৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

চীনের মহাকাশ কূটনীতি: কক্ষপথে যাচ্ছেন পাকিস্তানি নভোচারী

ইউরি গ্যাগারিনের প্রথম ফ্লাইটের পর থেকে প্রায় ৫০টি দেশের নাগরিক মহাকাশে ভ্রমণ করেছেন। তবে, নিজস্ব মানববাহী মহাকাশযান নিয়ে মহাকাশ জয় করেছে কেবল রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।

চীনের মহাকাশ কূটনীতি: কক্ষপথে যাচ্ছেন পাকিস্তানি নভোচারী

মিশন সফল হলে দক্ষিণ এশীয় দেশটির কোনো নাগরিকের এটাই হবে প্রথম মহাকাশ পদচারণা। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Sep 2026, 12:06 PM

Updated : 30 Sep 2026, 12:06 PM

চীনের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে প্রথম বিদেশি নভোচারী হিসেবে ইতিহাস গড়ার চূড়ান্ত মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছেন দুই পাকিস্তানি পাইলট।

ম্যান্ডারিন ভাষা মুখস্থ করা, সেন্ট্রিফিউজ ড্রিলের মাধ্যমে তীব্র গ্রাভিটি সহ্য করার অনুশীলন ও জিরো মাধ্যাকর্ষণে আহার, নিদ্রা ও যন্ত্রপাতি সারানোর মতো কৌশল শিখছেন তারা।

এ বছরের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষদিকে এই দুই পাইলটের মধ্য থেকে একজন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হবেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।

পাকিস্তানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘স্পার্কো’র মানব মহাকাশ ফ্লাইট সহযোগিতার প্রধান আমের গিলানি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

মিশন সফল হলে দক্ষিণ এশীয় দেশটির কোনো নাগরিকের এটাই হবে প্রথম মহাকাশ পদচারণা।

উদ্যোগটি বেইজিংয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের বড় সহযোগিতারই অংশ, যার আওতায় এর আগে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর পাশাপাশি চীনা রকেটে পাকিস্তানি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, যৌথ স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন সিস্টেম ও ২০২৮ সালের দিকে চীনের ‘চ্যাংই-৮’ চন্দ্র মিশনে পাঠানোর জন্য একজন পাকিস্তানি রোভার তৈরির কাজ চলছে।

পাকিস্তানের প্রাথমিক পর্বে বাছাই করা প্রায় ২০ জন পাইলট ও বিজ্ঞানীর মধ্যে থেকে কঠোর চিকিৎসাগত ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা ও উচ্চ জি-ফোর্সের চাপ সহ্য করার ক্ষমতার ভিত্তিতে চূড়ান্ত হন পাইলট জিশান আলী ও খুররম দাউদ।

স্পার্কোর এআই বিভাগের পরিচালক উজাইর আনসারি বলেছেন, “বিজ্ঞানীদের পক্ষে উচ্চ স্তরের জি-ফোর্সের মুখে পড়া ও ভ্রমণ করার বিষয়টি সহজে হজম করা সম্ভব নয়।”

এ কারণেই উচ্চ গতির ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই দুই পাইলটকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

আমের গিলানি বলেছেন, বেইজিংয়ের ‘চায়না অ্যাস্ট্রোনাট রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেইনিং সেন্টার’-এ গত কয়েক মাস ধরে কঠোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এই দুই পাইলট।

২০১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে মিশনটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে চীন এখনও প্রকাশ করেনি এই দুজনের মধ্যে ঠিক কাকে মহাকাশে পাঠানো হবে বা উৎক্ষেপণটি কবে নাগাদ হবে।

নির্বাচিত প্রার্থী মহাকাশে পাড়ি জমানোর আগে আর পাকিস্তানে ফিরবেন না, বরং সরাসরি চীন থেকেই মহাকাশযাত্রায় অংশ নেবেন ও পৃথিবীতে ফিরে আসার পর নির্দিষ্ট রিকভারি বা সুস্থতার মেয়াদ শেষে দেশে ফিরবেন।

প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে নিবিড় চীনা ভাষা শিক্ষা, মহাকাশযানের জটিল সিস্টেম আয়ত্ত করা এবং কক্ষপথের মাইক্রোগ্রাভিটি ও উৎক্ষেপণের সময়কার জি-ফোর্সের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া।

পাইলটদের চীন পাঠানোর পর স্পার্কো ও বিদেশি গণমাধ্যমের কাছে এই প্রথম মহাকাশ মিশন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পেল। তবে এ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি চীনের মহাকাশ সংস্থা।

চীনা মহাকাশ মিশনে পাকিস্তানি বিজ্ঞানীর কাজ

চীনের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর পর নির্বাচিত পাকিস্তানি নভোচারী মহাকাশযান পরিচালনার পরিবর্তে দেশটির বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন।

মহাকাশ গবেষণার ভাষায় পদটিকে ‘পেলোড স্পেশালিস্ট’ বলা হয় বলে জানিয়েছেন উজাইর আনসারি।

স্পার্কোর মানব মহাকাশ ফ্লাইট সহযোগিতার প্রধান আমের গিলানি বলেছেন, করাচি, লাহোর ও ইসলামাবাদের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে এক বছরব্যাপী প্রচারণার পর স্পার্কোর কাছে তিন শতাধিক প্রস্তাব জমা পড়েছিল, সেখান থেকে চীনা ইনস্টিটিউটগুলো এ মিশনের জন্য চারটি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক বিভিন্ন জৈবপ্রযুক্তিগত পরীক্ষা।

প্রতিটি পরীক্ষামূলক প্রজেক্ট স্পার্কোর নিজস্ব ল্যাবেই তৈরি ও পূর্ব-পরীক্ষা করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে চীনা প্রকৌশলীদের চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে।

আনসারি বলেছেন, এ এমন এক বিরল ঘটনা, যেখানে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পাকিস্তানি প্রযুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই ও স্থান করে নিচ্ছে।

মহাকাশ স্টেশনের দিক থেকে বৈজ্ঞানিক পেলোডটি বেশ ছোট। কারণ তিয়ানগং স্টেশনটিতে এরইমধ্যে ১৮০টিরও বেশি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে ও এর মাধ্যমে ৫০০টিরও বেশি গবেষণা ও ১৫০টি পেটেন্ট প্রকাশ পেয়েছে।

তিয়ানগং-এর তিনটি মডিউল ‘থিয়েনহে’, ‘ওয়েনথিয়েন’ ও ‘মেংথিয়েন’-এর সম্মিলিত ওজন প্রায় ৭৭ মেট্রিক টন। এতে জীবনবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, তরল পদার্থবিদ্যা, দহন ও বিকিরণের প্রভাবসংক্রান্ত প্রায় ১৪টি পরীক্ষামূলক র‌্যাক রয়েছে।

এর মধ্যে কিছু র‌্যাক স্টেশনের বাইরে বসানো হয়েছে, যা উপাদান ও জৈবপ্রযুক্তিগত পেলোডগুলোর জন্য সরাসরি মহাকাশের সংস্পর্শে থাকে।

বেইজিংয়ের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা

এ মিশনে পাকিস্তানের নিজস্ব কোনো ক্রুওয়ালা মহাকাশযান বা উৎক্ষেপণ বাহন নেই। ফলে নির্বাচিত পাকিস্তানি নভোচারী সম্পূর্ণভাবে চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেই মহাকাশে পাড়ি জমাবেন।

তিনি চীনা মহাকাশযানে চড়বেন, চীনের লঞ্চ সাইট থেকেই উৎক্ষেপণ হবে, চীনা প্রশিক্ষকদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ও কক্ষপথ থেকে ম্যান্ডারিন ভাষায় যোগাযোগ করবেন।

মহাকাশে তার এই অবস্থান হবে এক সপ্তাহের মতো, যা চীনা নভোচারীদের প্রায় ছয় মাসের নিয়মিত মিশনের তুলনায় বেশ সংক্ষিপ্ত।

আসন্ন এ নভোচারী দুই চীনা ক্রু সদস্যের সঙ্গেই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন, যারা গত মে মাসে সেখানে গিয়েছিলেন। কারণ, তৃতীয় চীনা সদস্য দীর্ঘমেয়াদী মানব শারীরতত্ত্ব গবেষণার সুবিধার্থে এক বছর মহাকাশেই অবস্থান করবেন।

১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিনের প্রথম ফ্লাইটের পর থেকে প্রায় ৫০টি দেশের নাগরিক মহাকাশে ভ্রমণ করলেও নিজস্ব মানববাহী মহাকাশযান দিয়ে মহাকাশ জয় করেছে কেবল রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন।

চীনের এ আমন্ত্রণের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি নভোচারীকে মহাকাশে নিয়ে যাচ্ছে বেইজিং।

একই পার্টনারশিপের আওতায় পাকিস্তানকে চাঁদে কোনো নভোচারী পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আমের গিলানি বলেছেন, “এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি বা আলোচনা হয়নি। পরবর্তীতে কী হবে তা এ প্রথম মিশনের সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে।

তবে ২০২৮ সালের দিকে চীনের ‘চ্যাংই-৮’ চন্দ্র মিশনে পাঠানোর জন্য একজন পাকিস্তানি লুনার রোভার তৈরির কাজ চলছে, যা এ সহযোগিতারই আলাদা অংশ।

আনসারি বলেছেন, রোভারটি চন্দ্রপৃষ্ঠে বাধা এড়াতে, গভীরতা মাপতে ও নিজস্ব পথ নির্ধারণ করতে এআইভিত্তিক স্টেরিও ইমেজিং ব্যবহার করবে। কারণ পৃথিবী থেকে রিয়াল-টাইমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে পাকিস্তানি বিজ্ঞানীদের জন্য মিশনটিকে ‘জীবনের একবারই আসে এমন বিরল সুযোগ’ হিসেবে দেখছে স্পার্কো।