Published : 22 Sep 2025, 03:56 PM
৯৬ বছর পর অবশেষে মিশরের ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের ভাস্কর্যের হারিয়ে যাওয়া ওপরের অংশ খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
প্রায় ৯৬ বছর আগে দ্বিতীয় রামেসিসের এক বিশাল ভাস্কর্যের নিচের অর্ধেক অংশ আবিষ্কার করেছিলেন জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক গুন্থার রোয়েডার। সম্পূর্ণ পাওয়া গেলে প্রায় ২৩ ফুট উঁচু হত মূর্তিটি। দ্বিতীয় রামেসিস ছিলেন প্রাচীন মিশরের ৩১টি রাজবংশের ইতিহাসে সবচেয়ে খ্যাতিমান ফারাওদের একজন।
কায়রো শহর থেকে প্রায় একশ ৫০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত মিনিয়া প্রদেশের এল আশমুনেইন শহরের কাছে এ ভাস্কর্যটি খুঁজে পান রোয়েডার। প্রাচীনকালে এ এলাকার নাম ছিল ‘খেমনু’। নীলনদের তীরে অবস্থিত এ শহরটি পুরানো রাজবংশীয় যুগে (২৬৪৯–২১৩০ খ্রিস্টপূর্ব) একটি প্রাদেশিক রাজধানী ছিল। পরবর্তী সময়ে যখন রোমানরা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল শাসন করত তখন এ শহরটি পরিচিত ছিল ‘হারমোপলিস ম্যাগনা’ নামে।
এ অঞ্চলের গৌরবময় অতীতের বহু মূল্যবান সম্পদ আশপাশের মরুভূমিতে সমাহিত রয়েছে বলে অনেকদিন ধরেই ধারণা করা হত। রোয়েডারের এ আবিষ্কার নিঃসন্দেহে ছিল বিস্ময়কর। তবে তিনি যে বিশাল ভাস্কর্যের অংশ খুঁজে পেয়েছিলেন তার বাকি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে হারিয়ে ছিল ইতিহাসের অন্ধকারে… তবে এবার সেটি পাওয়া গেল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে নিউ ইয়র্কের জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স।
২০২৪ সালের মার্চে মার্কিন বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় মিশরের প্রত্নতত্ত্ববিদরা ঘোষণা দিয়েছেন, ৯৬ বছর পর অবশেষে রোয়েডারের আবিষ্কৃত ভাস্কর্যের হারিয়ে যাওয়া ওপরের অংশটি খুঁজে পেয়েছেন তারা।
মিশরের পর্যটন ও পুরাকীর্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ওপরের অংশটি প্রায় সাড়ে ১২ ফুট উঁচু এবং এতে দ্বিতীয় রামেসিসকে এক রাজকীয় মাথার পাগড়ি পরা অবস্থায় দেখা গিয়েছে, যার ওপরে ছিল রাজকীয় গোখরা বা ‘উরেয়াস’-এর প্রতীক।
এ আবিষ্কার দ্বিতীয়ে রামেসিসের বিশাল ভাস্কর্যকে আরও সম্পূর্ণ রূপে তুলে ধরেছে, যা প্রাচীন মিশরের রাজকীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
তবে এ প্রাচীন ভাস্কর্য আবিষ্কারের সময় অর্থাৎ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কেউ জানত না এটি আদৌ দ্বিতীয়ে রামেসিসের ভাস্কর্যেরই অংশ কি না বা এত বছর পরও এটি কতটা অক্ষত অবস্থায় রয়েছে তা নিয়েও নিশ্চিত ছিলেন না প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
এক বিবৃতিতে ‘ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো, বোল্ডার’-এর ক্লাসিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও এ গবেষণা দলের গবেষক ইভোনা ট্রনকা-আমরাইন বলেছেন, “হারমোপলিস নিয়ে বড় এক সমস্যার বিষয় হচ্ছে, এটি নীলনদের খুব কাছাকাছি অবস্থিত।
“মিশরের নীলনদে আসওয়ান লো নামের বাঁধ তৈরির পর পানির স্তর অনেক বেড়ে যায়, যা এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এ ভাস্কর্যটি ঠিকঠাক অবস্থায় থাকবে এর কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। অনেক সময় খননের পরে দেখা যায়, আমরা যেটিকে শক্ত পাথর বলে ভেবেছিলাম সেটি আসলে ক্ষয়ে যাওয়া বালুকাপাথর বা চুনাপাথর। এটিও এমনই কিছু হতে পারত।”
আরও খননের পর গবেষণা দলটি নিশ্চিত হয়, ভাস্কর্যটি বিস্ময়করভাবে ভালোভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং এর পৃষ্ঠে নীল ও হলুদ রঙের চিহ্নও মিলেছে।
গবেষকরা আশা করছেন, এ রঙের উপাদান নিয়ে আরও বিশ্লেষণ করলে ভাস্কর্যটি তৈরির প্রেক্ষাপট, অর্থাৎ এটি কোন উদ্দেশ্যে, কোথায় বা কোন সময় তৈরি হয়েছিল সে সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে পারবেন তারা। একইসঙ্গে, ভাস্কর্যটির আসল চেহারাও স্পষ্ট হবে।
এ আবিষ্কার কেবল ভাস্কর্যটির ঐতিহাসিক গুরুত্বই বাড়ায় না, বরং প্রাচীন মিশরে রঙের ব্যবহার ও শিল্পচর্চা নিয়েও নতুন তথ্য এনে দিতে পারে বলে দাবি গবেষকদের।
বিবৃতিতে ট্রনকা-আমরাইন আরও বলেছেন, “আমাদের ধারণা ছিল, ভাস্কর্যটি ওখানে থাকতে পারে। তবে, আমরা নির্দিষ্টভাবে তা খুঁজছিলাম না। ভাস্কর্যের বাকি অংশ ওখানেই থাকতে পারে এমন সম্ভবনা থাকলেও ওখানে এটিকে পাওয়ার বিষয়টি ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত।”