অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের মনের ভেতরে কী চলছে তার ওপর। অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমরা যে বিষয়টি নিয়ে আগে সেভাবে নজর দিইনি এটা খুবই বিস্ময়কর।”
এ গবেষণার জন্য ১৯ থেকে ৭১ বছর বয়সী ২৫৮ জন স্বেচ্ছাসেবককে বিশেষ এক মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়। দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন আটবার র্যান্ডমভিত্তিতে অ্যাপটিতে সংকেত বা ‘বিপ’ বেজে উঠত।
বিপ বাজার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের তাৎক্ষণিক চিন্তাভাবনা সেই মুহূর্তে তারা কী করছিলেন এবং তাদের আনন্দের মাত্রা কেমন ছিল তা অ্যাপে লিখে জানাতে হত।
এভাবে ২৩ হাজারের বেশি রিয়াল-টাইম তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বলছেন, মানুষের চিন্তা দিনের নির্দিষ্ট সময়ের ওপর নির্ভর করে বদলায়। দিনের বেলায় চিন্তাজগৎজুড়ে থাকে কর্মক্ষেত্র আর সন্ধ্যার দিকে তা মোড় নেয় বিনোদনের দিকে।
মানুষের মোট চিন্তার প্রায় অর্ধেকই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ইচ্ছাকৃত, আর বাকি অর্ধেক ভাবনা অহেতুক বা অন্য কোনো চিন্তার সূত্র ধরে মাথায় এসে ভিড় করে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ক্লান্তি ও ঘুমের অনুভূতির মতো শারীরিক তথ্য ও মানসিক নানা অনুভূতি মিলিয়ে মোট চিন্তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ দখল করে রাখে।
এরপরেই সবচেয়ে বেশি চিন্তা আসে কাজ নিয়ে ১৭ শতাংশ এবং খাবার নিয়ে ১৪ শতাংশ ঘিরে। আর শখ, খেলাধুলা, শিল্পকলা ও বিনোদন নিয়ে প্রায় ১০ শতাংশ এবং সম্পর্কের ভাবনায় সমপরিমাণ ১০ শতাংশ সময় ব্যয় করেন মানুষ।
মানুষ কী চায় এ বিষয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষার প্রায় অর্ধাংশই জুড়ে ছিল খাবার বা পানীয়, বিশেষ করে এক কাপ কফি পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা। প্রয়োজনের তালিকায় ২৯ শতাংশ মানুষ বিরতি বা একটু বিশ্রামের পথ খুঁজেছেন, যেখানে ঘুমানো বা ন্যাপ নেওয়ার ইচ্ছাই ছিল শীর্ষে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, মানুষের মন প্রায় কখনোই সম্পূর্ণ শূন্য থাকে না, কেবল এক শতাংশের মতো উত্তরদাতা বলেছেন, এই মুহূর্তে তাদের মাথায় কিছু চলছে না। তবে যৌনতা সংক্রান্ত চিন্তার উপস্থিতি ছিল আশঙ্কাজনকভাবে কম, যা দেখে গবেষকরা বলছেন, অনেকে হয়ত লজ্জা বা সংকোচের কারণে সত্যটি প্রকাশ করেননি।
এ গবেষণার অন্যতম লেখক তাসফ রসিকতা করে বলেছেন, “কিছু বিষয় হয়ত মানুষ গবেষকদের সঙ্গে শেয়ার করতে চান না, যাকে বলে ‘টু মাচ ইনফরমেশন’ বা টিএমআই।”
পিয়ার-রিভিউ’র অপেক্ষায় থাকা এ গবেষণাপত্রটিতে বলা হয়েছে, হয়ত এ সংকোচের কারণে প্রতি চারটির একটি নোটিফিকেশনের কোনো উত্তরই দেননি অংশগ্রহণকারীরা।
রোমান সম্রাট ও দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াসের বিখ্যাত উক্তি, “আপনার জীবনের সুখ নির্ভর করে আপনার চিন্তার গুণমানের ওপর”, এ গবেষণায় সেই দর্শনের সত্যতাই প্রমাণ করেছেন গবেষকরা।
তারা প্রমাণ পেয়েছেন, মানুষের বর্তমান ভাবনাই তার সুখের মাত্রা নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। গবেষকদের কথায়, ‘মার্কাস অরেলিয়াস ঠিক কথাই বলে গিয়েছিলেন’।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এসব ফলাফলকে বিশ্বজুড়ে সবার জন্য এক করে দেখা যাবে না। কারণ গবেষণায় অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকেরা ছিলেন পশ্চিমা, শিক্ষিত, শিল্পোন্নত, ধনী ও গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্ত, যাদের মনস্তত্ত্ব বিশ্বের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদাও হতে পারে।
চার ধরনের চিন্তাবিদ
মানুষের সচেতন ভাবনার বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা চিন্তাভাবনাগুলোকে প্রধানত চারটি দলে ভাগ করেছেন। তবে এ শ্রেণিবিভাগ চূড়ান্ত নয় এবং একজন মানুষ জীবনের বিভিন্ন সময়ে এক ধরন থেকে অন্য ধরনের চিন্তাভাবনায় চলে যেতে পারেন।
এ গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক তাসফ বলেছেন, এ ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
এসব দল মানুষের ভাবনার মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান বা পেশার ওপর নয়। ভিন্ন ভিন্ন দলের মানুষ একই ধরনের কাজকর্ম করেছেন এবং বয়স, আয় বা শিক্ষার মতো জনসংখ্যার বিচারে দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য ছিল সামান্য।
১. চিন্তিত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত
এ দলের মানুষ বিশ্ব পরিস্থিতি, রাজনীতি ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে সাধারণের চেয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি চিন্তা করেন। যুদ্ধ, মহামারী ও অন্যান্য বড় ঘটনা নিয়ে তাদের মন ব্যাকুল থাকে।
নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনাও ছিল সাধারণের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। তাদের ভাবনায় যেসব শব্দ বারবার উঠে এসেছে তা হল, কোভিড, জেগে থাকা, একা, ব্যথা, ক্ষুধা ও ক্লান্তি। তবে এসব মানসিক চাপ কাটাতে তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে দ্বিগুণ সময় গান শোনার কথা ভেবেছেন।
২. সংসার ও সাংসারিক
বাস্তবমুখী ও গৃহস্থালি বিষয়ে মনোযোগ বেশি থাকে এ দলের মানুষদের। গৃহস্থালির কাজ, বাসা, অর্থকড়ির হিসাব ও বই, সিনেমা বা টিভির গল্পের মতো বিষয়গুলোতে সাধারণের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি চিন্তা করেন তারা।
এসব মানুষদের ভাবনায় ব্যবহৃত শব্দগুলো ছিল বৈচিত্র্যময়। যেমন সমাধান, প্রক্রিয়া, বিতর্ক ও নথিপত্র।
৩. শরীর ও মনকেন্দ্রিক
নিজের অনুভূতি, পঞ্চেন্দ্রিয় ও বিশ্ব সম্পর্কে নিজেদের মানসাসিক ধারণা নিয়ে অন্য যেকোনো দলের চেয়ে এরা বেশি ভাবেন। এ দলের গড় বয়স ৩২ বছর এবং দুই-তৃতীয়াংশই নারী।
অনিচ্ছাকৃত বা অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তার হার এই দলেই সবচেয়ে বেশি ২৮ শতাংশ। তাদের বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলোর মধ্যে রয়েছে, থেরাপিস্ট, যন্ত্রণা ও বিষণ্নতা।
গবেষকরা বলছেন, এমনটা তাদের জীবনযাপনের একটি সাময়িক ধাপও হতে পারে। ঋতুচক্রের প্রভাব বা শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে এ সময়ে দেহ, উপসর্গ ও চিকিৎসার দিকে তাদের মনোযোগ বেশি ছিল।
৪. ‘ওয়ার্ক-হার্ড, প্লে-হার্ড’
এসব মানুষদের ভাবনা কাজ ও বিনোদনের মধ্যে সমানভাবে বিভক্ত। চাকরি বা কাজ নিয়ে সাধারণের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি ভাবার পাশাপাশি শখ, খেলাধুলা ও শিল্পকলা নিয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি ভাবেন।
সবকটি দলের মধ্যে তাদের আয় ও আনন্দের মাত্রা বেশি এবং এ দলে নারীদের চেয়ে পুরুষের সংখ্যা কিছুটা বেশি। তাদের চিন্তায় উঠে আসা প্রধান শব্দগুলো ছিল বিশ্রাম, প্রেজেন্টেশন, ফ্লাইট, প্রজেক্ট ও জিম।