Published : 04 Aug 2026, 10:08 AM
যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক জড্রেল ব্যাংক অবজারভেটরি’র রেডিও টেলিস্কোপ নেটওয়ার্কে সরকারি বাজেট কাটছাঁটের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্বের শতাধিক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, লেখক ও শিল্পী।
নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নামকে দেওয়া এক খোলা চিঠিতে তারা সতর্ক করে বলেছেন, বছরে কেবল ২৮ লাখ পাউন্ড বাঁচাতে মহাকাশ গবেষণার এই বিশ্বমানের বাতিঘরটি বন্ধ করে দেওয়া হবে ‘চরম বোকামি ও দূরদর্শিতাহীন’ সিদ্ধান্ত।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, মহাকাশ গবেষণার এই কেন্দ্রটিকে মহাজগত পর্যবেক্ষণে পৃথিবীর ‘সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টির চোখ’ হিসেবে বর্ণনা করে অবজারভেটরিটি চালু রাখার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
ব্রিটিশ ব্যান্ড ‘নিউ অর্ডার’, কানাডীয় নভোচারী ক্রিস হ্যাডফিল্ড ও বিখ্যাত কবি সাইমন আর্মিরেজ’সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নামের কাছে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি সুরক্ষার আর্জি জানিয়েছেন।
বিখ্যাত ব্রিটিশ রক ব্যান্ড কুইনের গিটারিস্ট ব্রায়ান মে সরকারি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই বরাদ্দ বন্ধের বিষয়টি হবে “স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন একটি সিদ্ধান্ত”।
সংগীত শিল্পী পরিচয়ের বাইরে ব্রায়ান মে’র আরেক পরিচয় তিনি একজন জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী। এ বিষয় ডক্টরেট ডিগ্রি রয়েছে তার।
এ অবজারভেটরিতে রয়েছে ‘গ্রেড ওয়ান’ তালিকাভুক্ত বিখ্যাত ‘লাভল টেলিস্কোপ’, যা ছায়াপথ, তারার জন্ম ও সৌরজগতের বাইরের গ্রহ নিয়ে গবেষণার কাজে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধান গবেষণা অর্থায়নকারী সংস্থা ‘ইউকে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন’ বা ইউকেআরআই বলেছে, ২০২৮ সালের মার্চে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে জড্রেল ব্যাংকে থাকা দেশটির জাতীয় রেডিও অ্যাস্ট্রোনমি কেন্দ্র ‘ই-মার্লিন’ নেটওয়ার্কে তারা আর কোনো আর্থিক বরাদ্দ দেবে না।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম, বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস ও ইউকেআরআই-এর প্রধানের কাছে পাঠানো ওই খোলা চিঠিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, “আমাদের অনুমান, বছরে কেবল ২৮ লাখ পাউন্ড বাঁচানোর জন্য এটা বন্ধ করে দেওয়া হবে চরম বোকামি ও দূরদর্শিতাহীন সিদ্ধান্ত।”
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ই-মার্লিনের এই কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া মানে মহাবিশ্ব দেখার সবচেয়ে স্পষ্ট চোখ দুটি উপড়ে ফেলা।
১৯৫৭ সালে রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক স্যাটলাইট উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ করেছিল লাভল টেলিস্কোপ। মহাবিশ্ব তৈরির প্রথম একশো কোটি বছরের মানচিত্র তৈরির যে বৈশ্বিক প্রকল্প চলছে তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এই অবজারভেটরি।
বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এ সিদ্ধান্তকে যুক্তরাজ্যের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখছেন। নতুন কোনো অর্থায়নের উৎস না পাওয়া গেলে চেশায়ারের জড্রেল ব্যাংকে পরিচালিত সব ধরনের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
এ সিদ্ধান্তের ফলে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ২৮ জনের চাকরি ঝুঁকিতে পড়েছে এবং কেন্দ্রটির সুবিধাপ্রাপ্ত প্রায় তিন হাজার গবেষকের গবেষণা কার্যক্রম ক্ষতির মুখে পড়বে।
এ ছাড়া আরও বেশ কিছু গবেষণাগার ও প্রকল্পে বাজেট ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সব মিলিয়ে প্রায় আটশ জন কর্মী চাকরি হারাতে পারেন।
ইউকেআরআই-এর বার্ষিক বাজেট প্রায় ১ হাজার কোটি পাউন্ড। সংস্থাটির অর্থায়নে পরিচালিত ‘সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফ্যাসিলিটিস কাউন্সিল’ বা এসটিএফসি’র ধারাবাহিক বাজেট ছাঁটাইয়ের অংশ হিসেবেই এসেছে এ নতুন সিদ্ধান্ত।
প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো, বিদ্যুৎ ও কর্মী খরচের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণাগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার কারণেই এসটিএফসি’কে বড় ধরনের সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করতে হচ্ছে।
সরকারের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, “বিজ্ঞানের এ বাতিঘরটি এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়। মহাকাশ গবেষণা ও এর ব্যবহারের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্ব ধরে রাখতে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিকল্পনা এরইমধ্যে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ও যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম এ রেডিও টেলিস্কোপে সরকারি সহযোগিতা ধরে রাখার দাবি জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রটি চালু রাখা মহাজাগতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতেও জরুরি।
এর মধ্যে রয়েছে মহাকাশের বর্জ্য পর্যবেক্ষণ, ধ্বংসাত্মক সৌরশিখা, স্যাটেলাইট ও গ্রহাণু ট্র্যাকিং বা নজরদারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
জড্রেল ব্যাংক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটিতেই রয়েছে ‘স্কয়ার কিলোমিটার অ্যারে অটোমেশন অবজারভেটরি’ বা এসকেএও-এর নতুন সদর দপ্তর।
আন্তর্জাতিক এ প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় বসানো সহযোগী টেলিস্কোপের সাহায্যে মহাবিশ্ব তৈরির প্রথম একশো কোটি বছরের মানচিত্র তৈরির কাজ চলছে।
চিঠিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, “আমরা কি সত্যিই চাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অকার্যকর বা পরিত্যক্ত রেডিও টেলিস্কোপের পাশে অবস্থিত কোনো সদর দপ্তর থেকে এসকেএও-এর ঐতিহাসিক সব আবিষ্কারের কথা ঘোষিত হোক?”
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, “আমরা অনুরোধ করছি অবিলম্বে এর প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে করে এই কেন্দ্রের অনন্য ও জরুরি বিভিন্ন পরিষেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে এবং জাতীয় গর্ব ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানের মর্যাদার প্রতীক এ কেন্দ্রটিকে রক্ষা করা যায়।”
সম্প্রতি ছাঁটাইয়ের মুখে পড়া দেশি-বিদেশি ডজনখানেক গবেষণা সুবিধার মধ্যে জড্রেল ব্যাংক অন্যতম।
চিলির ‘রুবিন অবজারভেটরি’ ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক জরিপের জন্য গেল মাসেই কাজ শুরু করেছে, যেখানে যুক্তরাজ্যের অংশীদারিত্বে ২০ শতাংশ বাজেট কমানো হয়েছে।
পৃথিবীর সৌরজগতের মতো নতুন এমন গ্রহ সিস্টেম অনুসন্ধানের কাজে ‘নেক্সট-জেনারেশন ট্রানজিট সার্ভে’ নামের আরেকটি টেলিস্কোপের বরাদ্দ ছাঁটাই হয়েছে ৪৫ শতাংশ।
‘ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ’ প্রকল্প থেকেও যুক্তরাজ্য নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে, যার মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিল্কি ওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রস্থলে থাকা ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম ছবি তুলতে পেরেছিলেন।
এসব বিষয়ে এসটিএফসি’র একজন মুখপাত্র আগেই বলেছেন, সংস্থাটি কঠোর এক অগ্রাধিকার নির্ধারণ প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে, যাতে যেসব ক্ষেত্র যুক্তরাজ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, প্রভাব ও মূল্যবান অবদান রাখবে সেখানেই বিনিয়োগকে কেন্দ্রীভূত করা যায়।